বিষ ও আগুনে বিপন্ন সুন্দরবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সুন্দরবনের গভীরে জোয়ার আসে তার চিরচেনা ছন্দে। খালের পানি ছুঁয়ে যায় গাছের শিকড়, কাদার ভেতর ছোটে কাঁকড়া, চিংড়ি ও ছোট মাছ। এই স্বাভাবিক জীবনচক্রের মধ্যেই এখন গোপনে মিশে যাচ্ছে কীটনাশক ও বিষাক্ত রাসায়নিক। কিছু সময় পর পানিতে ভেসে উঠছে মাছ, কূলে উঠে আসছে চিংড়ি। তারপর সেই মৃত চিংড়ি শুকাতে বনের মধ্যেই জ্বালানো হচ্ছে আগুন। জলের ভেতর বিষ, ডাঙায় আগুন। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ যুগল আঘাত আর কী হতে পারে?
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সুন্দরবনের কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বন বিভাগ বিষ দিয়ে ধরা বিপুল পরিমাণ মাছ, চিংড়ি শুঁটকি, কীটনাশক, বিষাক্ত রাসায়নিক, নৌকা ও জাল জব্দ করেছে। শুঁটকি তৈরির কয়েকটি অস্থায়ী আস্তানাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের অভিযোগ, কিছু অসাধু মাছশিকারি জোয়ারের শুরুতে ছোট খালের মুখে কীটনাশক ও রাসায়নিক ঢেলে দেয়। জোয়ারের স্রোতে বিষ ছড়িয়ে পড়ে খালের ভেতরে। বিষক্রিয়ায় চিংড়ি কিনারে উঠে আসে, অন্য মাছ দুর্বল হয়ে পানিতে ভাসতে শুরু করে। পরে সহজেই সেগুলো সংগ্রহ করা হয়।
বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনাকে শুধু অবৈধ মাছ শিকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সুন্দরবনের একটি খাল নিজেই অসংখ্য প্রাণের আশ্রয় ও প্রজননক্ষেত্র। সেখানে মাছের পাশাপাশি থাকে চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, মাছের ডিম, পোনা, প্ল্যাঙ্কটন, জলজউদ্ভিদ ও অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণী। বিষাক্ত রাসায়নিক পানিতে ছড়িয়ে পড়লে এসব প্রাণও আক্রান্ত হয়। এক প্রজাতির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব অন্য প্রাণীর খাদ্য ও প্রজননের ওপর পড়ে। এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র। এ ক্ষতি অনেক সময় চোখে ধরা পড়ে না; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে খালের স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা কমে যায় এবং হারিয়ে যেতে পারে স্থানীয় অনেক জলজ প্রজাতি।
আরেকটি বড় বিপদ— বনের ভেতরে আগুন। বিষে মারা চিংড়ি শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির জন্য আগুন জ্বালানোর অভিযোগ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক
সুন্দরবনের গুরুত্ব বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে রামসার সাইটের মর্যাদা পেয়েছে। ম্যানগ্রোভ বনটির নদী, খাল ও জলাভূমি বহু প্রজাতির মাছ, পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাস এবং প্রজননক্ষেত্র। রামসার সাইটের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে। ফলে খালে বিষ প্রয়োগ শুধু স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতি করছে না, আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলাভূমির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দায়িত্বও কঠিন করে তুলছে।
এ ধরনের অপরাধের পেছনে দ্রুত বেশি মাছ পাওয়ার লোভ বড় কারণ। স্বাভাবিক উপায়ে মাছ ধরতে সময় ও শ্রম লাগে। বিষ প্রয়োগে অল্প সময়ে অনেক মাছ সংগ্রহ করা সম্ভব। এর সঙ্গে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র, দুর্বল নজরদারি এবং বিষাক্ত রাসায়নিক সহজে সংগ্রহের সুযোগ। বিষ দিয়ে ধরা মাছ যদি সহজেই বাজারে বিক্রি করা যায়, তাহলে অপরাধীদের লাভের পথও খোলা থাকে। তাই শুধু বনের ভেতরে অভিযান চালিয়ে এই চক্র পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না।
এর সরাসরি ঝুঁকি রয়েছে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও। সাধারণ ক্রেতার পক্ষে দেখে বোঝা সম্ভব নয় কোন মাছ স্বাভাবিকভাবে ধরা হয়েছে, আর কোনটি বিষের সংস্পর্শে এসেছে। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা মাছ ও চিংড়ি মানুষের খাবারের পাতে পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘদিন এমন মাছ খেলে শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা নিয়ে আরও গবেষণা দরকার। পাশাপাশি বাজারে বিক্রি হওয়া মাছের নিরাপত্তা পরীক্ষার ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় বিপদ— বনের ভেতরে আগুন। বিষে মারা চিংড়ি শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির জন্য আগুন জ্বালানোর অভিযোগ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সুন্দরবনের শুকনো পাতা, ডালপালা ও মাটিতে জমে থাকা দাহ্য উপাদানে সামান্য অসতর্কতা থেকেও আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। অতীতেও সুন্দরবনে একাধিক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ফলে একটি অবৈধ কাজের সঙ্গে আরেকটি বড় পরিবেশগত ঝুঁকি যুক্ত হচ্ছে।
বন বিভাগের সাম্প্রতিক অভিযান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও জব্দ ও উচ্ছেদের মধ্যে কার্যক্রম সীমিত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া সম্ভব নয়। কারা বিষাক্ত রাসায়নিক সরবরাহ করছে, কারা খালে প্রয়োগ করছে, কোথায় শুঁটকি তৈরি হচ্ছে, কারা এসব মাছ কিনছে এবং কোন পথে বাজারে যাচ্ছে— পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা দরকার। বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের অংশগ্রহণ এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বনের কোন খালে সন্দেহজনক তৎপরতা চলছে, কারা নিয়মিত যাতায়াত করছে, কোন পথে মাছ বাইরে যাচ্ছে— এসব তথ্য স্থানীয় মানুষের কাছেই বেশি থাকে। তাদের জন্য নিরাপদে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে নজরদারি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ খালগুলোয় টহল বাড়ানো, কীটনাশক ও বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির ওপর নজরদারি জোরদার করা, মাছের বাজারে নিয়মিত পরীক্ষা চালানো এবং অপরাধী ও ব্যবসায়ী চক্রকে আইনের আওতায় আনা এখন জরুরি। রামসার সাইট হিসেবে সুন্দরবনের নদী ও খালের পানির মানও নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। পাশাপাশি জেলেপল্লিতে বিষ দিয়ে মাছ ধরার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সুন্দরবন রক্ষার অর্থ শুধু বাঘ আর গাছ রক্ষা করা নয়। একটি ছোট চিংড়ি, মাছের পোনা, কাঁকড়া, পাখি, জলজউদ্ভিদ থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রাণ মিলে গড়ে উঠেছে এখানকার জীববৈচিত্র্য। আগামী দিনে সেখানে মাছ কমে গেলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বননির্ভর পরিবারগুলো। প্রকৃতিকে নিঃশেষ করে কোনো জীবিকা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জলের বিষ ও বনের আগুন থামানো সুন্দরবনের সঙ্গে মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং আগামী দিনের নিরাপত্তা রক্ষারও লড়াই।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী





