কাজে আসছে না ১৪০ কোটির কাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি। কোথাও কোমরপানি। রান্নাঘর, গোয়ালঘর পেরিয়ে পানি ঢুকেছে বসতঘরেও। গৃহপালিত পশু ঠাঁই পেয়েছে উঁচু সড়কে। কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই। টানা বৃষ্টিতে আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে যশোরের ভবদহ অঞ্চল। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনে শেষ হয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্প। এরপরও কাজের সুফল পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।
লঘুচাপের প্রভাবে চলতি জুলাই মাসে টানা বৃষ্টিতে ভবদহের প্রায় ৫০ গ্রাম এক মাস ধরে প্লাবিত রয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, ধর্মীয় উপাসনালয়, মাছের ঘের ও পুকুর। স্থানীয়দের হিসাবে, শুধু মাছের ঘের ও পুকুরের ক্ষতিই প্রায় ২০ কোটি টাকা। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা হচ্ছে প্লাবিত। দুর্ভোগে পড়েছেন ভবদহ অঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ।
অভয়নগর উপজেলার ডহর মশিয়াহাটি, ডুমুরতলা, আন্দা, বলারাবাদ, বেদভিটা, চলিশিয়া, বারান্দী, দিঘলিয়া, দামুখালী, কপালিয়া, দত্তগাতীসহ মনিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে পানি ঢুকেছে ঘরের ভেতরেও।
ডুমুরতলা গ্রামের স্কুলশিক্ষক শিবপদ বিশ্বাস বললেন, ‘গ্রামের ১৫৫টি বাড়ির মধ্যে ছয়টি ছাড়া সব বাড়ির উঠানে দুই থেকে তিন ফুট পানি উঠেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।’
মনিরামপুরের হরিদাশকাটি ইউনিয়নের দীপকর মণ্ডল বললেন, ইউনিয়নের ২২টি গ্রামের মধ্যে কয়েকটি গ্রামের এলাকা এবং আরও কয়েকটি গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে পানি উঠেছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি নদীর কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। প্রকল্পের আওতায় হরিহর, হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করা হচ্ছে। এর মধ্যে হরি-তেলিগাতি নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং টেকা নদীর ৭ কিলোমিটার খনন শেষ হয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুমে প্রকল্পের সুফল না পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে এর কার্যকারিতা নিয়ে।
সরেজমিনে ভবদহ স্লুইসগেট গিয়ে দেখা যায়, গেটের কপাট ওঠানামা করছে না। চারটি পাওয়ার পাম্প চালু রয়েছে এবং আরও পাঁচটি পাম্প স্থাপনের চেষ্টা চলছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পাম্প চালিয়েও পানির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বললেন, ‘কয়েক দিনের সামান্য বৃষ্টিতেই ৫০টির বেশি গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য বিল এলাকায় টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার) চালু করা ছাড়া বিকল্প নেই।’
অভয়নগর উপজেলার চলিশিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সানা আ. মান্নান বললেন, ২০১৩ সালের পর ভবদহ অঞ্চলের কোনো বিলে টিআরএম চালু না থাকায় পলি জমে পানি নিষ্কাশনের প্রধান নদীগুলোর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাঁচ-ছয়টি বিলের পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ আমডাঙ্গা খাল সংস্কার না করা এবং খালের ওপরের ত্রুটিপূর্ণ সেতুর কারণে পানি নিষ্কাশন আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ডুমুরতলা-বেদভিটা, বলারাবাদ, আন্দা-বলারাবাদ ও আন্দা-ডুমুরতলা সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। মশিয়াহাটি-সুন্দলী সড়কের অন্তত ১০টি স্থানেও উঠেছে পানি। অনেকেই গৃহপালিত পশু সরিয়ে নিচ্ছেন উঁচু সড়কে। বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন কেউ কেউ।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বললেন, ভবদহ অঞ্চলের পাঁচটি নদী সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খননকাজ চলছে। হরি নদীর খর্নিয়া এলাকায় একটু সমস্যা ছিল। সেটি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। নদী দিয়ে পানি বের হতে শুরু করেছে। স্লুইসগেট খুলে দিলে দু-তিন দিনের মধ্যে পানি কমতে থাকবে।




