গরমের সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিংও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মুসলিমা জাহান। গত রবিবার অফিস শেষে রাত ৯টায় বাসায় ফেরেন। ফ্রিজে রাখা খাবার ওভেনে গরম করে খেতে বসতেই বিদ্যুৎ চলে গেল। চার্জার লাইট দিয়ে কোনো মতে নিজেদের খাওয়া শেষ করলেন। এরপর সাড়ে চার বছর বয়সী মেয়ের খাবার গরম করতে গিয়ে দেখলেন চুলায় নেই গ্যাস। কিন্তু কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও এলো না বিদ্যুৎ, চুলায় এলো না গ্যাস। বাধ্য হয়ে সে রাতের জন্য শুকনো খাবার খাওয়ালেন মেয়েকে।
মুসলিমা বলছিলেন, আগে মেয়ের স্কুলের টিফিন বাসায় তৈরি করলেও এখন গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবের কারণে বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার দিতে হচ্ছে তাকে। শুধু মুসলিমাই নন, দেড় মাস ধরে দেশের সবাই কমবেশি এমন সংকটের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। কারখানার উৎপাদন কমছে আশঙ্কাজনক হারে। বিদ্যুতের লোডশেডিং ঢাকায় কিছুটা কম হলেও অন্য এলাকায় বিশেষ করে গ্রামে বিদ্যুৎ থাকছে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শিশু, বৃদ্ধ এবং হাসপাতালে অসুস্থ রোগীরা পোহাচ্ছেন সবচেয়ে ভোগান্তি। লোকসান গুনছেন খামারিরা, আয় কমেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদের।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘জ্বালানি খাত আমদানি নির্ভরশীল হওয়ায় ব্যয় বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এই ব্যয় সামাল দিতে যে পরিমাণ অর্থ দরকার, তা নেই। তবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করার সুযোগ রয়েছে।’
তার ভাষায়, আমদানি করা এলএনজি দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তারপরও আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া অযৌক্তিক। সরকারকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। আপাতত জ্বালানিতে সাশ্রয়ী হতে হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে, দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের।
গরমে বেড়েছে লোডশেডিং: চলতি মাসের শুরুর দিকে গরম কিছুটা কমলে বিদ্যুতের চাহিদা কমে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট হয়। তখন লোডশেডিং কিছুটা কমলেও গরম বাড়তেই বেড়েছে লোডশেডিং। এর মধ্যে গতকাল সোমবার বেলা ৩টায় লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ২১৬ মেগাওয়াট। ওইসময় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছিল।
বর্তমানে দেশীয় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন হচ্ছে ৪৬০০-৪৮০০ মেগাওয়াট। ভারতীয় আদানি পাওয়ার কমবেশি ১৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু এখন সেখান থেকেও দৈনিক গড়ে বিদ্যুৎ মিলছে ১০০০-১১০০ মেগাওয়াট। পাশাপাশি দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। যেখান থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে প্রয়োজন ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এখন শুধু ৮৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বললেন, ‘রামপালের কয়লা সংকট এ সপ্তাহের মধ্যে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য তাদের নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা সেখানকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে জানিয়েছে অতিবৃষ্টি ও কয়লা পরিবহনের রেলপথে সংকটের কারণে চাহিদা বাড়াতে পারছে না।’
কমছে দেশীয় গ্যাস, এলএনজিতেও অনিশ্চয়তা: সংকটের বড় কারণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও সময়মতো কার্গো না আসায় কয়েক দিন ধরে ৭০-৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। দেশীয় ও এলএনজি মিলে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ২৩২ কোটি ঘনফুট। অথচ সরকারি হিসেবে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যদিও বাস্তবে চাহিদা ৫৫০ কোটি ঘনফুটের মতো।
পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানালেন, চলতি মাসে কার্গো নিয়ে এখন পর্যন্ত জটিলতা নেই। এখন অক্টোবরের কার্গোগুলোও যাতে সময়মতো আসে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে।’





