রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়নে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগ বার্কলেসের বিরুদ্ধে

আন্তর্জাতিক নির্দেশনা লঙ্ঘনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কাছে নির্মিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশের রামপালে নির্মিত মৈত্রী সুপার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে ব্যাংকটি। প্রকল্পটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের তিন ব্যক্তি ও সংগঠন যুক্তরাজ্য সরকারের ব্যবসায়িক দায়িত্বশীল আচরণবিষয়ক দপ্তরে জমা দিয়েছেন অভিযোগটি। তাদের দাবি, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বন্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আগে পরিবেশগত ও মানবাধিকারসংক্রান্ত ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করেনি বার্কলেস।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কাছেই অবস্থিত। নদীবিধৌত বদ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শতাধিক ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই বনাঞ্চলে শত শত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাস। এর মধ্যে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও। সুন্দরবনকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। তাদের অনেকে খাদ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সম্পদের জন্য নির্ভর করেন নদী ও বনের ওপর।
অভিযোগকারীদের একজন ঢাকার পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল। তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এর আশপাশের শিল্পকারখানা থেকে ভারী ধাতুর দূষণ আন্তঃসংযুক্ত নদী ও খালের মাধ্যমে প্রবেশ করছে সুন্দরবনে। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রাণরেখা পশুর নদের ঠিক তীরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। বনের স্বাস্থ্য এখন সংকটের মধ্যে রয়েছে।’
গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনায় পারদ ও আর্সেনিকের উচ্চমাত্রা পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদে। গবেষকেরা ভারী ধাতুর দূষণের উৎস হিসেবে শিল্পবর্জ্য ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গমন এবং নৌযান চলাচল বৃদ্ধির কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের জন্য ‘উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত হুমকি’ তৈরি করছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গমন বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই ওই অঞ্চল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিকল্পনা ও নির্মাণের সময় থেকেই এর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরোধিতা ছিল। ২০১৬ সালে ইউনেসকোও প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বায়ু ও পানিদূষণের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্থাপনা ‘অপরিবর্তনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা’ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাবের আশঙ্কায় ফ্রান্সের কয়েকটি ব্যাংকসহ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
শরীফ জামিল আরও জানান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বার্কলেসের অবস্থানের কারণে অর্থায়নের পরিণতি বিবেচনা করার দায়িত্বও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তিনি বলেন, ‘আপনার সুনাম যত বড়, পৃথিবী ও এর মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করার দায়িত্বও তত বেশি। বার্কলেস একটি সুনামধন্য বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। এ কারণেই তাদেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে অথবা অর্থায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বার্কলেস ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি পরিবর্তন করা উচিত এবং জলবায়ু বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষায় তাদের কার্যক্রম কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা পর্যালোচনা করা উচিত।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরও বেশি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান শরীফ জামিল। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সারা বছর সূর্যের আলো থাকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে?’
অভিযোগকারীদের অন্যদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও রাজনীতিক অনিমেষ মণ্ডল এবং মৎস্যজীবীদের একটি শ্রমিক সংগঠন দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম। তাদের আইনি সহায়তা দিচ্ছেন লন্ডনের কিংস কলেজের আইন বিভাগের মানবাধিকার ও পরিবেশবিষয়ক ক্লিনিকের শিক্ষার্থী ও আইনজীবীরা।
কিংস কলেজের ওই ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, ‘জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকটের সম্মুখসারিতে রয়েছে সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। আমরা চাই, এই সংকটে তেল ও কয়লাভিত্তিক যেকোনো প্রকল্পে অর্থায়নের আগে আবারও ভাবুক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।’
অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্ত করা হবে কি না, তা যাচাই করবে যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়িক দায়িত্বশীল আচরণবিষয়ক দপ্তর। দেশটির ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা এটি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বার্কলেস ব্যাংক এবং মৈত্রী সুপার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি।






