স্কুল-জনবসতি ঝুঁকিতে রেখেই ইজারা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি মতামত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা। পানি উন্নয়ন বোর্ডও পরে সতর্ক করেছিল, নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু তুললে নদীর গতিপথ বদলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এরপরও ‘সরকারের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে’ বাংলা ১৪৩৩ সনের জন্য ২ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কালীগঙ্গা নদীর চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াল বালুমহাল। ইজারা দেওয়ার পর এখন সেই সীমানার বাইরে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এতে নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় ৩০০ শতক ফসলি জমি।
নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর (স্মারক নম্বর ১৬৯৫) সদর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে তৈরি করা হয় বালুমহাল ইজারার প্রস্তাব। একই দিন প্রস্তাবটি পাঠানো হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। ওই প্রাথমিক প্রস্তাবে নদীর তীরে জনবসতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না।
তবে ২৪ ডিসেম্বর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মতামত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত বালুমহালের উভয় পাড়সংলগ্ন এলাকায় আবাসিক এলাকা, একটি উচ্চবিদ্যালয় ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিবেদনে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধিত) আইন, ২০২৩-এর ৪(৪) ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এরপরই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সরকারের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে’ বিধি অনুযায়ী বাংলা ১৪৩৩ সনের জন্য বালুমহালটি ইজারা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ঝুঁকির বিষয়টি সরকারি নথিতে উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের বিষয়টিই ইজারার পক্ষে যুক্তি হিসেবে এসেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহসভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বললেন, সরকারি নথিতেই যখন জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা রয়েছে, তখন এমন এলাকায় কীভাবে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার। রাজস্ব আদায়ের চেয়ে মানুষের জানমাল, কৃষিজমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া কারিগরি মতামতে সতর্ক করেন, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ অনুযায়ী নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বালু উত্তোলন করা হলে কালীগঙ্গা নদীর গতিপথ ও তলদেশের গঠনে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এতে নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে পার্শ্ববর্তী ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের তরা সেতুর উজান ও ভাটিতে এক কিলোমিটার দূরত্ব রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে বালুমহালের সীমানা। চামটা মৌজায় ৪ দশমিক ১৫ একর, পৌলীতে ৩ দশমিক ৮ একর এবং বিলবাড়িয়ালে ৩১ দশমিক ২৫ একর, মোট ৩৮ দশমিক ৪৮ একর এলাকায় বালু-মাটি উত্তোলনের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। তিন মৌজা মিলিয়ে উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা ৭৪ লাখ ৫৭ হাজার ৯০৭ দশমিক ১০৩ ঘনফুট।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত এলাকার বাইরে নদীতে চলছে তিন থেকে চারটি ড্রেজার। এগুলো দিয়ে বড় আকারের বাল্কহেডে তোলা হচ্ছে বালু। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০টি বাল্কহেডে বালু ভরা হচ্ছে। প্রতিটি বাল্কহেডে গড়ে চার থেকে আট হাজার ঘনফুট বালু বহন করা যায়। তাদের ভাষ্য, প্রায় ২০ দিন ধরে এভাবে চলছে বালু উত্তোলন।
ইজারাদার কামাল হোসেন অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বললেন, নির্ধারিত সীমানার মধ্যেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তার দাবি, প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি বাল্কহেডে বালু তোলা হয় এবং কোনো কৃষকের জমি কাটা হয়নি।
জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ পারভেজও দাবি করেন, বালুমহালের সীমানার ভেতর থেকেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, কৃষকের জমি কাটা হয়নি।
এদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব মুহাম্মদ আলী।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বললেন, সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করা হলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে সরেজমিনে তদন্ত করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। বালুমহালের কারণে জন স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে আগামী বছর থেকে এটি বাতিল করা হবে।







