সঙ্গ নিঃসঙ্গের উত্তম

উত্তম কুমার
সিনেমার দর্শক কাকে মনে রাখতে চান, একজন তারকা না একজন অভিনেতাকে? অভিনেতা যখন পর্দায় নিজের ইমেজকে বহু ব্যবহারের সিলমোহর বানিয়ে ফেলেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন তারকা। লাখো দর্শকের কুর্নিশ তখন তার পায়ে আছড়ে পড়ে। কিন্তু একজন অভিনেতা যখন তার গণ-ইমেজের মুখোশটাকে সরিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট চরিত্রের ভেতরে মিশে যান তখনই তিনি একজন অভিনেতা অথবা নিঃসঙ্গ চরিত্রের প্রতিকৃতি। বাঙালি দর্শকদের কাছে উত্তম কুমার ছিলেন তারকা। কিন্তু তার সাফল্য সমৃদ্ধ অভিনয় জীবনের ট্র্যাজেডি সম্ভবত একটাই—অভিনেতার প্রবল প্রতিভা নিয়ে তিনি বাংলা সিনেমায় খ্যাতির শিখর স্পর্শ করেছিলেন, কিন্তু হয়ে উঠেছিলেন তারকা।
উত্তম কুমারের আজ ১০০তম জন্মবার্ষিকী। শতবর্ষে পৌঁছেও এই অভিনেতা বাঙালি দর্শকের কাছে থাকলেন মহানায়ক হয়ে। তাই অভিনেতা উত্তম কুমারের চিরকালীন হয়ে যাওয়ার ম্যাজিকটা কোন জায়গায়, এই প্রশ্নটা বেশ জটিল এবং গভীর। প্রায় দুইশর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। সাফল্য আর খ্যাতি তাকে এক অলৌকিক জগতের দেবতার আসনে বসিয়েছে। কিন্তু সেই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি বহু মধ্যম মানের চিত্রনাট্যেও কাজ করেছেন। কখনো শুধু গান-ই একটি সিনেমাকে নিয়ে গেছে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। কেউ তাকে মহানায়ক বলেছেন, কেউ বলেছেন ম্যাটিনি আইডল। তাহলে কি উত্তম কুমারের অভিনেতা সত্তা হারিয়ে গিয়েছিল তারকাখ্যাতির অনেক আলোর ঝলকানির ভেতরে? জনময়তার মধ্যে থেকে একজন অভিনেতার সত্তা ফিরে গিয়েছিল নির্জনতায়?
প্রশ্ন উঠতে পারে, উত্তম কুমার কি সচেতনভাবেই নিজের চারপাশে একটি বৃত্ত টেনে পৃথক এক জগতে প্রবেশ করেছিলেন? উত্তর হচ্ছে, ব্যবসায়িক বাংলা সিনেমা তাকে এই গণ্ডির বাইরে টেনে আনতেও চায়নি। বাণিজ্য সফল সিনেমা তখন তাদের জন্য ছিল সেইফ প্লে-গ্রাউন্ড। আর সেখানেই বিপদ ঘটেছে। তারকাখ্যাতির পাদপ্রদীপের আলো তাকে পৃথক অবস্থানে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। সেখানে তিনি এক রোমান্টিক নায়ক। টাইম এবং স্পেস, উত্তমের এই অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ঔপনিবেশিক পর্বের ক্ষত নিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে ভারতবর্ষে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঘটন ঘটে গিয়েছিল, সেখান থেকে মানুষের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পরিত্রাণ। সিনেমার পর্দা তাদের ক্ষণিক পরিত্রাণের পথ দেখিয়েছিল। সিনেমায় প্রিয় নায়ক-নায়িকার জুটি, তাদের প্রেমের জয়, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ— একটা সময়ে উত্তম কুমারকে নানা অঙ্কের হিসেবের মধ্য দিয়ে জননন্দিত নায়কে পরিণত করেছে। তার চুলের কাট অথবা ঘুরে তাকানোর বিখ্যাত ভঙ্গি, চরিত্র অনুযায়ী পাল্টে নেওয়া ম্যানারিজম, শরীরের ভাষা তাকে পরিণত করে কাল্টে।
তখনকার বেশিরভাগ বাংলা সিনেমার পরিচালকরা পর্দায় শুধু উত্তমের উপস্থিতিকেই চাইতেন, তার অভিনীত চরিত্রটিকে নয়। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় সেই ধারণাটি ভেঙে গিয়েছিল। চরিত্রের ভেতর দিয়ে ভীষণ দক্ষ এক অভিনেতা বের হয়ে এসেছিলেন স্বমহিমায়। সেখানে উত্তম কুমার ছিলেন নিঃসঙ্গ এক চরিত্র
উত্তম কুমারের এই ইমেজকেই পর্দায় ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। ‘নায়ক’ সিনেমার স্ক্রিপ্ট তিনি লিখেছিলেন উত্তমের জীবনকে সামনে রেখে। সেই প্রথমবারের মতো মহানায়ক হয়ে ওঠা উত্তম কুমার নিজের রোমান্টিক ইমেজকে ভেঙে হাজির হলেন ভিন্ন এক চরিত্রে অভিনয় করতে। করতালি, সুপার হিট আর ভক্তকুলের উচ্ছ্বাসের বাইরে এসে দাঁড়ালেন এক অভিনেতা। ‘নায়ক’ সিনেমার গল্পে বাঙালির মহানায়কের নিঃসঙ্গ চরিত্রটি বড় একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেন উত্তম কুমারকেই দেখেছিল। নিজের এতদিনের ইমেজ ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়েই সত্যজিৎ রায় অসাধারণ একটি কাজ করেছিলেন— তিনি অন্য এক উত্তমকে হাজির করে দিয়েছিলেন ভক্তদের সামনে। তখনকার বেশিরভাগ বাংলা সিনেমার পরিচালকরা পর্দায় শুধু উত্তমের উপস্থিতিকেই চাইতেন, তার অভিনীত চরিত্রটিকে নয়। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় সেই ধারণাটি ভেঙে গিয়েছিল। চরিত্রের ভেতর দিয়ে ভীষণ দক্ষ এক অভিনেতা বের হয়ে এসেছিলেন স্বমহিমায়। সেখানে উত্তম কুমার ছিলেন নিঃসঙ্গ এক চরিত্র; শূন্যতা যাকে ঘিরে আছে ভিড়ের ভেতরে। সিনেমার মূল নায়কের ব্যক্তিদ্বন্দ্ব কোথাও কোথাও তার ব্যক্তিদ্বন্দ্বকেও স্পর্শ করেছিল। আর তাই গোটা সিনেমায় মেকআপ ছাড়াই অভিনয় করে উত্তম কুমার তার অভিনয় ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। ‘নায়ক’ তার ইমেজ ভেঙে নিজস্ব একটি পৃথক চরিত্র হয়ে ওঠার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।
১৯২৬ সালে ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। পরবর্তী সময়ে তিনি উত্তম কুমার নামে ভারতীয় চলচ্চিত্রে হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি। তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন চার দশক আগে। সিনেমায় অভিনয় জীবনের শুরুতে ‘ফ্লপ মাস্টার’ উপাধি পেয়েছিলেন। সেই উপাধির কালিমা মুছে গিয়েছিল তার জয়ের স্রোতে। তার নতুন উপাধি হয়েছিল ‘মহানায়ক’। একজন অভিনেতা লাখো দর্শকের করতালির ভেতর দিয়ে পরিণত হয়েছিলেন তারকায়। কিন্তু সেই নিঃসঙ্গ অভিনেতা চরিত্রটির পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা হয়তো বলে দেবে নতুন সময়।





