বিশকেকে বিশ্বের দৃষ্টি– বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কোনো কোনো জোট বা সংস্থা হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোয়। কোনো সংস্থা ঢাকঢোল পিটিয়ে আবির্ভূত হয়। ভূরাজনীতি বা বৈশ্বিক সমীকরণ পাল্টে গেলে কোনো সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো কোনোটি কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। ১৯৯০-এ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট ব্যবস্থার পতন হয়; কিন্তু টিকে থাকে চীন। বরং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় পশ্চিমবিরোধী পক্ষগুলো তখন যেমন চীনের দিকে দৃষ্টি দেয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোও তেমন চীনের দিকে তাকাতে থাকে। চীনের সক্ষমতা তখন দ্রুতগতিতে বাড়ছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চীন ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাতে থাকে। পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে চীন রাশিয়াকেও কাছে টানে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বের হয়ে আসা মধ্য এশিয়ার ল্যান্ডলক দেশগুলো তখন কৌশলগত মিত্র খুঁজছে। চীন বুঝতে পারে, আদর্শিক ও ভৌগোলিকভাবে সোভিয়েতভুক্ত এ দেশগুলো একটা শূন্যতার মধ্যে আছে। চীন তখন সাংহাইয়ে ডেকে নেয় চারটি দেশকে— রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান। গঠিত হয় সাংহাই ফাইভ। ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিত। আরও পাঁচ বছর পর উজবেকিস্তানকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে গঠিত হয় সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)। প্রথম থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতাই ছিল এসসিওর প্রধান বিষয়। একদিকে রাশিয়াসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর পর্যাপ্ত জ্বালানি, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদ; অন্যদিকে চীনের বিস্ময়কর ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষমতা। এসসিও তাই দ্রুতই বিশ্বের দৃষ্টি কাড়ে।
২৫ বছরে এসসিও বড় হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বেলারুশ ও ইরান বিভিন্ন সময়ে এর সদস্য হয়েছে। ফলে ১০টি সদস্য রাষ্ট্র ও ১৭টি সহযোগী রাষ্ট্র নিয়ে এসসিও এখন কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অভাবনীয় কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর একের পর এক এমন সব অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে। একতরফাভাবে প্রতিটি দেশের ওপর তিনি বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেছিলেন। বাংলাদেশসহ বহু দেশ তড়িঘড়ি করে তখন শুল্ক রেয়াত পেতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেনতেন চুক্তি করতে বাধ্য হয়। ব্যতিক্রম ছিল চীন ও কানাডা। দুটি দেশই পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। ট্রাম্প ডেনমার্কের আওতাধীন গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার ঘোষণা দেন। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হওয়ার প্রস্তাব দেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার (!) করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন আর ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হঠাৎ করে ইরানকে সামরিক আক্রমণ করে বসেন। ভেনেজুয়েলা প্রতিরোধ করতে না পারলেও ইরান গড়ে তোলে শক্ত প্রতিরোধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছুড়ে দেওয়া মিসাইল ও ড্রোন তারা ভূপাতিত করতে থাকে। আবার মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে স্থাপিত আমেরিকান সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরান উপর্যুপরি হামলা চালায়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় সন্তুষ্ট নয়। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এরই মধ্যে সম্মিলিত নিরাপত্তার শর্তে মক্কা জোট গঠন করেছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে।
মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার চেয়ে এসসিওর সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন মাত্রা নিয়ে আসবে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য যেমন সবসময় একটা দেশের সম্ভাবনা বাড়ায়, বিশ্ব রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশও তেমন একটা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে
ইরান, চীন ও কানাডার চ্যালেঞ্জ এখন বিশ্ববাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় আচরণ মুখ বুজে মেনে নেওয়ার বিকল্প আছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী ফেব্রুয়ারিতে দাভোস অর্থনৈতিক ফোরামের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম উচ্চারণ না করে বলেছিলেন, মধ্যসারির দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে শীর্ষস্থানীয় দেশের খামখেয়ালি ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা বিশ্বশান্তি নষ্ট করতে পারে।
৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ১০-জাতি এসসিওর শীর্ষ সম্মেলন যেন সেই ঐক্যের একটি মহড়া। ১৬টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। সম্মেলন শেষে বিশকেক ঘোষণায় বিশ্ব নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন স্থান পেয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিপরীতে বিকল্প মনোভাব প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকার ওপর যেমন জোর দেওয়া হয়েছে, একইভাবে জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে অযাচিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার রীতিনীতি উপেক্ষা করে একতরফা বাণিজ্য শুল্ক আরোপের সমালোচনা করা হয়েছে। ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নাম উচ্চারণ করে কঠোর নিন্দা জানানো হয়েছে। ঘোষণায় ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনে ইরানের অধিকারের প্রতিও সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের নিন্দা করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ও অস্থিরতার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার প্রশ্নটি মীমাংসা করতে বলা হয়েছে।
কোনো কোনো ঘটনা বা উপলক্ষ বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইরানি প্রতিরোধ নিঃসন্দেহে তেমন একটি ঘটনা। পাশাপাশি চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উত্থান বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। বিশকেক সম্মেলন সেই সমীকরণের উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
বাংলাদেশ মক্কা জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। মক্কা জোটের তিনটি দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে। ফলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূল জোট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। জোটভুক্ত তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো। অতএব, এই জোটে সরাসরি যুক্ত না হয়েও দ্বিপক্ষীয়ভাবে প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উন্নত করতে পারে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অল্প কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। যদি তারা বাংলাদেশকে এই জোটে দেখতে চাইতেন, তবে নিশ্চিত ঢাকা সফরকালে সে প্রস্তাব দিতে পারতেন। যেহেতু সে সময় বিষয়টি আলোচিত হয়নি, সেজন্য অনুমান করা যায়, বাংলাদেশকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করতে সদস্য দেশগুলোর অতটা আগ্রহ নেই। সেরকম ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অতি আগ্রহ অর্থহীন। অপরদিকে এসসিওতে পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হতে বাংলাদেশ ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে। দুর্ভাগ্য, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের অনুরোধ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের সামনে এখন সুবর্ণ সুযোগ। এসসিওর পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন হতে যাচ্ছে পাকিস্তানে। যেহেতু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন উষ্ণ, চীন বা রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো, সেহেতু উদ্যোগী হলে আগামী বছরের মধ্যে হয়তো বাংলাদেশ এসসিওর পর্যবেক্ষক হওয়ার সুযোগ পাবে। মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার চেয়ে এসসিওর সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন মাত্রা নিয়ে আসবে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য যেমন সবসময় একটা দেশের সম্ভাবনা বাড়ায়, বিশ্ব রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশও তেমন একটা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে। আর এসসিওতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি সরকারের জন্য হবে অ্যাসিড টেস্ট। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানধারী সরকার যদি এসসিওতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তবেই প্রমাণ হবে সরকার প্রকৃতই কোনো দেশের প্রতি নতজানু নয়; বরং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত






