নীললোহিতের বয়স ২৭ থেকে বাড়ে না

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আজ কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীন বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুরের কালকিনি থানার মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান সুনীল। নীল লোহিত এক সময় নীললোহিত ছদ্মনামে লিখেছেন, যার প্রধান চরিত্র নীলু। এই চরিত্রটি আসলে সুনীল নিজেই, এমনটিই মনে করেন পাঠকরা। আর নীল লোহিতের বয়স ২৭ এ স্থির হয়ে গেছে।
১৯৫৩ সাল থেকে ‘কৃত্তিবাস’ নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠী বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতায় আধুনিকতার বিকাশ, প্রচলিত গণ্ডি ভেঙে নতুন শব্দের ব্যবহার এবং আবেগের মুক্ত প্রকাশে এই গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শুধু কবিতা লেখেননি, কবিতাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে বিদ্রোহ, প্রেম ও তারুণ্যের প্রকাশ হিসেবেও তুলে ধরেছেন। ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’-এর মতো কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতায় নিজস্ব এক স্বর তৈরি করেন। তার সৃষ্ট ‘নীরা’ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম স্মরণীয় প্রেমের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’। এরপর ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণকাহিনি ও কিশোর সাহিত্যেও তিনি রেখেছেন অসামান্য সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় সৃষ্টির অন্যতম ‘কাকাবাবু’ সিরিজ। কাকাবাবু ও সন্তু নামে জনপ্রিয় কিশোর গোয়েন্দা সিরিজের রচয়িতা। এই সিরিজ দিয়ে তিনি সংযোগ ঘটিয়েছিলেন শিশু কিশোরদের সঙ্গেও। সন্তুকে যেমন মানুষ পছন্দ করে তেমনই কাকাবাবুকেও পছন্দ করেন, কেননা দুজন মিলে তারা রহস্যভেদ করেন।
১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ একা এবং কয়েকজন এবং ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ প্রকাশিত হয়।
ত্রয়ী
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তিনটি জনপ্রিয় ঐতিহাসিক উপন্যাস হলো , ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ এবং ‘প্রথম আলো’ তিনটি উপন্যাসই ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ১৯৮১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কালসীমা ১৮৪০ থেকে ১৮৭০, উপন্যাসের নায়ক নবীনকুমারের জন্ম থেকে মৃত্যু।
কে এই নবীনকুমার? সুনীল বলেছেন, ‘সময়কে রক্ত মাংসে জীবিত করতে হলে অন্তত একটি প্রতীক চরিত্র গ্রহণ করতে হয়। নবীনকুমার সেই সময়ের প্রতীক। তার জন্মকাহিনি থেকে তার জীবনের নানা ঘটনার বৈপরীত্য, শেষদিকে এক অচেনা যুবতীর মধ্যে মাতৃরূপ দর্শন এবং অদ্ভুত ধরনের মৃত্যু, সবই সেই প্রতীকের ধারাবাহিকতা। প্রয়োজনীয় কথা শুধু এই যে, নবীনকুমারের চরিত্রে এক অকাল-মৃত অসাধারণ ঐতিহাসিক যুবকের কিছুটা আদল আছে।’ এই ঐতিহাসিক যুবক হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ।
নীললোহিত
নীললোহিত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। নীললোহিতের মাধ্যমে সুনীল নিজের একটি পৃথক সত্তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। নীললোহিতের সব কাহিনিতেই নীললোহিতই কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে নিজেই কাহিনিটি বলে চলে আত্মকথার ভঙ্গিতে। সব কাহিনিতেই নীললোহিতের বয়স সাতাশ। সাতাশের বেশি তার বয়স বাড়ে না। বিভিন্ন কাহিনিতে দেখা যায় নীললোহিত চির-বেকার। চাকরিতে ঢুকলেও সে বেশিদিন টেকে না। তার বাড়িতে মা, দাদা, বৌদি রয়েছেন। নীললোহিতের বহু কাহিনিতেই দিকশূন্যপুর বলে একটি জায়গার কথা শোনা যায়। যেখানে বহু শিক্ষিত, সফল কিন্তু জীবন সম্পর্কে নিস্পৃহ মানুষ একাকী জীবনযাপন করেন।
সম্মাননা
২০০২ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতা শহরের শেরিফ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭২ ও ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দ পুরস্কার এবং ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এছাড়া বাংলা সাহিত্যের সৃজনশীল গল্পের ওপর স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশ্যে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছরের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিবস ৭ সেপ্টেম্বরে সুনীল সাহিত্য ট্রাস্টের পক্ষে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মাদারিপুর কর্তৃক সুনীল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়।
সুনীল মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য অকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশুকিশোর আকাদেমির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।





