অচল ৪০ কোটির সুপেয় পানি প্রকল্প, চলছে মাছ ধরার উৎসব

ছবি: আগামীর সময়
বাগেরহাট পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ভৈরব নদীর পানি পরিশোধন করে পচা দিঘিতে সংরক্ষণ এবং পরে তা শোধনের মাধ্যমে পৌরবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। তবে নির্মাণের পর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করেই বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটির কার্যক্রম। এরপর প্রায় চার বছর ধরে অচল পড়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প।
অন্যদিকে, পানি সরবরাহ প্রকল্পের জলাধার হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকা ঐতিহ্যবাহী পচা দিঘি ইজারা দিয়ে মাছ চাষ ও মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুই দিন ধরে দিঘিটিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজারেরও বেশি শৌখিন মাছ শিকারি অংশ নেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল পচা দিঘিটির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ শিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটের জন্য নেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে ১০৮টি ঘাট থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শৌখিন মাছ শিকারিরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বড়শি ফেলে মাছ ধরেন।
আয়োজকদের দাবি, দুই দিনে শত মণের বেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাছ ধরার সময় কেমিক্যালযুক্ত টোপ ও বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের কারণে দিঘির পানি দূষিত হচ্ছে। এতে পানিতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। মাছ ধরার আয়োজন শেষ হওয়ার পরও কয়েক দিন পর্যন্ত পানিতে থাকে দুর্গন্ধও। দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানির বোতল, ওয়ানটাইম প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসতে দেখা গেছে।
মাছ ধরার সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন কেমিক্যাল ও খাদ্যদ্রব্য পানিতে মিশে দিঘির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে— অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান বলেন, ‘এই পানি রান্না, গোসলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি। দিঘির চারপাশে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময় বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় মাছ মারা গেলে ওষুধ দেওয়া হয়। আবার মাছ ধরার জন্য কেমিক্যাল মেশানো পচা চার ব্যবহার করা হয়। এতে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। আগে এই পানি মানুষ পান করত। এখন কোনোভাবেই তা খাওয়ার উপযোগী নেই।’
‘বাগেরহাট পৌরসভায় এমনিতেই পানির সংকট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো দিঘিটি ইজারা দিয়ে মাছ ধরার মাধ্যমে রাজস্ব নেওয়া হচ্ছে’— যোগ করেন রমজান।
একই সুরে ক্ষোভ ঝাড়লেন আরেক বাসিন্দা শিমুল। বললেন, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার কারণে দিঘির পানির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আশপাশের বাড়িঘরের মানুষ এই পানি রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে। কেমিক্যাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে এখন পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমন শেখ বললেন, শহরে যদি এই পানি শোধন করে সরবরাহ করা যায়, তাহলে মানুষের অনেক উপকার হবে। সায়রা থেকে যে পানি সরবরাহ করা হয়, সেটিও তেমন ভালো নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দা জানালেন, ‘বাগেরহাট শহরের মানুষের পানির কষ্ট দূর করার জন্য পচা দিঘিটি দুই দফায় খনন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল শহরের মানুষের পানির সংকট দূর করা। কিন্তু সেই পানি এখন শহরের মানুষ পাচ্ছে না। অনেককে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। জনগণের স্বার্থে তৈরি করা দিঘি এখন কিছু মানুষের স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে। এখানে মাছ শিকার করে কয়েকজন রাজস্ব পাচ্ছেন, কিন্তু বাগেরহাট শহরের হাজার হাজার মানুষ পানির সংকটে ভুগছেন।’
চার বছর ধরে অচল প্রকল্প
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচা দিঘিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও আর সচল হয়নি।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ধরেছে মরিচা। রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ কয়েকটি মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে বলেও জানা গেছে।
দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ইজারা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, পচা দিঘিটি পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় জলাধার হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে মাছ চাষ ও মাছ শিকারের জন্য ইজারা দেওয়া হচ্ছে। এতে দিঘির পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চালু করা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
তবে দিঘির ইজারা নেওয়া মৎস্যজীবী লীগের নেতা মো. আলমগীর হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে কখনো সার বা কীটনাশক ব্যবহার করি না। মাছের জন্য যে খাবার উপকারী, সেটিই ব্যবহার করা হয়। প্রাকৃতিক উপাদানই ব্যবহার করা হয়। এতে পানির কোনো ক্ষতি হয় না, বরং পানির উপকার হয়। দীর্ঘ আট বছর ধরে সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে এটি করছি।’
কী বলছে স্থানীয় প্রশাসন
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘এটি ছয় বছরমেয়াদি একটি প্রকল্প ছিল। বাগেরহাটের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে এই পুকুরের পানিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই পরিকল্পনা ছিল। পাম্প হাউস তৈরি করে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।’
‘প্রকল্পটি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এখানকার পানি ট্রিটমেন্ট করে সরবরাহ করা যায় কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। যেহেতু এটি দীর্ঘমেয়াদি লিজের আওতায় আছে, তাই লিজের মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে পুকুরটিকে পানির জন্য, বিশেষ করে খাবার পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটি আমরা দেখব’— যোগ করেন ডিসি বাতেন।







