যারা থেকে যায়

অলংকরণ: অরবিন্দ হালদার
আমি ঢাকায় আছি ৩০ বছর। তারপরও প্রতিদিন মনে হয় আমি আসলে অন্য কোথাও বসবাস করি। অথবা আমি কোথাও থাকিই না। কথাগুলো কঠিন মনে হলেও আদতে সহজ। একদম স্পষ্ট হয়ে যাবে একটু পরই।
রাস্তার যানজট, অফিসের মিটিং, কাচঘেরা ভবন, মোবাইলের রিংটোন, গাড়ির হর্ন— এসবের ভেতর আমি শুধু একটা শরীর নিয়ে ঘুরি। আমার বাসা ঢাকায়, চাকরি ঢাকায়, সংসার ঢাকায়, কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটা যেন রয়ে গেছে একটা ছোট গ্রামে, একটা খালের ধারে, একটা কাঁচামিঠা আমগাছের ছায়ায়।
তারপরও জীবন যেমন চলে, আমিও চলেছি। মা-বাবা মারা যাওয়ার পরও বছরে একবার, কখনো দুবার গ্রামে যাই। পুরনো বাড়িটা দেখে আসি। খালের পাড়ে দাঁড়াই। কবর জিয়ারত করি। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে গল্প করি।
গ্রামে গেলে একবার না একবার দেখা হয় লাল্টুর মার সঙ্গে। তিনি আমাকে ঠিকই চিনতেন। আমার নাম ধরে ডাকতেন। কখনো বলতেন, ঢাকা থেইকা আইছস? কখনো বলতেন, তোর মা থাকলে খুব খুশি হইত। কখনো আমাদের বাড়ির উঠানে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, তোর মায়ের মতো মানুষ আর হইব না।
কারণ আমার মা আর লাল্টুর মার সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত। গ্রামের অনেকেই তাকে পাগলি বলে দূরে সরিয়ে রাখত, কিন্তু মা রাখতেন না। লাল্টুর মার মাথা ঠিক থাকলে আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন। উঠান ঝাড়ু দিতেন, ধান শুকাতেন, ধানের গোলা পরিষ্কার করতেন, গোয়াল পরিষ্কার করতেন, আর যা যা করা যায় গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে। আর মাথা ঠিক না থাকলে কাজ করতেন না তা কিন্তু না। সেদিন বরং কাজের গতি বেড়ে যেতে ঝড়ের বেগে
তিনবেলা খাওয়া মোটামুটি তার আমাদের বাড়িতেই চলত। কখনো কখনো আবার অভিমানও করতেন মায়ের সঙ্গে। সেদিন মা গান শুনিয়ে তার মান ভাঙাতেন।
আমরা প্রথম দিকে ভয় পেতাম। পরে সব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। তিনি কাউকে মারতেন না বা ভয় দেখাতেন না।
লাল্টুও প্রতিদিন সকালে চোখ ডলতে ডলতে আমাদের বাড়িতে হাজির হতো মায়ের খোঁজে এসে। লাল্টু এসে খুব দূরে বসে থাকতে, মনে আছে আমাদের বাড়িতে সারা বছরই একটা মাটির ঢিবি ছিলে কাঁঠালগাছের নিচে। লাল্টু সেই ঢিবিতেই আসন নিত। ওই লাল্টুকে ছোটবেলায় আমি ‘নাল্তু’ বলে ডাকতাম।
লাল্টুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আমাদের বাড়ি থেকে তিন বাড়ি পরে লাল্টুদের বাড়ি। মাঝখানে খাল, খালের পাশে কাঁচামিঠা আমগাছ, এরপর মনার মার বাড়ি। তার পরের বাড়িই লাল্টুদের।
লাল্টু আর আমি সারা দিন একসঙ্গে থাকতাম। খালে মাছ ধরতাম, বর্ষায় ভেলা ভাসাতাম, গাছে উঠতাম, আম কুড়াতাম। গ্রামের মানুষ ক্ষেপিয়ে বলত, তুইও লাল্টুর মার ছেলে। তখন খুব রাগ হতো। এখন মনে হয়, রাগ না করলেই ভালো ছিল।
লাল্টুর মা ছিলেন অদ্ভুত মানুষ। সারা দিন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াতেন। কখনো তিন দিন ঘুমাতেন না। কখনো তিন দিন কথা বলতেন না। আবার কোনো একদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গান গাইতেন। সেই গান কেউই বুঝত না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নিজের ছেলের কথা তিনি কখনো ভুলতেন না। পাগলামির মধ্যেও হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন, লাল্টু খাইছে? কিংবা লাল্টু আমার বাপটা কইরে? ওরে লাল্টুরেএএএএএএ বলে চিৎকার দিয়ে পাড়া মাথায় তুলতেন। যেন পৃথিবীতে সবকিছু
