চীনের ‘স্টেম’ জাদু, বদলাতে পারে বাংলাদেশও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আহ্নিক গতির চেয়েও দ্রুত ঘুরে যাচ্ছে প্রযুক্তির দুনিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও বায়োটেকনোলজির মতো বিষয়ে যারা এগিয়ে, তারাই বসার সুযোগ পাচ্ছে অর্থনীতির ভিআইপি আসনে। চাকরি হোক বা ব্যবসা, এগিয়ে থাকার প্রধান রসদ এখন স্টেম— সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাথমেটিকস। পৃথিবী টিকে থাকবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত নামের চার খুঁটির ওপর। এই চারের সমন্বিত ব্যবহারিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জরুরি চাহিদা বানিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেললে কেমন উন্নতি করা যায়, সেটা দেখিয়েছে চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পেছনে চীনের যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, তা হলো দেশটি স্টেম শিক্ষায় কোনো ছাড় দেয়নি। এ খাতে উদারহস্তে বিনিয়োগ করে চলেছে তাদের সরকার। চীন অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল, জনগণকে গোটা বিশ্বের সম্পদে পরিণত করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী শিক্ষার বিকল্প নেই। এ কারণে এখন প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ৫০ লাখের বেশি স্টেম গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে।
চীন মূলত কয়েকটি বিশেষ কৌশলে বদলে দিয়েছে তাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা। প্রথমত, তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্টেম শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও সৃজনশীল গণিতকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে। সেখানে শুধু তত্ত্বীয় পড়াশোনার চেয়ে হাতে-কলমে শেখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বেইজিং পৌর শিক্ষা কমিশন স্কুলগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষার মান বাড়াতে ২০টি নতুন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিল। এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তি জাগিয়ে তোলা এবং উচ্চশিক্ষার সঙ্গে স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার একটি শক্ত সেতুবন্ধ তৈরি করা। এ পরিকল্পনার আওতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মোট ক্লাসের অন্তত ১০ শতাংশ সময় স্টেম শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। পাশাপাশি মাধ্যমিকের সব শ্রেণিতেই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্বালানি ও বায়োটেকনোলজির মতো আধুনিক ল্যাবগুলো স্কুলশিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার নজিরও গড়েছে চীন। প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলে অন্তত একজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বিজ্ঞান ক্লাবের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিকাল শেখার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে চীনের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে নিবিড় সমন্বয়, ফলে শিক্ষার্থীরা যেসব বিষয়ে ল্যাবে গবেষণা করে, তা সরাসরি শিল্প খাতের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগাতে পারে।
পৃথিবী টিকে থাকবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত নামের চার খুঁটির ওপর। এই চারের সমন্বিত ব্যবহারিক শিক্ষা রাষ্ট্রীয়ভাবে জরুরি বানিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেললে কেমন উন্নতি করা যায়, সেটা দেখিয়েছে চীন
সম্প্রতি শিক্ষা খাতে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায় তা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই চরম উৎকর্ষের যুগে শিক্ষার্থীদের আসল দক্ষতা ঠিক কী হবে? চীনের শিক্ষা-দর্পণে পাওয়া যাবে এর যথাযথ উত্তর। ২০২৬ সালের মার্চে সাংহাইয়ের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে স্টেম শিক্ষাবিষয়ক সপ্তম চীন-জার্মানি ডিড্যাকটিকস ডায়ালগের প্রাক-সম্মেলন। এ সংলাপে শিক্ষাবিদরা জোর দিয়ে বলেছেন, এআইয়ের যুগে স্টেম শিক্ষাকে শুধু তথ্য মুখস্থ করা বা জ্ঞান বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না— শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া এবং যুক্তিবাদী চিন্তা তৈরির ওপর। এআই যুগে বিজ্ঞান শিক্ষার লক্ষ্য নতুন করে সাজাতে তারা টি-ফোর-সি মডেল উপস্থাপন করেন, যার মূল বার্তা হলো এআই যা করতে পারে না, শিক্ষার্থীদের ঠিক সে জায়গাতেই দক্ষ করে তুলতে হবে। এ তালিকায় রয়েছে গভীর পর্যবেক্ষণ, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সৃজনশীল অনুসন্ধান। শিক্ষার্থীদের শুধু কী জানতে হবে তা না শিখিয়ে, কীভাবে প্রশ্ন করতে হবে ও সত্যতা যাচাই করতে হবে— তা শেখানো এখন সবচেয়ে জরুরি।
আরেকটি প্রশ্ন উঠতে পারে, স্টেম শিক্ষার কারিকুলাম বাস্তবে কেমন হওয়া উচিত? এখানেও রয়েছে চমৎকার চীনা সমাধান। চীনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গণিত শিক্ষক ও স্টেমবিষয়ক পরিকল্পনাবিদ ড. লি ই ভবিষ্যতের দক্ষ প্রকৌশলী গড়ার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম তৈরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার স্কুলে স্টেম শিক্ষাকে আলাদা আলাদা বিষয় শেখানোর পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয় না, আবার শুধু কঠিন বিষয় শেখানো বা বিভিন্ন প্রতিযোগিতার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করাও এর লক্ষ্য নয়। বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন প্রকৌশলীর মতো চিন্তা করার ক্ষমতা গড়ে তোলাই তাদের কারিকুলামের মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীরা কীভাবে সমস্যা চিহ্নিত করবে, তার একটা মডেল বানাবে, তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং সমাধান বের করে বাস্তবে সেটার প্রয়োগ করবে— এ পুরো প্রক্রিয়াটি শেখানো হয়।
