উপকূলে আশার আলো মিনারা

রাস্তার পাশে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে খাবার দিচ্ছেন মিনারা খাতুন
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপের মিনারা খাতুন (২৫) স্কুলজীবন থেকেই সামাজিক ও মানবিক নানা কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এই তরুণী উপকূলীয় অঞ্চলের অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের সেবায় স্থাপন করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত।
মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পরিচর্যা ও খাদ্য-পোশাক বিতরণ, এতিমদের বই ও পোশাক প্রদান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ, অসচ্ছলদের খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দেন তিনি। গত ৮ বছরে রোগীদের জন্য নিজে রক্তদানের পাশাপাশি ২ হাজার ব্যাগের বেশি রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন। করোনাকালে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ, ১০ দরিদ্র নারীকে সেলাই মেশিন প্রদান এবং সামজিক ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সুবিধাবঞ্চিতদের সহায়তা দেন মিনারা।
সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মিনারা খাতুন ২০২৪ সালে সমাজসেবা ক্যাটাগরিতে উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ‘জয়ীতা’ পুরস্কার পান। একই বছর খুলনা জেলায় সর্বোচ্চ পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়ায় বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম পুরস্কার অর্জনসহ ‘অদম্য নারী’ সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০২৪ সালে স্নাতক পাস করা মিনারা বললেন, ‘স্কুলজীবন থেকেই নিজের ভালোলাগা থেকে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে নিজেকে সার্থক মনে হয়।’ ভবিষ্যতে নিজের সামর্থ্য হলে একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলার ইচ্ছা আছে মিনারার। বাকি জীবন মানুষের সেবায় কাটিয়ে দিতে চান তিনি। মিনারা স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘দাকোপ উপজেলা ব্লাড ব্যাংক’-এর কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চালনা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আচাঁভূয়া মহল্লার বাসিন্দা মিনারা। বাবা-মা ও চার ভাইবোন নিয়ে তাদের পরিবার। ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট মিনারা। তিনি যুবরাজ শিশু বিদ্যা নিকেতন নামে একটি স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত।
মিনারা জানিয়েছেন, তার এক ভাই প্রবাসে থাকেন। নিজের বেতনের টাকা ও প্রবাসী ভাইয়ের আর্থিক সহায়তায় তিনি মানবকল্যাণমূলক এসব কর্মকাণ্ড চালান।
মিনারার কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া এক নারী শিল্পী মণ্ডল (৩০)। তার ভাষ্য, ‘বিপদের দিনে মিনারা আপা যেভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা কোনো দিন ভোলার মতো নয়। তার দেওয়া সেলাই মেশিন দিয়েই আজ আমার সংসার চলছে। তিনি শুধু সাহায্যই করেন না, নিজের বোনের মতো খোঁজখবরও রাখেন।
উপজেলার কাটাবুনিয়া এলাকার মহিউদ্দিন গাজী (৬০) জানালেন, ‘আমার মেয়ের জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন ছিল। কোথাও রক্ত পাচ্ছিলাম না। তখন মিনারা আপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রক্তের ব্যবস্থা করে দেন।’
মিনারার সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেছেন, মিনারা উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার যুবসমাজের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম। নিজের পড়াশোনা সামলানোর পাশাপাশি স্বেচ্ছায় রক্তদান, পথশিশুদের সহায়তা ও সমাজসেবায় তিনি যে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। মিনারার মতো তরুণ-তরুণীরাই আগামীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার মূল কারিগর। তার যেকোনো ভালো উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা পাশে থাকবে।





