পাখিপ্রেমী বুদ্ধ প্রামানিক

পাখিদের খাবার দিচ্ছেন বুদ্ধ প্রামানিক
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে যেমন চলে আসে শহরের সব ইঁদুর। ঠিক তেমনই কাক ডাকা ভোরে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল বাজারের সবজি ব্যবসায়ী বুদ্ধ প্রামানিকের (৬৪) ডাকে ছুটে আসে অসংখ্য পাখি। ১০ বছর ধরে প্রতিদিন ডেকে ডেকে পাখিদের খাওয়ান তিনি।
২০১৬ সালের দিকে হঠাৎ করে কিছু ফলমূল, বিস্কুট ও চানাচুর দিয়ে পাখিদের খাওয়ানো শুরু করেছিলেন বুদ্ধ। এরপর থেকে তা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কামারখন্দ গ্রামের মসজিদে ফজরের নামাজ শেষে হেঁটে জামতৈল বাজারে যাওয়ার জন্য রওনা দেন বুদ্ধ। তখন তার পিছু পিছু প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চলে আসে পাখির ঝাঁক। বাজারের আড়তে পৌঁছানোর পরই চানাচুরের বয়াম হাতে নিয়ে পাখিদের খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রতিদিন তিনি পাখিদের ১ কেজি চিকন চানাচুর, ২৫০ গ্রাম ছোট বিস্কুট ছাড়াও ভাত খাওয়ান।
জামতৈল বাজারের সবজির আড়তদার বুদ্ধ প্রামানিক বলছিলেন, ‘কামারখন্দের মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে বাজারে আসি। তখনই পাখিরা বের হয়। পাখিদের খাওয়াতে খাওয়াতে জামতৈল বাজারে চলে আসি। বাজার থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব এক থেকে সোয়া কিলোমিটার।’
‘১০ বছর ধরে পাখিদের খাওয়াচ্ছি। বাজারের সবচেয়ে ভালো চিকন চানাচুর কিনে পাখিদের খাওয়াই। এটি করতে আমার কোনো ক্লান্তি নেই। আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখেন ততদিন পাখিদের এভাবে খাওয়াব। পরিবারের সদস্যরাও আমাকে এই কাজে অনুপ্রেরণা দেন’— যোগ করেন তিনি।
বুদ্ধ প্রামানিক কামারখন্দ গ্রামের হারান প্রামানিকের ছেলে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিন মেয়ে ও এক ছেলের বাবা তিনি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। পরিবারের সবাই তাকে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেন।
বুদ্ধর ভাষ্য, ‘আমি ডাকলেই কামারখন্দ হাটখোলা থেকে জামতৈল বাজার পর্যন্ত শত শত পাখি খাওয়ার জন্য চলে আসে। শুরুর দিকে অল্প অল্প করে ফল বা বিস্কুট-চানাচুর দিতাম। পাখিরা সেগুলো খেত। এরপর নিয়মিত খাওয়ানো শুরু করলাম। ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা বেড়েছে।’
বুদ্ধ প্রামানিকের বর্ণনায়, ‘১০ বছরে কখনো কখনো অভাব ও অসুস্থতায় পড়েছি, কিন্তু তখনো পাখিদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি। কিছু পাখি বিকাল পর্যন্ত আমার আশপাশেই থাকে। বাড়ি থেকে আনা আমার খাবার থেকেও তাদের খেতে দিই।’
বুদ্ধ প্রামানিকের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জামতৈল বাজারের সবজির আড়তদার রাজু ও মোতালেব। তারা বলছিলেন, বিষয়টি আমাদেরও খুব ভালো লাগে। এটি সত্যিই একটা ভালো উদ্যোগ। আল্লাহ ওনার মাধ্যমে পাখিদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। এই কাজগুলো সবাই করে না। প্রতিদিনই দেখি বুদ্ধ এ কাজটা করেন। এলাকার সবার কাছে বুদ্ধ এখন পাখিপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। সকাল হলেই পাখিগুলো তার অপেক্ষায় থাকে।
পশুপাখিদের নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সংগঠন দ্য বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাসের মতে, বুদ্ধ যে কাজটি করছেন, তা সবার জন্য অনুকরণীয়। তার হয়তো অনেক টাকা-পয়সা নেই, কিন্তু পাখি বা প্রাণীর প্রতি অনেক ভালোবাসা আছে। বুদ্ধর মতো সবাইকেই প্রাণীর প্রতি ভালোবাসায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মামুন বললেন, ‘আমরা যদি প্রাণীদের প্রতি সবাই একটু আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হই, তাহলে অবশ্যই সমাজে অনেক পরিবর্তন আসবে।’





