অটোরিকশার এই বিশাল বাজার তৈরি হলো কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যা হচ্ছে, সেটিকে শুধু একটি পরিবহন সমস্যা হিসেবে দেখলে সম্ভবত মূল সমস্যাগুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। আমাদের মানতে হবে, অটোরিকশাচালক অনেকের প্রশিক্ষণ নেই। তারা বেপরোয়াভাবে অটোরিকশা চালান, উল্টো পথে যান, যেখানে-সেখানে দাঁড়ান। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি মোটরচালিত যান কতটা নিরাপদ, কে সেটি চালাতে পারবেন এবং কোন সড়কে চলবে— এসব নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জীবিকার অধিকার নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অধিকার অন্য মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার অধিকার তৈরি করে না।
তারপর আরও একটা প্রশ্ন করতে হবে, এত বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার বাজার তৈরি হলো কেন? কারণ, অটোরিকশাচালকের জীবন ও জীবিকার আড়ালে আরেকটি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। আমরা শুধু অটোরিকশাচালকের আয় করাটাই দেখি; কিন্তু সেই আয় থেকে নানা নামে অন্যদের বৈধ ও অবৈধ আয়ের বিষয়টি আমাদের নজরে আসে না।
অটোরিকশাকে ঘিরে গ্যারেজ, বিদ্যুৎ, টোকেন, চাঁদায় স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ফলে অধিকার আন্দোলনের আগে একটি প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার— এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থেকে আসলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন কারা? চালকের অধিকার রক্ষা করতে হলে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয়, পেশিশক্তি এবং অনানুষ্ঠানিক চাঁদার ব্যবস্থা থেকেও মুক্ত করতে হবে।
অটোরিকশাচালকের জীবন ও জীবিকার আড়ালে আরেকটি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। আমরা শুধু অটোরিকশাচালকের আয় করাটাই দেখি; কিন্তু সেই আয় থেকে নানা নামে অন্যদের বৈধ ও অবৈধ আয়ের বিষয়টি আমাদের নজরে আসে না
অটোরিকশার বিষয়টি শুধু ঢাকার নয়; দেশের বড় শহর থেকে জেলা-উপজেলা শহর, ইউনিয়নের বাজার থেকে গ্রামের বড় সড়ক— সবখানেই অটোরিকশা ও তার সঙ্গে সঙ্গে চা, পানবিড়িসহ মুদির দোকানপাট দ্রুত বেড়েছে। এতে মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়েছে, অনেকের আয়ও বেড়েছে। কিন্তু এর মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে একটি বড় সতর্কসংকেতও রয়েছে। একজন কর্মক্ষম মানুষের সামনে যদি সবচেয়ে সহজ বিকল্প হয় একটি অটোরিকশা চালানো কিংবা আরেকটি দোকান দেওয়া, তাহলে তার সিদ্ধান্তকে দোষ দেওয়া যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের অর্থনীতি তাকে আরও দশটি বিকল্প দিতে পারছে না কেন? সেটির উত্তর কিংবা ব্যাখ্যা নীতিনির্ধারকদেরই দিতে হবে।
অথচ আমাদের গ্রাম ও ছোট শহরগুলোতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মৎস্য, পর্যটন, প্রযুক্তিগত সেবা বাড়ানোর সুযোগ আছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষিত করারও সুযোগ রয়েছে। আমরা কেন সেই সুযোগ তরুণদের দিতে পারছি না? একজন তরুণ সারা দিন অটোরিকশা চালিয়ে যে আয় করেন, উপযুক্ত কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি দেশে কিংবা বিদেশে তার চেয়ে অনেক বেশি উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারেন। উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণ ও দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেড়ে চলেছে। আমাদের কর্মক্ষম বিপুল জনগোষ্ঠীকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে উন্নত দেশগুলোতে পাঠানো যেতে পারে।
অটোরিকশার এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে বড় শহরে পর্যাপ্ত বাস, পরিকল্পিত রুট, মেট্রো ও অন্যান্য গণপরিবহন বাড়াতে হবে। যাতায়াতের চাহিদা অনুযায়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা সাজাতে হবে। অটোরিকশা যতদিন প্রয়োজন, ততদিন কোন ধরনের গাড়ি চলবে, কতগুলো চলবে, কোথায় চলবে এবং কে চালাতে পারবেন— সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। নিরাপদ নকশা, নিবন্ধন, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়া মোটরচালিত যান রাস্তায় চলার সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমাদের বুঝতে হবে, মানুষের জীবিকার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অর্থ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা নয়।
এখানেই অধিকার আন্দোলনের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। একজন অটোরিকশাচালকের জীবিকার দাবি ন্যায্য। কিন্তু সেই দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য আইন অমান্য করা, রাস্তা বন্ধ করা ন্যায্য হয়ে যায় না। একজন মানুষ আইন ভাঙলে সেটি যেমন বেআইনি, ১০ হাজার মানুষ আইন ভাঙলে সেটিও বেআইনি। অথচ আমাদের নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই সংগঠিত চাপকে পুরস্কৃত করে। ফলে মানুষ ক্রমে নিয়ম মেনে দাবি জানানোর চেয়ে চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায় বেশি কার্যকর মনে করে। ফলে অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অধঃপতনের রাজনীতির পথ সুগম হচ্ছে।
অটোরিকশার ক্ষেত্রে কোনো একটি পক্ষ নেওয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। রাষ্ট্রের অটোরিকশাচালককে জানিয়ে দিতে হবে— আপনার জীবিকার অধিকার আছে, কিন্তু অন্যের জীবন বিপন্ন করার অধিকার নেই। আবার জনগণের দিক থেকে রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, রাষ্ট্র নিরাপদ গণপরিবহন ও যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। তাই সমস্যার দায় শুধু চালকের নয়, বরং রাষ্ট্রের বেশি। অন্যদিকে রাষ্ট্র রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের জোরালোভাবে এই বার্তা দেবে যে– দরিদ্র মানুষের জীবিকার ওপর চাঁদা ও আশ্রয়ের ব্যবসা করার অধিকার কারও নেই। প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। তবে তার আগে রাষ্ট্রের হয়ে সরকারকে ভবিষ্যতের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। এখনকার অটোরিকশাচালককে কীভাবে আগামী দিনের দক্ষ চালক, টেকনিশিয়ান, নির্মাণকর্মী কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের দক্ষ কর্মীতে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে।
আমি তাই অটোরিকশা সমস্যার সমাধান হিসেবে শুধু অটোরিকশাকে বৈধ করার মধ্যে দেশের ও দেশের জনগণের ভবিষ্যৎ দেখি না; বরং নিরাপদ ও কার্যকর গণপরিবহন বাড়ানো, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির মধ্যেই ভবিষ্যৎ দেখি। অধিকার আন্দোলনের নামে অধঃপতনের রাজনীতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। অধিকার আন্দোলনের উদ্দেশ্য হোক— মানুষের সামনে আরও ভালো জীবনের সুযোগ তৈরি করা।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন





