গাজা নিয়ে মিত্র ইসরায়েলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ইসরায়েলি হামলায় বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় নেওয়া একটি স্কুলের কাছে ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন এক ফিলিস্তিনি, ২৭ জুন ২০২৪। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিরোধে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা সচরাচর দেখা যায় না। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের আহ্বান শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি বলেছেন, গাজার সংকটের একমাত্র সমাধান হলো সেখানকার ফিলিস্তিনি জনসংখ্যাকে অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়া। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর শুক্রবার জানিয়েছে, তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ অনুযায়ী এগোচ্ছে। গত বছর এই পরিকল্পনার আওতায় গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ হয়েছিল।
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনার ১২ নম্বর দফায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা যেতে চান, তারা যেতে পারবেন এবং ফিরে আসতেও পারবেন। আমরা মানুষকে গাজায় থাকার উৎসাহ দেব এবং আরও ভালো গাজা গড়ে তোলার সুযোগ দেব।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘গাজার জনগণকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া, বিতাড়িত করা বা অন্য কোথাও স্থানান্তরের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।’
তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ বলেছেন, ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব বাতিল করেননি। বরং তিনি এটি ‘স্থগিত’ করে রেখেছেন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ইসরায়েলি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা জাতিগত নির্মূলের বড় উদাহরণ হতে পারে।
কাটজ পরে বুধবার বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই অভিবাসন ছাড়া গাজার কোনো প্রকৃত সমাধান নেই।’
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের চিরতরে সরিয়ে দেওয়াকে বোঝাতে ‘অভিবাসন’ শব্দটি ব্যবহার করছেন।
কাটজ আরও বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে ‘সমুদ্রপথে, আকাশপথে এবং যেকোনো উপায়ে’ সরিয়ে নিতে ইসরায়েল সরকার প্রস্তুত। বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পরদিন একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন কট্টরপন্থী ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির।
তিনি বলেছেন, ‘এখন শান্তির জন্য নয়, আমাদের এখনই অভিবাসনের পদক্ষেপ নিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের সুড়ঙ্গ খোঁড়ার বদলে এখন সময় এসেছে স্যুটকেস গোছানোর।’
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি আরব দেশও ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে।
হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে কথা বলার সময় আল জাজিরাকে ট্রাম্পের আগস্টে দেওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্ট শেয়ার করেছে। ওই পোস্টে হামাসকে নিরস্ত্র করার একটি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।
চুক্তিটিতে গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং উপত্যকায় প্রায় প্রতিদিনের প্রাণঘাতী হামলা বন্ধের কথা ছিল।
তবে ইসরায়েল ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির দাবি, গাজা পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ছাড় দেবে না।
গত বছর ট্রাম্প প্রথমবার গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডকে তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ বা পর্যটককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলেছিলেন।
পরে ২০২৫ সালে সংঘাত বন্ধে ২০ দফা পরিকল্পনা সামনে আনার সময় তিনি ওই প্রস্তাব থেকে সরে আসেন।
হামাস ও ইসরায়েল গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু এরপরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের দূত ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার গত মাসে হামাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সংকট সমাধানের চেষ্টা হিসেবে এসব বৈঠক হয়।
তবে কুশনারের বক্তব্যে ইসরায়েলি সরকারের অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি বলেছেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা পুনর্গঠনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার মধ্যেও তিনি বলেছেন, ইসরায়েলের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ আছে, যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে তার অবস্থান বদলাবে না।
হামাস অস্ত্র ছেড়ে দিতে রাজি হলেও ট্রাম্পের ‘যুদ্ধবিরতি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি।
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অনড় অবস্থান আলোচনা আরও জটিল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ‘যেকোনো স্থানান্তর অবশ্যই পুরোপুরি স্বেচ্ছায় হতে হবে। গাজার বাসিন্দাদের স্বার্থে নিরস্ত্রীকরণ, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
দপ্তরটি আরও বলেছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার ২০ নম্বর দফায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপ শুরুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব সেন্টারের ফিলিস্তিন-ইসরায়েল কর্মসূচির প্রধান ইউসেফ মুনাওয়ার মনে করেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি না হওয়ার মূল কারণ হলো ইসরায়েলিদের একটি অংশ মনে করছে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এই ভূখণ্ডে সহাবস্থান সম্ভব নয়।
তার সতর্কবার্তা, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপরও পড়তে পারে।
তিনি আল জাজিরাকে আরও বলেছেন, ‘তারা কোনো ধরনের ফিলিস্তিনির সঙ্গেই থাকতে চায় না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া ছাড়া এই মৌলিক সমস্যার আর কোনো সমাধান তারা ভাবতে পারছে না।’
সূত্র: আল জাজিরা






