পাহাড়ে পাহাড়ে অপেক্ষার কান্না
- নদী শান্ত, জনপদ জেগেছে; তবু ফিরল না নিখোঁজদের পদধ্বনি

আবার আগের মতো শান্ত হয়ে গেছে নুয়াকোটের ত্রিশূলি নদী। দুই তীরেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে সাবেক জনপদ! - রয়টার্স
‘অন্ধকার যত গভীর হয়, আলোর অপেক্ষাও তত তীব্র হয়ে ওঠে’, হিমালয়ের বুক চিরে এখন যেন সেই অপেক্ষারই গল্প লিখছে নেপাল। ভয়াল বন্যার স্রোত থেমেছে, নদী ফিরেছে নিজের খাতে; কিন্তু থামেনি মানুষের চোখের জল। পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে এখনো খোঁজা হচ্ছে জীবনের ক্ষীণতম স্পন্দন।
ভোটেকোশী বিপর্যয়ের নবম দিনেও উদ্ধারকারীদের হাতে নেই ফিরে যাওয়ার পথ। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, কাদায় ঢাকা জনপদ, ভেঙে যাওয়া যোগাযোগব্যবস্থা— সবকিছু পেরিয়ে তারা খুঁজে চলেছেন নিখোঁজ মানুষদের। কেউ ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। কিন্তু আশার প্রদীপ নিভতে দেননি উদ্ধারকারীরা।
নদীর স্রোত কমেছে। পাহাড়ি পথ থেকে ধীরে ধীরে সরছে কাদা ও ধ্বংসস্তূপ। কোথাও কোথাও ফিরেছে বিদ্যুৎ, আবার কোথাও সচল হয়েছে যোগাযোগ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ভোটেকোশীর তীরে জীবন বুঝি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে। কিন্তু হাজারো পরিবারের ঘরে এখনো নীরব অপেক্ষা। কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও স্বামী কিংবা স্ত্রী— যারা কয়েক দিন আগে বেরিয়েছিলেন, তাদের ফেরার অপেক্ষায় এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবারগুলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটেকোশী বন্যার পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ানসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় নিরাপত্তা বাহিনী, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও বিশেষজ্ঞ দল একযোগে কাজ করছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) গতকালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ৩ হাজার ৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১১ হাজার ৯৯৩ জনকে। আহত হয়েছে ২৯২ জন। এখনো বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের সন্ধানে চলছে বিশেষ অভিযান। ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তা, ভেঙে পড়া সেতু এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সীমান্তের ওপারে তিব্বতে এখনো কাটেনি বিপর্যয়ের ছায়া। চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনো ৫৪১ জন নিখোঁজ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গিরং সীমান্ত এলাকায় রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি চীনা উদ্ধারকারী দল ড্রোন, ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সহায়তায় নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলো ঘিরে। ভোটেকোশীর ভয়াল স্রোতে কয়েকটি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে এখনো চলছে মরিয়া চেষ্টা। নেপাল সেনাবাহিনী, বিশেষজ্ঞ দল ও প্রযুক্তিগত কর্মীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
লাংটাং ও ত্রিশূলি-৩-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো এলাকাগুলোয় উদ্ধারকারীরা কাদা, পাথর ও জমে থাকা পানির সঙ্গে লড়াই করছেন। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা চলছে। কোথাও কোথাও ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে, যাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকে পড়া মানুষের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অতীতের কিছু ঘটনায় দেখা গেছে দীর্ঘ সময় পরও জীবিত উদ্ধারের নজির রয়েছে। সেই আশায় এখনো অভিযান থামানো হয়নি।
তবে এই আশার লড়াইয়ের পাশাপাশি চলছে শোকের ভারও। অনেক পরিবার প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পেয়ে প্রতীকী শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে। কোথাও চোখের জলে বিদায় জানানো হচ্ছে, আবার কোথাও এখনো বিশ্বাস, হয়তো একদিন দরজায় কড়া নেড়ে ফিরে আসবেন হারিয়ে যাওয়া মানুষটি।
ভোটেকোশীর জল ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে, পাহাড়ও ফিরছে নিজের চেনা রূপে। কিন্তু মানুষের অপেক্ষার নদী এখনো বহমান। ধ্বংসস্তূপের নিচে, অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো পথে হাজারো পরিবার এখনো খুঁজে চলেছে পরিচিত মুখ।
কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ নেই, তবু মানুষ অপেক্ষা করেই যায়। হিমালয়ের এই বিপর্যয়ের পর হাজারো পরিবারের গল্প এখন সেই অপেক্ষারই প্রতিচ্ছবি।
আর সেই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তার উত্তর লুকিয়ে আছে পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে। উদ্ধারকারীদের হাত যতক্ষণ পর্যন্ত খুঁজে চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে আশার আলো... হয়তো কোনো এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মিলবে জীবনের কোনো ছোট্ট সংকেত।