এই স্টেম কার্যক্রমটি তিনটি ধাপে সাজানো হয়েছে, যা প্রাথমিক, মধ্যম ও উন্নত স্তর হিসেবে পরিচিত। প্রাথমিক স্তরে সব শিক্ষার্থীকে গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মৌলিক ধারণা শেখানো হয়। মধ্যম স্তরে বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে প্রকল্পভিত্তিক কাজ করানো হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রকৌশল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পায় এবং হাতে-কলমে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করে। আর উন্নত স্তরে আগ্রহী ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা জটিল গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পে অংশ নেয়, যা বাস্তব জীবনের প্রকৌশল সমস্যার মতো করেই তৈরি করা হয়। এ ধাপে ধাপে শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা গড়ে ওঠে। এগুলো হলো মডেল তৈরি করে চিন্তা করা, তথ্য বিশ্লেষণ করে চিন্তা করা, কম্পিউটেশনাল বা গণনাভিত্তিক চিন্তা, নকশা বা ডিজাইনভিত্তিক চিন্তা এবং প্রকৌশলভিত্তিক চিন্তা। এমন কারিকুলামের মূল ভিত্তি হলো প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শহরের যানজটের মডেল, জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ, টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা, ড্রোনের নকশা এবং রোগের বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সিমুলেশনের মতো প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পায়। এ ধরনের প্রকল্প শিক্ষার্থীদের বুঝতে সাহায্য করে যে, প্রকৌশল শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এর সঙ্গে সমাজ এবং বাস্তব জীবনেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
চীন যেভাবে তাদের বিশাল জনসংখ্যাকে স্টেম শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদে পরিণত করেছে, সেখান থেকে বাংলাদেশ সরাসরি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল প্রয়োগ করতে পারে। চীনের দেখাদেখি বাংলাদেশ প্রাথমিক স্তর থেকেই গণিত ও বিজ্ঞানকে আনন্দদায়ক ও বাস্তবধর্মী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। প্রতিটি সরকারি স্কুলে চালু করা যেতে পারে কোডিং ক্লাব, যেখানে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে উঠবে। সম্প্রতি চীনের প্রাথমিক স্কুলে যেমন শিশুদের চিন্তা করার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও সে ভাবনার বীজ বপন করা সম্ভব।
একই সঙ্গে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে চীন যে আধুনিক শিক্ষাক্রম তৈরি করেছে, বাংলাদেশ তার সুবিধাও নিতে পারে। চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত স্টেম এক্সিলেন্স সেন্টার গড়ে তোলা যেতে পারে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষকরা চীনে গিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। পাঠদানে চীনের হালনাগাদ প্রযুক্তির প্রসঙ্গটিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কাগজের বই আর শ্রেণিকক্ষের দেয়াল টপকে শিক্ষাদানের কাজগুলো এখন এআই ও অগমেন্টেড রিয়্যালিটির প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করেছে। এর অন্যতম উদাহরণ চীনের ন্যাশনাল স্মার্ট এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম, যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ও পাঠের ভাণ্ডার। চীন এ প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বিশ্বের ২০০টির বেশি দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আজ এটি ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নেটড্রাগন ওয়েবসলফ্ট সার্বিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে বেলগ্রেড সেন্টার ফর রোবোটিকস অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এডুকেশন স্থাপন করে চার হাজারের বেশি শিক্ষককে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদানের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
ডিজিটাল যুগের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত বৈষম্য। চীনের বিশালাকার ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্মের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমের উপযোগী একটি স্মার্ট ই-লার্নিং পোর্টাল গড়ে তোলা সম্ভব। সার্বিয়ার মতো বাংলাদেশেও শিক্ষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। কোনো দেশের সমৃদ্ধির ভিত্তি এখন আর শুধু ভূগর্ভস্থ সম্পদ বা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে তরুণদের চিন্তাশক্তি ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার ওপর। চীন এটি সময়মতো উপলব্ধি করেছিল এবং স্টেম শিক্ষায় মনোযোগ দিয়ে সেটার সুফল কুড়াচ্ছে। চীনের এ সফল মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক নীতি, বাজেট এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্ভাবনী ধারণার বড় জোগানদাতা হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং





