ইসলামে আমানতদারের দায়িত্ব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষ তার কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে রাখতে চায়। কেউ সন্তানের পড়াশোনার জন্য, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য, কেউ চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সঞ্চয় করেন। কেউ প্রবাসে মাসের পর মাস পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠান পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য। কেউ অবসরজীবনের কথা ভেবে সামান্য সামান্য করে সঞ্চয় করেন। এসব অর্থের পেছনে শুধু টাকা থাকে না; থাকে মানুষের ঘাম, শ্রম, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। তাই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সে অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন। যেখানে ব্যক্তির মধ্যে কাজ করে বিরাট একটি বিশ্বাস। কারণ মানুষ মনে করে, প্রয়োজনের সময় তার অর্থ নিরাপদে ফিরে পাবে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষতিটা শুধু টাকার অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে আঘাত আসে মানুষের আস্থা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
এ কারণেই ইসলাম মানুষের জীবনকে আমানতদারির শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে চায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দাও’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)। আয়াতটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে কারও কাছে রাখা টাকা-পয়সা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ নয়; মানুষের ওপর অর্পিত সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার একটি মৌলিক নীতি এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী তার দায়িত্বে যে অর্থ, নথি, তথ্য বা সম্পদ পান, সেগুলোও আমানত। কোনো ব্যাংকার গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যের যে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, সেটিও আমানত। কোনো ব্যবসায়ী ক্রেতার সঙ্গে যে চুক্তি করেন, সেটিও আমানতের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির হাতে জনগণের সম্পদ ও ক্ষমতাও একধরনের আমানত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আমানতদারিকে ইমানি চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত তাকে ফিরিয়ে দাও এবং যে তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তুমি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৪)। সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের জন্য এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের অসততার কারণে নিজের সততা বিসর্জন দেওয়া ইসলামের নীতি নয়; বরং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্যের সম্পদে হাত না দেওয়াই প্রকৃত আমানতদারি।
ইসলামে মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
তবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ক্ষতি হলেই তাকে আমানতের খেয়ানত বলা ঠিক হবে না। ব্যবসায় ঝুঁকি থাকে, বিনিয়োগে লোকসান হতে পারে, বাজারের পরিবর্তনে সংকট তৈরি হতে পারে, এমনকি ব্যবস্থাপনার ভুলও হতে পারে। এসবের সঙ্গে ইচ্ছাকৃত আত্মসাৎ, প্রতারণা, অর্থ পাচার, তথ্য গোপন বা গ্রাহকের অর্থ অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। ইসলামে মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো সংকটকে বিচার করতে হলে তার কারণ ও দায় যথাযথভাবে নির্ণয় করা জরুরি।
অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোর একটি হলো আস্থা। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে, কারণ ব্যাংকের ওপর তার বিশ্বাস আছে। ব্যবসায়ী বাকিতে পণ্য দেন, বিনিয়োগকারী অর্থলগ্নি করেন, উদ্যোক্তা অংশীদারের সঙ্গে চুক্তি করেন, মানুষ নিজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়— সবকিছুর পেছনেই কোনো না কোনো মাত্রায় বিশ্বাস কাজ করে। সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে গেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সংকুচিত হতে থাকে। মানুষ বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়, লেনদেনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা খোঁজে এবং প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ প্রবেশ করে।
আমানতদারির সংকটের মানবিক মূল্য আরও গভীর। একটি হিসাবের খাতায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোটি টাকাও হয়তো ছোট্ট একটি সংখ্যা। কিন্তু সেই অর্থ যখন বহু মানুষের সঞ্চয় হয়, তখন প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি করে গল্প। কারও সন্তানের চিকিৎসা, কারও পড়াশোনা, কারও ব্যবসার মূলধন, কারও অবসরজীবনের নিরাপত্তা। তাই মানুষের সঞ্চয় নিয়ে অনিয়মের ঘটনা শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; অনেক সময় এতে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন ও নিরাপত্তার ওপরও আঘাত আসে।
তাই তো ইসলাম দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততার পাশাপাশি যোগ্যতারও গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, হে আমার পিতা, আপনি তাকে মজুর হিসেবে নিযুক্ত করুন। কারণ, আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সে ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬)। অর্থাৎ দায়িত্বশীল পদে শুধু সৎ মানুষ হলেই হবে না; তাকে দায়িত্ব পালনের যোগ্যও হতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল খাতে দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহির সমন্বয় অপরিহার্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)। এই জবাবদিহি শুধু আদালত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে নয়, আল্লাহর কাছেও। তাই শক্তিশালী আইন, কার্যকর অডিট, স্বচ্ছ হিসাব ও কঠোর নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যক্তিগত আল্লাহভীতি।
আমানতদারির সংকট শুধু ব্যাংক খাতের সংকট নয়; এটি আমাদের সামাজিক চরিত্রেরও সংকট। পণ্যের ওজনে কম দেওয়া, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বে ফাঁকি দেওয়া, কারও অর্থ আত্মসাৎ করা কিংবা চুক্তি ভঙ্গ করা— সবই একই নৈতিক অবক্ষয়ের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। ছোট জায়গার অসততা একসময় বড় প্রতিষ্ঠানের বড় অনিয়মে পরিণত হতে পারে।
তাই একটি সুস্থ ও নিরাপদ অর্থনীতি গড়তে শুধু মূলধন ও অবকাঠামোর জোগান দেওয়া যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান। আইন অপরাধ দমন করবে, প্রতিষ্ঠান তার ব্যবস্থাপনা শক্ত করবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নজরদারি করবে। কিন্তু মানুষের অন্তরে যদি আমানতের গুরুত্ব না থাকে, তাহলে কোনো ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন টেকসই থাকে না। ব্যাংকের ভল্টে জমা থাকা টাকায় মিশে থাকে মানুষের ঘাম, শ্রম, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ; জমা থাকে বুকভরা বিশ্বাস। অর্থের সঙ্গে জমা থাকা সেই বিশ্বাসের হেফাজত করাও একধরনের আমানত। সুতরাং সেই আমানতের খেয়ানত শুধু একজন মানুষের ক্ষতি করে না, ধীরে ধীরে সমাজের ভিতও দুর্বল করে দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক





