নাচে সফল হব এটি তো কল্পনাই করিনি

আড্ডায় মেতে উঠেছেন শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নীপা। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
শিল্পকলা ও একুশে পদকজয়ী নৃত্যশিল্পী শিবলী মোহাম্মদের জন্মদিন আগামীকাল। এই উপলক্ষে বিশেষ আমন্ত্রণে তার মুখোমুখি হয়েছেন আরেক একুশে পদকজয়ী নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপা।
শামীম আরা নীপা: মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের একটি ইতিহাস আছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের এগুলো জানা উচিত। তোদের পরিবার একাত্তরের পর কীভাবে চলেছে?
শিবলী মোহাম্মদ: আমার বাবা সলিম উল্লাহ ৪৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যখন শহীদ হন, মা জেবুন্নেসা সলিম উল্লাহ তখন একেবারেই তরুণী। আম্মাকে ১০টি সন্তান নিয়ে জীবনযুদ্ধে নামতে হয়েছিল। আমার ছোট যমজ বোনদের বয়স তখন ছয় মাস বা এক বছরের মতো। বড় ভাই শামীম মোহাম্মদের বয়স ২০ বা ২১ বছর। তিনি ভারতের দেরাদুন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে চাঁদপুরের কচুয়ার থানা কমান্ডার ছিলেন। খুবই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমার বাবা ও ভাইয়ের নামে একটি রাস্তা আছে ইলিয়টগঞ্জ থেকে সাচার বাজার পর্যন্ত। আর বাবার নামে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের একটি সড়কের নাম আছে। আমাদের ১০ ভাইবোনকে মা গ্র্যাজুয়েট করেছেন। ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হবে— এই স্বপ্ন ছিল তার।
শামীম আরা নীপা: অনেক স্ট্রাগল করেছেন তিনি।
শিবলী মোহাম্মদ: কাপড় সেলাই করে, এমব্রয়ডারি করে; নানা জায়গায় সেগুলো সাপ্লাই দিয়ে খরচ জুগিয়েছেন। সকালে আমাদের ঘুমে রেখেই বাজার করতেন; রান্না শেষে বেরিয়ে পড়তেন। সারা দিন বিভিন্ন দোকানে আর বাড়িতে দিয়ে আসতেন কাপড়গুলো। বাড়ি ফিরে আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতেন। আমাদের বাসায় সবসময়ই মেহমান লেগে থাকতো। আম্মা সেসব সামলাতেন। অবাক হয়ে ভাবি, একজন মানুষের পক্ষে এক জীবনে কত রকম ত্যাগ করা সম্ভব! আমরা শহীদদের অনেক ক্রেডিট দিয়েছি। কোনো সরকার কিন্তু মায়েদের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যত শহীদের সন্তান মানুষ হয়েছে, তাতে মায়েদের যে অবদান, সেটিও কিন্তু বিবেচনায় আসা উচিত ছিল। এমন মায়েরা কিন্তু মা ও বাবা— দুটি রোলই প্লে করেছেন। তারা সন্তানদের দিকে তাকিয়ে সারা জীবন পার করে দিয়েছেন।
আমাকে অনেক অসহায় করে সাদি চলে গেছেন। আমাদের সঙ্গে সমগ্র জাতির সঙ্গে সাদি খুব অন্যায় করেছেন। পৃথিবীর যেখানেই যাই সেখানেই মানুষ আমার হাত ধরে বলে ‘তিনি এই কাজ (আত্মহত্যা) কীভাবে করলেন?’ অনেকে কেঁদে ফেলেন
শামীম আরা নীপা: এখন তোর প্রসঙ্গে আসি— জন্ম, বেড়ে ওঠা...
শিবলী মোহাম্মদ: এই মোহাম্মদপুরেই। মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিকসে অনার্স। ভারতের দিল্লি কত্থক কেন্দ্র থেকে কত্থকের ওপর চার বছরের ডিপ্লোমা করেছি। তার পরে লন্ডন ব্যালে থিয়েটার স্কুল থেকে ব্যালে ও কোরিওগ্রাফির ওপর এক বছরের সার্টিফিকেট কোর্স করেছি। তার পর থেকে নৃত্যাঞ্চল নিয়ে তোর সঙ্গে আমার দীর্ঘ পথচলা। শিল্পকলায় চাকরি করেছি বহু বছর। নাচ নিয়ে প্রায় সারা পৃথিবী ঘুরেছি।
শামীম আরা নীপা: আমাদের দেশের ছেলেদের নাচ করাটা একেবারেই স্রোতের বাইরের বিষয়। মেয়েদেরই তো কঠিন ছিল, একটা সময় ক্লাস এইট-নাইন পর্যন্ত পড়বে ও নাচবে। তারপর আর নাচবে না। মানে যেকোনো পরিবার থেকেই বাধার মুখে পড়তে হতো। তোর ক্ষেত্রে বিষয়টি কেমন?
শিবলী মোহাম্মদ: আমি যে নাচব, সে কথাই জানতাম না। আমাদের পরিবারে ছোট থেকে গানের চর্চা ছিল। বড় বোন গান গাইতেন। মেজো ভাই সাদি মহম্মদ, আমি... মানে আমার ছোট ভাইবোনরাও গান শিখত। বাড়িতে হারমোনিয়াম ছিল। খালা গান শেখাতেন।
শামীম আরা নীপা: ওই সময়ে তো ঘরে ঘরে চর্চা ছিল।
শিবলী মোহাম্মদ: আমরাও গানের চর্চা করতাম। আমি ছায়ানটে ভর্তি হলাম গান শেখার জন্য। মোটামুটি গাইতাম। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে খুব গান গেয়েছি। ছায়ানটে গান শিখতে গিয়ে কাচের দেয়ালের ওপাশ থেকে নাচের ক্লাস দেখতাম। আমার আগ্রহ হলো, একটু নাচ শিখি না! তারপর গানের পাশাপাশি নাচের ক্লাসেও ভর্তি হলাম।
গুরু পূর্ণিমা পান্ডে বললেন, ‘শিবলী, তুমি এই স্কুলে থাকলে ভালো ড্যান্সার হতে পারবে না। তুমি পণ্ডিত বিরজু মহারাজের কাছে দিল্লিতে যাও।’ মহারাজজি বললেন, ‘নিতে পারি এক শর্তে, ছয় মাস দেখব।’ দিন-রাত প্র্যাকটিস করতাম। মহারাজজি একসময় বললেন, ‘ও অনেক ভালো, আমার কাছেই থাকবে।’
শামীম আরা নীপা: নিজের আগ্রহে?
শিবলী মোহাম্মদ: হ্যাঁ। তখন কার্তিক সিং, অজিত দে, অনিতা দে— এমন বড় বড় গুরু আমাদের নাচ শেখাতেন। তারা আমাকে এক বছরেই অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন। একটা সময় আইসিসিআর স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম। এই স্কলারশিপই আমার জীবনটাকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
শামীম আরা নীপা: ফিজিকসের স্টুডেন্ট হওয়ার পরও স্কলারশিপ নিয়ে নাচের জন্য বিদেশে যাওয়াকে তোর পরিবার কীভাবে দেখেছিল?
শিবলী মোহাম্মদ: খুবই ডেঞ্জারাসভাবে! সাদি ভাই তখন খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। সব ছেড়ে তিনি আইসিসিআর স্কলারশিপ নিয়ে ভারতে চলে গেলেন। ঠিক তারপরই আমি, ফিজিকসের ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। একদিন আমারও চিঠি এলো, আইসিসিআর স্কলার হিসেবে ভারতে যাব। আম্মা বললেন, ‘শিবলীর যাওয়ার প্রশ্নই আসে না!’ তবে শামীম ভাইয়ের বিরাট সাপোর্ট পেলাম। আমাকে নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল। তিনি বললেন, ‘আম্মা, ওকে যেতে দেন; ও নাচতে চায়। কিছু হবে না।’ আমি আম্মাকে কথা দিলাম, অনার্স পাস করব। তখন তিনি সম্মতি দিলেন।
শামীম আরা নীপা: ভারতের জীবন কেমন ছিল?
শিবলী মোহাম্মদ: প্রথমে গেলাম ভাতখন্ডে মিউজিক ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে ভাতখন্ডে সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়)। সেখানে আসামের অনেক ছেলে থাকত। তাদের সঙ্গে মেসে থাকতাম। ওখানে খুব কষ্ট করতাম। একসময় পরম শ্রদ্ধেয় গুরু পূর্ণিমা পান্ডে বললেন, ‘শিবলী, তুমি এই স্কুলে থাকলে ভালো ড্যান্সার হতে পারবে না। তুমি পণ্ডিত বিরজু মহারাজের কাছে দিল্লিতে যাও।’ তিনি মহারাজজির কাছে চিঠি লিখে দিলেন। গেলাম মহারাজজির কাছে। তিনি তো এমন আনকোরাদের নেবেন না। তারা সব অ্যাডভান্সড ছেলেমেয়েকে নেন। আমি বাংলাদেশি জেনে বললেন, ‘আমার তো বাংলাদেশের কোনো স্টুডেন্ট নেই।’ আমার গুরুবোন মানে মহারাজজির প্রবীণ শিষ্যা শাশ্বতী সেন তখন মহারাজজিকে বললেন, ‘আমারও অরিজিন বাংলাদেশে। আপনি এই ছেলেকে নিয়ে নেন। ওকে দেখে মায়া লাগছে।’
শামীম আরা নীপা: মহারাজজি কী বললেন?
শিবলী মোহাম্মদ: মহারাজজি বললেন, ‘নিতে পারি এক শর্তে, ছয় মাস দেখব।’ শুরু হলো। দিন-রাত প্র্যাকটিস করতাম। মহারাজজি একসময় বললেন, ‘ও অনেক ভালো, আমার কাছেই থাকবে।’ পণ্ডিত বিরজু মহারাজ আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরু। তিনি আমার জীবনকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তুই নিজেই দেখেছিস, তিনি বাংলাদেশে আমার বাড়িতে এসেছেন, খাওয়া-দাওয়া করেছেন; কী রকম স্নেহ আমাকে করতেন। এদিক দিয়ে আমি অনেক ভাগ্যবান।
শামীম আরা নীপা: ভারত থেকে ফেরার পর কী হলো?
শিবলী মোহাম্মদ: তখন কিন্তু আমরা কেউই জানি না কে কোথায় যাব, কী করব। তখনকার গল্পটিও মজার। তখন শামীম আরা নীপা তো বাংলাদেশের সুপারস্টার। আমার সঙ্গে তোর তখন ‘হ্যালো, হাই’ ছাড়া কিছু ছিল না। একটিই টেলিভিশন ছিল— বিটিভি। সবাই দেখত। সন্ধ্যার পর মানুষের কাজই ছিল বিটিভি দেখা। টিভিতে গেলেই হয় নীপার ‘হীরামন’, নয় নাটক, নয় ‘আনন্দমেলা’, নয় নীপার মডেলিং। সেই সময় আমি একদম অনামি মাত্র শিখে এসেছি। আমরা একটি-দুটি শো করি। খ ম হারূনের ‘প্রচ্ছদ’ অনুষ্ঠানে একটি শো করলাম। কবি আসাদ চৌধুরী আমার ইন্টারভিউ নিলেন। তার পরে ‘সৃষ্টিশীল উল্লাসে’ নামে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে নাচ করলাম সাভার স্মৃতিসৌধে। ওই নাচ দেখার পরে সবার মুখে মুখে, ‘আরে, একটি ছেলে এসেছে, দারুণ নাচে!’ আমি এরকমভাবে লোকের মুখে মুখে ফিরলাম। নাচে সফল হব— এটি তো কল্পনাই করিনি।
শামীম আরা নীপা: তার পরের ঘটনা?
শিবলী মোহাম্মদ: আরও ইন্টারেস্টিং। তখন তুই সম্ভবত ভেবেছিলি, একটি ছেলে পেলে আরও একটু ভালো নাচতে পারবি। একদিন আমাদের বাড়িতে এসে বললি, ‘আমরা একসঙ্গে একটি নাচ করব।’ তখন তো তোকে দেখার জন্য বাড়ির বাইরে রীতিমতো ভিড়। তারপর তোর সঙ্গে শো করলাম। আমার মনে হয়, বিটিভির সেই একটি অনুষ্ঠানই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ করে দিয়েছে— ‘তারানা’। সেটি ছিল ধ্রুপদি অনুষ্ঠান। ওখানে তুই আর আমি প্রথম রবিশংকরের তারানা পারফর্ম করলাম। এর পর থেকে তো আমাদের দুজনের একসঙ্গে নাচার সেই যাত্রা আজো চলছে।
শামীম আরা নীপা: এটি কিন্তু এক্কেবারে লাক বলে আমি মনে করি। কারণ, অনেকের সঙ্গে অনেক দিন ধরে নাচি। কিন্তু তোর আর আমার ওই একটি নাচের পর আমাকে আর বলতে হয়নি যে ‘শিবলীকে নাও’। এর আগে কিন্তু কিছুটা বলতে হয়েছে, ‘একটি ছেলে এসেছে বা শিবলীর সঙ্গে করলে ভালো হয়।’ যোগ্যতা থাকলেও লোকের কাছে পৌঁছানোটা আমার মনে হয় একরকম ভাগ্যের ব্যাপার।
শিবলী মোহাম্মদ: হ্যাঁ, এটি ভাগ্য। অনেকেই বলেন, ‘আপনারা জুটি।’ জুটি কিন্তু আমরা ওভাবে হইনি; মানুষই আমাদের জুটি বানিয়ে দিয়েছে।
শামীম আরা নীপা: এ দেশে তোর মাধ্যমে কত্থক নাচ ছড়িয়ে পড়েছে।
শিবলী মোহাম্মদ: আমি দেশে ফিরে কত্থক করতে লাগলাম। টেলিভিশনে, বিভিন্ন জেলায় ওয়ার্কশপ হতো। শিল্পকলা থেকে নানা জায়গায় পাঠাত। তখন টিভিতে দেখে অনেক ছেলেমেয়ে আগ্রহী হলো। আমার মনে আছে, সারা দেশ থেকে যারা টিচার ছিলেন, প্রত্যেকে আমার বাসায় এসে কত্থকের তালিম নিতেন; তারপর এই নাচকে তারা আবার নিজ নিজ জায়গায় গিয়ে শেখাতেন। শিখিয়ে একে অনেকটা ছড়িয়ে দিয়েছেন, জনপ্রিয় করেছেন। আবার শিল্পকলা থেকে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে আনা হয়েছে বা আমাদের পাঠানো হয়েছে— এভাবে ধ্রুপদি নাচের কিন্তু যথেষ্ট অবস্থান তৈরি হয়েছিল। আমি বলব, লোক ও সৃজনশীলের চেয়ে কিন্তু ধ্রুপদি— কত্থক, ভরতনাট্যম, মণিপুরি— নাচের চর্চাই বাংলাদেশে এখন অনেক বেশি হয়।
শামীম আরা নীপা: এই অঙ্গনে টিকে থাকতে মানুষের ভালোবাসা, নাচের প্রতি আমাদের নিবেদন অনেকটাই সাহায্য করেছে।
শিবলী মোহাম্মদ: মানুষের ভালোবাসা নিয়েই তো আমরা সারা পৃথিবী ঘুরলাম। কত অনুষ্ঠান করলাম একেকটা দেশে। একটি সময় ছিল, যখন নাচ করতাম শুধুই মনের আনন্দে। আমাদের আর কোনো কিছুর ভাবনা ছিল না। বিভিন্ন ধরনের কাজ হতো। শুধু গতানুগতিক নাচ নয়; আমরা ক্লাসিক্যাল ইভেন্ট করেছি, লাইভ করেছি। দিনের পর দিন একসঙ্গে প্র্যাকটিস করেছি। আমাদের রবীন্দ্র, নজরুল, কন্টেম্পোরারি, ফোক— সবকিছুর ওপর কাজ হতো। এর পরের যে জার্নি, অর্থাৎ নিজের কাজ নিজে করা, কম্পোজিশন করা— সেটি কিন্তু আমরা খুব তাড়াতাড়ি শুরু করেছিলাম। সেটি করতে হতো বাধ্য হয়ে। তখন থেকেই নৃত্যনাট্য পরিচালনায় চলে এলাম।
শামীম আরা নীপা: আমাদের যেকোনো স্টেট প্রোগ্রাম বা উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল বহুদিনের পরিশ্রমের ফসল। অনেক চিন্তাভাবনা করে কাজ করতাম। কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এলে তিনি এ দেশকে নিয়ে কীভাবে ভাবছেন, সেটির সঙ্গে আমাদের মেলবন্ধন করে নাচের অনুষ্ঠানগুলো করতাম। এখন এই জায়গার কিন্তু ভীষণ অভাব দেখতে পাচ্ছি।
শিবলী মোহাম্মদ: পণ্ডিত রবিশংকর যখন বাংলাদেশে এলেন, তখন তার মিউজিক কম্পোজিশনে আমরা নাচলাম। এরপর খুশি হয়ে তিনি মঞ্চে এসে আমাদের যেভাবে জড়িয়ে ধরলেন— অপূর্ব! তার ভালো লাগাটি কী পরিমাণ ছিল, বক্তৃতায় সে কথা বললেন। দিলীপ কুমার যখন এলেন, আমরা ‘মহুয়া’ করলাম। বিল ক্লিনটন যখন এলেন, আমরা পারফর্ম করলাম। তিনিও খুব খুশি হয়েছিলেন।
শামীম আরা নীপা: আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ, সাফ গেমস, আমাদের নোবেল অ্যাওয়ার্ডস— মানে যেটি আমরা নরওয়েতে করেছিলাম, সেসব স্মৃতি মনে পড়ছে।
শিবলী মোহাম্মদ: নোবেল হাউজে আমাদের বাংলাদেশের আগে কখনো নাচের কোনো প্রোগ্রাম হয়নি। আমরা ভাগ্যবান যে নোবেল হাউজে আমাদের ‘নৃত্যাঞ্চল’ পারফর্ম করেছে। আমরা প্রায় ৪০ জনের ট্রুপ নক্সী কাঁথার মাঠ নিয়ে ইতালিতে গিয়েছিলাম। খুলনায় ফাদার মারিনো রিগনের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান আছে। তিনি তখন নক্সী কাঁথার মাঠের অনুবাদ করেছিলেন। সেটি পুরো ইতালিতে এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে বাড়ি বাড়ি বইটি ছিল। আমরা ভাগ্যবান, আমাদের সঙ্গে ইতালিতে এই নৃত্যনাট্যের পরিচালক জি এ মান্নান গিয়েছিলেন। কবি জসীম উদ্দীনের স্ত্রী, মুস্তাফা মনোয়ার, নীনা হামিদ, ইন্দ্রমোহন রাজবংশীও গিয়েছিলেন। আমরা সে দেশের বিভিন্ন শহরে ১১টি শো করেছিলাম।
শামীম আরা নীপা: আমাদের পারিবারিক গল্প অনেকটাই কাছাকাছি। যে কারণে আমাদের সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের, এমনটাই মনে হয় আমার। যেমন— আমার বড় বোন মনসুরা বেগম গান করেন। আমাদের সাদি মহম্মদ ভাইকে তো শুধুই ঘরের লোক হিসেবে চিনতাম না; রবীন্দ্রনাথের যেকোনো কাজ হলে আমরা সবসময় তার পরামর্শ নিয়েছি। দিন নেই, রাত নেই নানাভাবে যন্ত্রণা দিয়েছি।
শিবলী মোহাম্মদ: যন্ত্রণা নয়, এসব সাদির অনেক ভালো লাগত।
শামীম আরা নীপা: বলতাম, ‘সাদি ভাই, এই গান করতে হবে।’ তিনি বলতেন, ‘ঠিক আছে, চলে এসো স্টুডিওতে।’ সাদি ভাই একবারের জায়গায় ১০ বার রেকর্ডিং করতেন। তার কোনো ক্লান্তি ছিল না। যদি ভালো না হতো, পরের দিন আবার বলতেন, ‘এটা ভালো হয়নি, আবার এসো।’ এই যে সম্পর্ক, এটি আমরা মিস করি। আমার ধারণা, পুরো নৃত্যজগৎ মিস করে তাকে।
শিবলী মোহাম্মদ: আমাকে অনেক অসহায় করে সাদি চলে গেছেন। আমাদের সঙ্গে, সমগ্র জাতির সঙ্গে সাদি খুব অন্যায় করেছেন। পৃথিবীর যেখানেই যাই, সেখানেই মানুষ আমার হাত ধরে বলে, ‘তিনি এই কাজ (আত্মহত্যা) কীভাবে করলেন?’ অনেকে কেঁদে ফেলেন। এজন্য আমি খুব ভয়ে থাকি যে ভাইয়ের প্রসঙ্গটি না উঠুক। সাদি চলে যাওয়ার পরে আমি অনেকটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলাম। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে হয়েছিল। এজন্য ওর প্রসঙ্গে যেতে চাই না। তবে খুব দুঃখ হয়, দেশ কিছু দিল না সাদিকে। সাদি কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান পেল না। এটার জন্যই যে ও চলে গেছে, তা নয়; সাদির যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। মায়ের চলে যাওয়া, বড় বোনের চলে যাওয়া, ভাইয়ের চলে যাওয়া...। তবে যথাযথ স্বীকৃতি না পেলে একজন শিল্পীর কিন্তু খুব অসম্মান হয়। যখন অযোগ্য ব্যক্তিরা সম্মানিত হয়, তখন কিন্তু সম্মানীয় ব্যক্তিরা, যোগ্য ব্যক্তিরা অসম্মানিত হন। তারা হয়তো মুখে কিছু বলেন না, কিন্তু ভেতরে কষ্ট পান। ১৯৭১ সালে বাবাকে যখন ছুরি মারে, সাদির হাতের ওপর আব্বার রক্ত ঝরছিল। সাদি বলতেন, ‘রক্ত এত গরম হয়, আমি সেদিনই জানলাম শিবলী; আব্বার রক্তগুলো যখন গরগর করে আমার হাত দিয়ে পড়ছিল।’ এই যে আমাদের ট্রমাটাইজড পরিবারটি... সেখান থেকে এমন অসাধারণ গান গেয়েছেন সাদি এবং দেশকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। এমন একজন সম্মানীয় ব্যক্তিকে আপনারা সম্মান দিলেন না। তিনি খুবই ইমোশনাল ছিলেন।
(২৭ আগস্ট ২০২৬, সলিম উল্লাহ রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা)







