মানবমূত্র ও জ্বালানিতে গলছে হিমালয়, বেস ক্যাম্প সরানোর প্রস্তাব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট বড় মাশুল দিচ্ছে মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে (ইবিসি) অবস্থানরত মানুষের মলমূত্র ও জ্বালানি থেকে নিসৃত তাপে দ্রুত হলে যাচ্ছে খুম্বু হিমবাহের বরফ। গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিখ্যাত প্রকাশণা প্রতিষ্ঠান স্প্রিঞ্জার ন্যাচারের ‘রিজিওনাল এনভায়রন্টাল চেঞ্জ’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে এই চিত্র।
নেপালের ভূমি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সার্ভে বিভাগের খিম লাল গৌতম, যুক্তরাষ্ট্রের ইউ.এস. জিওলজিক্যাল সার্ভের ভার্জিনিয়া বার্কেট, জর্জ শিয়ান, নেপালের মহেশ থাপা, অনিশ দাহাল ও সুদীপ ঠাকুরি এই গবেষণাটি করেছেন।
তাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে ক্যাম্পে এলপিজি, কেরোসিন ও পেট্রল ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের প্রস্রাব থেকে উৎপন্ন তাপ হিসাব করেছেন গবেষকরা। তারা দেখেছেন, এসব কর্মকাণ্ড থেকে প্রায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার মেগাজুল তাপ তৈরি হয়েছে। এই তাপে প্রায় ২ হাজার ৪৯২ টন বরফ ও তুষার গলানো সম্ভব।
স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের ভূমির তাপমাত্রা প্রতি বছর গড়ে ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই উষ্ণতার হার আশপাশের খুম্বু হিমবাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এই গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী গবেষক খিম লাল গৌতম ইমেইলের মাধ্যমে আগামীর সময়কে বলেছেন, হিমবাহ গলার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় মানুষের প্রস্রাব থেকে আসা তাপের প্রভাব খুবই সামান্য। গবেষণার মূল কথা হলো, এভারেস্ট বেস ক্যাম্প একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ড খুম্বু হিমবাহের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় ছোট ও চোখে না পড়ার মতো বিষয়গুলো এ ধরনের নাজুক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পাহাড়ি পরিবেশকে টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তিনি বলেছেন, ‘হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে গেলে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ। ২৬ আগস্ট নেপালে ভয়াবহ বন্যার ঘটনাও পাহাড়ি অঞ্চলের এই ভঙ্গুরতা সামনে এনেছে। এটি পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমাট মাটি রক্ষা এবং পাহাড়ি পরিবেশ, পর্বতারোহণ, হিমবাহ ও আশপাশের বাস্তুতন্ত্রকে টেকসইভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এর গুরুত্ব স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পুরো বিশ্বের পরিবেশের জন্যই রয়েছে।’
গবেষকরা বলেছেন, সাগরমাতা দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির তত্ত্বাবধানে বেস ক্যাম্পের মল ব্যবস্থাপনার জন্য নীল রঙের ব্যারেল ও ব্যাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু পর্বতারোহীরা সরাসরি হিমবাহের বরফের ওপরই প্রস্রাব করে। হিমাঙ্কের নিচে থাকা বরফের ওপর মানবদেহের প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এই প্রস্রাব পড়া মাত্রই বরফ গলতে শুরু করে।
উচ্চতাজনিত কারণে মানুষের পানিশূন্যতা ও ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়ে। হিমালয়ের উচ্চতায় পর্বতারোহীদের দিনে অন্তত ৩ থেকে ৫ লিটার পানি পান করতে হয়। হিসাব অনুযায়ী, বেস ক্যাম্পে এক জন মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ৩.১৮১ লিটার প্রস্রাব করেন। ২০২৩ সালের বসন্তকালীন ৫০ দিনের মৌসুমে বেস ক্যাম্পের প্রায় ২ হাজার ১২৭ জন আরোহী সরাসরি বরফে মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার ২৯৯ লিটার প্রস্রাব করেছেন।
গবেষকদের হিসাবমতে, মানুষের প্রস্রাব থেকে নির্গত থার্মাল এনার্জি বা তাপশক্তি তাত্ত্বিকভাবে মৌসুমে প্রায় ১৫৪ টন বরফ গলিয়ে ফেলতে সক্ষম। জ্বালানির তুলনায় এর প্রভাব কম। কিন্তু একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে এই প্রভাব পড়তে থাকলে তা বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে হিমবাহ রক্ষায় মানবসৃষ্ট এই অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওই মৌসুমে প্রায় ৮২৪টি এলপিজি সিলিন্ডার, ৫ হাজার ১৩০ লিটার পেট্রল এবং ১৮ হাজার ৯৩৫ লিটার কেরোসিন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আনুমানিক ৯৫.৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়েছে। শুধু এসব জ্বালানি থেকে উৎপন্ন তাপই প্রায় ২ হাজার ৩৩৮ টন বরফ গলানোর সমান।
বেস ক্যাম্প সরানোর প্রস্তাব
পরিবেশ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গবেষণায় বর্তমান বেস ক্যাম্পের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে দুটি সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান ক্যাম্পটি হিমবাহের ওপর অবস্থিত হলেও প্রস্তাবিত দুটি স্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও বরফমুক্ত ভূমিতে।
গবেষকদের মতে, নতুন জায়গায় বেস ক্যাম্প সরানো হলে শুধু হিমবাহের ওপর মানুষের চাপ কমবে না, পর্বতারোহীদের নিরাপত্তা, যাতায়াত, জরুরি উদ্ধার ও সরবরাহ ব্যবস্থাও সহজ হতে পারে। বর্তমান অবস্থায় গোরাকশেপ থেকে বেস ক্যাম্পে যেতে যেখানে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন স্থানগুলোতে তা কমে আনুমানিক ৪৫ থেকে ৯০ মিনিটে নামতে পারে। এতে স্থানীয় হোটেল, লজ, চা-দোকান ও ট্রেকিং ব্যবসারও অর্থনৈতিক সুবিধা হবে।
গৌতম ২০২২ সালে এভারেস্ট ক্রনিকলে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে প্রথম প্রকাশ্যে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প স্থানান্তরের প্রস্তাব করেন। তার যুক্তি, দ্রুত গলে যাওয়া খুম্বু হিমবাহের কারণে একসময় এই জায়গাটি আর ব্যবহারের উপযোগী থাকবে না। এই সম্প্রতি গবেষণাটি সেই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি, যেখানে বেস ক্যাম্পের মানুষের কর্মকাণ্ড কীভাবে স্থানীয় বরফ গলতে ভূমিকা রাখছে তা প্রথমবারের মতো পরিমাপমূলকভাবে (কোয়ান্টিটেটিভলি) মূল্যায়ন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে খিম লাল গৌতম বলেছেন ‘গবেষকরা কোনো নীতি নির্ধারণ বা তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। তবে গবেষণার সারাংশে তারা উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে যদি বর্তমান এভারেস্ট বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও নিরাপদ বিকল্প স্থানগুলো নিয়ে এখন থেকেই গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ।’
গবেষণাটির মূল বার্তা, এভারেস্টে মানুষের কর্মকাণ্ড ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যৌথ প্রভাব খুম্বু হিমবাহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতের নিরাপদ ও টেকসই পর্বতারোহণের জন্য বেস ক্যাম্পের অবস্থানও নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।






