মজুদ পর্যাপ্ত, তবুও কৃষকের হাতে মিলছে না সার

ফাইল ছবি
সরকারি গুদামে সারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে কাটছে না সংকট। বরং দিন যত যাচ্ছে, সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোররাত থেকে ডিলারের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন কৃষকরা। কোথাও আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট, স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বল তদারকি এবং বিতরণ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে চলতি মৌসুমে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাগুরার বালিদিয়া ও মঘি ইউনিয়নে সরেজমিনে দেখা গেছে, সার কিনতে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকরা। তীব্র গরমের মধ্যে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও অনেক ডিলার চাহিদামতো সার দিচ্ছেন না। এক বস্তা বা ৫০ কেজি সারের চাহিদার বিপরীতে কোথাও ১০ থেকে ১৫ কেজি করে সার দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই সার কিনতে কৃষকদের বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি কৃষিকাজও ব্যাহত হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দিনাজপুর, রংপুর ও কুড়িগ্রামের মতো কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে আমন ধানের বৃদ্ধি ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সারের সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকরা ফজরের আজানের পরপরই ডিলারের দোকানের সামনে জুতা বা বস্তা রেখে লাইনে অপেক্ষা করছেন। এরপরও অনেককে দিন শেষে শুনতে হচ্ছে, ‘সার শেষ’।
নওগাঁ, বগুড়া ও পাবনায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, খুচরা বাজারে প্রতি বস্তা সারে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন চর ও হাওরাঞ্চলে নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
মাঠপর্যায়ের এমন পরিস্থিতির বিপরীতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে সারের জাতীয় সংকট নেই। সরকারি তথ্যমতে, বাফার গুদামগুলোতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী পাইপলাইনেও নিয়মিত নতুন চালান আসছে।
সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে কেন্দ্রীয়ভাবে সারের সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি অনেক বেশি সন্তোষজনক। কোনো ঘাটতি নেই। তবে কিছু অসাধু ডিলার, মধ্যস্বত্বভোগী ও সাব-ডিলার অতিরিক্ত মুনাফার আশায় অবৈধ মজুদ গড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সংকট নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা’ সংশোধন করে মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি ও লাইসেন্সবিহীনভাবে বাফার মজুদ রাখার অভিযোগে কয়েকটি দোকান সিলগালা, জরিমানা এবং অভিযুক্ত ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মরক্কো, সৌদি আরব ও কানাডা থেকে জরুরি ভিত্তিতে নতুন চালান দ্রুত খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান মূলত বাজার এলাকা ও মহাসড়কের পাশের বড় দোকানকেন্দ্রিক। প্রত্যন্ত গ্রামীণ হাট-বাজারে নজরদারি কম থাকায় সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছেন। অনেক ডিলার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিংবা প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ করে রাতের আঁধারে সার কালোবাজারে পাচার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ফসলের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান ও রবিশস্যের প্রাথমিক বৃদ্ধির সময়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিএপি ও টিএসপি না পেলে গাছের শিকড় দুর্বল হয় এবং কুশি উৎপাদন কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি গুদামে সার মজুদ থাকলেও তা সময়মতো কৃষকের জমিতে পৌঁছাতে না পারলে সেই মজুদের সুফল পাওয়া যাবে না। তাই ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি এবং নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সময়মতো সার না পাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।