কিন্তু মায়ের ভালোবাসা উপেক্ষা করে একদিন লাল্টু হারিয়ে গেল। তখন আমরা কিশোর। যদিও কয়েক দিন পর ফিরল। সেবার আমাকে লাল্টু যে কত বিচিত্র গল্প শুনিয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। শহরের মানুষের গল্প, গাড়ির গল্প। বাজারের গল্প। আরও কত কী। আমিও শুনেছি সব মন দিয়ে। আর সেসব দেখেছি কল্পনায়।
তবে কদিন পর চলে গেলে, বলা যায় চিরতরে। যাওয়ার আগে ভোরের অন্ধকারে আমার কাছে এসেছিল। বলেছিল, ঢাকায় যাবে। কাজ পেয়েছে। বিদায়ের সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আমার মার দিকে খেয়াল রাখিস। তারপর সে চলে গেল। আর কখনো ফিরে এলো না।
অন্তত আমরা কেউ তাকে আর দেখিনি। চল্লিশ বছর কেটে গেল। গ্রাম বদলে গেল। খালের ওপর ব্রিজ হলো। আমগাছটা ভেঙে গেল। মানুষের মুখ বদলে গেল। শুধু লাল্টুর মার মুখটা যেন সময় পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারল না।
কিন্তু মজার ব্যাপার, এত বছরেও তিনি কখনো আমাকে লাল্টু ভাবেননি। কখনো না। সেই কারণেই সেবারের ঘটনাটা আমাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। একদিন বিকালের দিকে খালপাড়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি দূরে লাল্টুর মা। বয়স তার কত হয়েছে কেউ জানে না। শরীর কুঁজো। সাদা চুল। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল। তিনি একটা শুকনো বাঁশে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন। খুব চুপচাপ হয়ে গেছেন। আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর এমনভাবে
মুহূর্তের মধ্যে লোক জড়ো হয়ে গেল। সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। কারও মুখে হাসি নেই। কারণ সবাই জানে, জীবনে কখনো তিনি আমাকে লাল্টু বলেননি। একজন বৃদ্ধ বললেন, বুড়ির আইজ কী হইল? আরেকজন বললেন, এত বছর পর আমাগো জগলুরে কেন বুড়ির লাল্টু মনে হইল?
আমি তাকে বোঝাতে চাইলাম। বললাম, খালা, আমি তো... কিন্তু তিনি শুনলেন না। শুধু আমার হাত শক্ত করে ধরে বললেন, আর যাইস না বাপ। এইবার আর যাইস না।
চলে যাবার দিন আমাকে জড়িয়ে ধরে লাল্টু যে উত্তাপ ছড়িয়েছিল আমার মনে, আজও ঠিক তাই অনুভব করলাম। লাল্টুর মায়ের স্পর্শে। ওই স্পর্শটাই কি আমাকে বদলে দিতে শুরু করল?
সেদিন রাতে ঘুম হলো না। অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। মধ্যরাতের দিকে বাইরে থেকে গানের শব্দ এলো। পরিচিত সেই সুর। আমি শব্দ অনুসরণ করে খালের দিকে গেলাম। খালের জলে চাঁদের আলো কাঁপছে। সেখানে গিয়ে দেখি, লাল্টুর মা বসে আছেন। আর তার পাশে একজন বসে আছে চুপচাপ। মুখটা স্পষ্ট না। কিন্তু তার বসার ভঙ্গি, মাথা নিচু করার ভঙ্গি, হাঁটুর ওপর হাত রাখার ভঙ্গি দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল। আমি ফিসফিস
লোকটা ধীরে মাথা তুলল। আমি তার মুখ দেখতে পেলাম না। কিন্তু সে যেন মৃদু হেসে উঠল। তারপর কুয়াশা ঘন হয়ে এলো। কিছুক্ষণ পর সেখানে আর কেউ নেই। শুধু লাল্টুর মা বসে আছেন। পরদিন ভোরে তিনি আমাকে বললেন, রাতে কথা হইছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কার সঙ্গে? তিনি বললেন, তোগোর দুইজনরে আর আলাদা কইরা চিনতে পারি না এখন।
কথা শুনে আমার বুকের ভেতর ঠান্ডা কিছু নেমে গেল। এরপর কয়েক দিন আমি গ্রামেই রইলাম। প্রতি রাতে মনে হতে লাগল কেউ যেন খালের ধারে হাঁটে। কেউ যেন আমাকে দেখে। কেউ যেন খুব কাছে থেকেও ধরা দেয় না।
একদিন ঠিক সন্ধ্যার দিকে লাল্টুর মা আমাকে ডেকে খালের ধারে নিয়ে গেলেন। সেখানে বসে শূন্যে তাকিয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, তোর মা আইছে। আমার সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেল। তিনি ফাঁকা জায়গার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে লাগলেন— এই যে, অনেক দিন পরে আইলা। তারপর হাসলেন। ঠিক যেমন বহু বছর আগে আমাদের ঢেঁকিঘরে ধান ভানার সময় হাসতেন।
হঠাৎ আমার হাত ধরে বললেন, তোর মা আইছে, লাল্টু আইছে। আমার আর কষ্ট নাই। তারপর খুব ধীরে মাথাটা আমার কোলের ওপর নামিয়ে দিলেন। ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি। ঘুমিয়ে পড়লেন।
লাল্টুর মা সেদিন মারা গেলেন।
গ্রামের মানুষ বলল, ভালোই হয়েছে। অনেক কষ্ট পেয়েছে বুড়িটা। কিন্তু আমার মনে হলো, তিনি যেন কাউকে দেখে তবেই চলে গেলেন। সব কাজ শেষ করে আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। নিজেকে জোর করে কাজে ডুবিয়ে দিলাম। ভাবলাম, সব শেষ। কিন্তু শেষ হলো না।
প্রায় দুই সপ্তাহ পর ভোরে কারওয়ান বাজারে গিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখি একজন কুলি মাথায় বস্তা নিয়ে হাঁটছে। লোকটার বয়স আমার মতো। চুলে পাক ধরেছে। শরীর শুকনো। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিটা...! আমি জমে গেলাম। ওটা লাল্টু। আমি নিশ্চিত। আমি দৌড়ে এগিয়ে গেলাম। লাল্টু! লোকটা একবার ফিরে তাকাল। তারপর ভিড়ের মধ্যে দ্রুত হারিয়ে গেল। আমি পাগলের মতো খুঁজতে লাগলাম। কোথাও পেলাম না। তখন বুঝলাম, হয়তো ভুল হয়েছে।
কিন্তু ভুলটা সেখানেই শেষ হলো না। এরপর থেকে যখনই আমার বয়সী কাউকে দেখি, মনে হয় লাল্টু। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা লাল্টু। ফুটপাতে চা বিক্রি করা লোকটা লাল্টু। রিকশা চালানো লোকটা লাল্টু। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভিখারিটাও লাল্টু। আমি মানুষের মুখের ভেতর শুধু লাল্টুকে দেখতে শুরু করলাম। রাতে ঘুম আসে না। ঘুমালেও একই স্বপ্ন। খালের ধারে দাঁড়িয়ে আছে লাল্টু। পাশে আমার মা। একটু দূরে লাল্টুর মা গান গাইছেন।
তারপর ধীরে ধীরে স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা ভেঙে গেল। অফিসে বসে শুনতে পাই লাল্টুর মায়ের গান। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শুনি মা ডাকছেন। আমি কার সঙ্গে কথা বলছি, কখন কথা বলছি, নিজেই বুঝতে পারি না।
একদিন আয়নায় নিজের মুখ দেখে হঠাৎ মনে হলো, আমিই আসলে লাল্টু। সেদিনই চাকরি ছেড়ে দিলাম। কেউ বুঝতে পারল না কেন। আমি আবার গ্রামে চলে এলাম। তারপর দিন, মাস, বছর কেটে গেল। গ্রামের মানুষ প্রায়ই আমাকে খালের ধারে বসে থাকতে দেখত। আমি একা বসে কথা বলতাম। কখনো বলতাম, খালা, আজ কাজ করবা না? কখনো বলতাম, মা, ভাত দিছো? কখনো বলতাম, লাল্টু, তুই কই ছিলি? গ্রামের লোকেরা দূর থেকে দেখে মাথা
তারপর এক ভোরে গ্রামের মানুষ দেখল, আমি নেই। দরজা খোলা। বিছানা গুছানো। উঠোনে শিশির। কেবল খালের দিকে চলে যাওয়া কিছু পায়ের দাগ। তারপর আর কিছু না।
গ্রামের সবাই মিলে খুঁজল। খালের পাড়ে, বাঁশবাগানে, গোরস্তানের পাশে, পুরনো আমগাছটার গোড়ায়। কোথাও আমাকে পাওয়া গেল না।
এ গ্রামে হারিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু যারা হারায়, তারা অদ্ভুতভাবে থেকে যায়। কেউ গন্ধ হয়ে থাকে। কেউ গান হয়ে থাকে। কেউ অপেক্ষা হয়ে থাকে।
আজও পূর্ণিমার রাতে গ্রামের কিছু মানুষ বলে, খালের ধারে চারজনকে বসে থাকতে দেখা যায়। একজন বৃদ্ধা। একজন মধ্যবয়সী নারী। আর দুজন প্রায় সমবয়সী পুরুষ। বৃদ্ধা গান গাইছে। নারীটি মৃদু হেসে শুনছে। একজন পুরুষ জলের দিকে তাকিয়ে আছে। আরেকজন তার দিকে। হয়তো দুজনই লাল্টু। হয়তো দুজনই অপেক্ষায়।
গ্রামের পুরনো মানুষরা এখনো বলে, পৃথিবীর সব নদী শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে মেশে, কিন্তু সব অপেক্ষার শেষ হয় না। কিছু অপেক্ষা খালের পাড়ে বসে থাকে। কুয়াশার মধ্যে অপেক্ষা থাকে। চাঁদের আলোয় থাকে অপেক্ষা। বহু বহু বছর ধরে অপেক্ষারা বেঁচে থাকে।
আর একসময় অপেক্ষা করতে করতে মানুষ নিজেই সেই মানুষে পরিণত হয়, যার জন্য সে অপেক্ষা করছিল।



