বিনা বেতনে রমণীর পাঠদানের ৫৫ বছর

পাঠশালায় পড়াচ্ছেন রমণী কান্ত বেপারি
বয়সের ভার শরীরে স্পষ্ট হলেও শিক্ষাদানের নেশায় এখনো ক্লান্ত নন। ৫৫ বছর ধরে প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের বিনা পয়সায় পড়িয়ে আসছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত বেপারি।
ওই গ্রামের রাখাল বেপারির ছেলে রমণী কান্ত বেপারি (৭০) স্বাধীতার আগে যখন স্কুলের ছাত্র ছিলেন, তখন থেকেই এলাকার গরিব পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ানো শুরু করেন।
রমণী কান্ত ১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বরচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন সরকারি গৌরনদী কলেজে। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল তার। কিন্তু ছোট ছোট শিক্ষার্থীর প্রতি মায়া আর ভালোবাসার কারণে চাকরিতে না গিয়ে বেছে নেন তাদের পড়ানোর পথ। এরপর একে একে কেটে গেছে প্রায় ছয় দশক।
রাংতা সর্বজনীন দুর্গামন্দিরের আঙিনা হয়ে উঠেছে তার পাঠশালা। সপ্তাহে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে চলে শিশুদের পাঠদান। বর্তমানে ১৫-২০ শিশু নিয়মিত তার কাছে পড়াশোনা করছে। পাঠশালায় পড়াশোনা শেষে তিনি শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেন পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই দীর্ঘ সময়ে তার কাছে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এলাকার অনেকে।
রমণী কান্তর পাঠশালায় নেই কোনো মাসিক বেতন। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে লক্ষ্যেই বছরের পর বছর ধরে তিনি শিশুদের পড়িয়ে যাচ্ছেন।
রমণী কান্তর জীবন খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে বাড়িতে একটি দোচালা টিনের ঘরে বসবাস। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিজের কিছু কৃষিজমি রয়েছে। অভাব-অনটনের জীবনে শিশুদের পড়ানোর আনন্দই যেন তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও সাফল্য।
রমণী কান্ত বলছিলেন, ‘স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে আসছি। যত দিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন এভাবেই শিশুদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি।’
তার কাছে পড়তে আসা সমৃদ্ধি, অর্ক, বিক্রম, নির্জয় ও তাবাসুম জানিয়েছে, এই পাঠশালায় পড়তে তাদের অনেক ভালো লাগে। স্যার ছড়া বলেন, গল্প বলেন, অনেক আদরও করেন।
অভিভাবক শ্যামল বেপারি, মালা বালা ও রেনুকা বেপারি বললেন, রমণী স্যারের কাছে আমাদের বাবারা পড়েছেন, আমরা পড়েছি, এখন আমাদের সন্তানরা পড়ছে। আমাদের পরিবারের তিন প্রজন্মই তার কাছে পড়াশোনা করেছে। হঠাৎ দুয়েক দিন যদি আমাদের সন্তানরা এখানে না আসে, তবে তিনি খোঁজ নিতে আমাদের বাড়িতে চলে যান।
রাংতা সর্বজনীন দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি রণজিৎ বৈদ্যের ভাষ্য, স্বাধীনতার আগে থেকেই রমণী কান্ত বেপারি এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান করে আসছেন। তার কারণে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা নেই, নেই প্রচারের আকাঙ্ক্ষা। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় শিশুদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় করে রমণী কান্ত বেপারি যেন নীরবে প্রমাণ করে চলেছেন— শিক্ষা শুধু পেশা নয়, মানুষের জীবন বদলে দেওয়ারও এক মহৎ দায়িত্ব। তাই ছয় দশক ধরে রাংতা গ্রামের মানুষের কাছে তিনি একজন শিক্ষকই নন, এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যার পাঠশালায় যুগ যুগ ধরে জ্বলছে শিক্ষার আলো।





