যাত্রী নিয়ে কমলাপুর যাবে জুনে
মেট্রোর শেষ ১ কিলোমিটারেই সাড়ে ৪ বছর
- উত্তরা-মতিঝিল প্রতি কিমি নির্মাণে লেগেছে ৩ মাস ২২ দিন
- ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু

মতিঝিল থেকে কমলাপুর— মেট্রোরেলে দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার। অথচ সামান্য এ পথের নির্মাণেই লেগে যাচ্ছে প্রায় চার বছর। কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। পূর্তকাজের পাশাপাশি চলছে বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক ও স্থাপত্যকাজ। এরপর শেষ করতে হবে ইলেকট্রোমেকানিক্যালসহ নানা কারিগরি কাজ। সব মিলিয়ে আগামী জুনে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হবে পরীক্ষামূলক চলাচল।
অথচ দেশের মেট্রোরেল নির্মাণের প্রথম অভিজ্ঞতায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ তৈরি করতে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে সময় লেগেছিল ৩ মাস ২২ দিন। তখন মেট্রোরেল নির্মাণে অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রস্তুতির ঘাটতিও ছিল। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শিখতে শিখতেই কাজ এগিয়ে নিতে হয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা থাকার পরও মাত্র এক কিলোমিটারের কাজে প্রায় চার বছর লেগে যাচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কথা, কারিগরি জটিলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তনের প্রভাবেও কাজের গতি ব্যাহত হয়েছে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আজকের এ অবস্থার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দায় নিতে হবে। তারা চলমান কাজ চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। আরও আগেই কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রো চলে যেত। খরচ কমানোর নামে কালক্ষেপণ হয়েছে। আদতে খরচ কমেনি। উল্টো দুই বছর মেট্রো পিছিয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।’
মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) জুলাই অগ্রগতি প্রতিবেদন বলছে, মতিঝিল-কমলাপুর অংশের পূর্তকাজের অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ। কমলাপুর মেট্রো স্টেশনের কাঠামোগত কাজও শেষ। এখন চলছে বৈদ্যুতিক ও স্থাপত্যকাজ। এসব কাজ জানুয়ারির মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য।
তবে পূর্তকাজ শেষ হলেই এ অংশে মেট্রোরেল চালানো যাবে না। রেললাইন, সংকেত, বিদ্যুৎ, স্বয়ংক্রিয় ভাড়া সংগ্রহ ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর, টেলিযোগাযোগ, লিফট ও এসকেলেটরসহ সাতটি ইলেকট্রোমেকানিক্যাল উপব্যবস্থার কাজও শেষ করতে হবে। এসব কাজের অগ্রগতি এখনো ৪৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এরপর বিভিন্ন ব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সমন্বয়ের জন্যও সময় প্রয়োজন হবে।
এ কারণে ফেব্রুয়ারিতে মতিঝিল-কমলাপুর অংশে মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। জুনে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরুর আগে কয়েক ধাপে পরীক্ষা চালানো হবে। প্রথম দিকে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের দরজা খোলা-বন্ধের ব্যবস্থা ছাড়াই ট্রেন চালানো হবে। কারণ তখন সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ নাও হতে পারে। পরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন কারিগরি ব্যবস্থা যুক্ত করে মেট্রোরেলকে বাণিজ্যিক চলাচলের উপযোগী করা হবে।
কমলাপুরে পৌঁছাতে এত দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সব কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একসঙ্গে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। নির্মাণকাজ আগামী জানুয়ারির মধ্যে শেষ হলেও কিছু কারিগরি কাজ বাকি থেকে যেতে পারে। তবে ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানোর লক্ষ্যেই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ট্রায়াল শুরু হলেও বাকি কাজ চলতে থাকবে।’
২০১২ সালে অনুমোদনে কমলাপুর ছিল না। উত্তরার ট্রেন মতিঝিল এসেই থামার কথা। ২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) লাইন-৬ কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ হয়। ২০২০ সালে এসে অ্যালাইনমেন্ট অনুমোদন, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে লক্ষ্য ছিল চালুর। তবে সেই সীমা পেরিয়ে এখন লক্ষ্য ২০২৭ সালের জুন। এ হিসাবে নির্মাণসহ এক কিলোমিটার পর চালু করতে সময় লাগছে সাড়ে চার বছর।
উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন হয় ২০১৬ সালের ২৬ জুন। পরের বছর ২০১৭ সালে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়। মতিঝিল পর্বের উদ্বোধন হয় ২০২৩ সালে। সে হিসেবে উত্তরা-মতিঝিল ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার মেট্রোরেল বাণিজ্যিকভাবে চালু হতে সময় লেগেছে ৬ বছর ৩ মাস। হিসাব করলে প্রতি কিলোমিটারে সময় পড়েছে ৩ মাস ২২ দিন।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারানোর পর বন্ধ হয়ে যায় এ অংশের নির্মাণকাজ। তারপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বরাদ্দ করা অর্থে কাজ করতে রাজি হননি ঠিকাদার। লম্বা বিরতির পর প্রায় ১৯১ কোটি টাকা বেশিতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কাজে ফেরে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। মূলত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, ডলার উন্মুক্ত করা, কাঁচামাল সরবরাহে জটিলতা, পরিবহন খচর— সব মিলিয়ে নির্ধারিত বরাদ্দে কাজ করতে রাজি হচ্ছিলেন না পুরনো ঠিকাদার। তাই পুরনো দরে নতুন চুক্তি করা যাচ্ছিল না। এরপর নতুন দরে চুক্তি করা হয়।
নির্মাণকাজ চলে দুই ভাগে। একটি অবকাঠামোভিত্তিক। অন্যটি কারিগরি। অবকাঠামোর কাজে তেমন সমস্যা না হলেও আটকে ছিল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, লিফট, একসেলেটর, ট্রেনের দরজার সঙ্গে মিলিয়ে দরজা খোলার গেট, মনিটর, সিসিটিভি, সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন যোগাযোগ স্থাপনের কাজ। প্রকৌশলের ভাষায় পুরো বিষয়টিকে এক শব্দে ‘ইলেকট্রোমেকানিক্যাল’ বলা হয়। এ খাতের সমস্যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
দেশের প্রথম মেট্রোরেল হিসেবে এমআরটি লাইন-৬-এর উত্তরা-আগারগাঁও অংশ উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর। শুরুতে এ অংশের সব স্টেশন একসঙ্গে চালু হয়নি; ধাপে ধাপে স্টেশনগুলো চালু করা হয়। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো অংশ চালু হয়।
প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এমআরটি লাইন-৬ উত্তরা থেকে কমলাপুর দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। কমলাপুর যুক্ত হওয়ায়, স্টেশনের নকশায় পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫২ শতাংশ।





