Agamir Somoy E-Paper
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
অসহায় মানুষের পাশে সরোয়ার
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় স্মরণ

সৈয়দ শামসুল হক

বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রত্নভাষ্যকার

ধ্রুব সাদিক
agamir somoy
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৯
বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রত্নভাষ্যকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়

দাঁড়াও, নবীন তুমি ভৈরবের কাছে এসে দাঁড়াও

আবার তোমার পায়ের অপেক্ষায় আছে এই ভোরে

ভৈরবের বাদন কালে পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে।

— সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ হক যে বলতেন তিনি ‘সার্বক্ষণিক লেখক’ আর তার করোটির ভেতরে উড্ডীন থাকতো ভাবনা, এর একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ তিনি আমাদের সামনে রেখে গেছেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ অলোকলোকে আবাস নেয়ার ১৩ দিন পূর্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায়ই তিনি লিখে গেছেন উপরে উদ্ধৃত পঙক্তিগুলি। একাশি বছরের দীর্ঘজীবনটি শুধু তার দৃঢ় বিশ্বাসটিতে—লেখাটাই তার একমাত্র কাজ—আস্থা রেখেই কাটিয়ে দিয়েছেন? না। সৈয়দ শামসুল হক হলেন বাঙালির হৃদয়ের সেই কলঘর এবং আত্মপরিচয়ের প্রত্নভাষ্যকার যিনি এই দেশের মাটি, রাজনীতি, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, আত্মসন্ধান, প্রেম, ব্যক্তিগত ও যৌথ আনন্দ-বিষাদ, সমস্যা-সংকটের কথা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন তুলে ধরেছেন তার সাহিত্যকর্মে।

সৈয়দ শামসুল হক হলেন বাঙালির হৃদয়ের সেই কলঘর এবং আত্মপরিচয়ের প্রত্নভাষ্যকারকেন তিনি বাঙালির হৃদয়ের কলঘর এবং আত্মপরিচয়ের প্রত্নভাষ্যকার, এর বিস্তারে আমরা বহুভাবেই যাবো। উল্লেখ করি, সৈয়দ হক মনে করতেন, সাহিত্যের ভাষাটা হচ্ছে চিত্রকরের রং এর মতো। ‘যে কম্পোজার তার সেই ধ্বনির মত। সাউন্ডের মতো।’ তিনি এ-ও মনে করতেন, সাহিত্যচর্চা মানে অশিক্ষিতের পটুত্ব নয়। ‘সাহিত্যচর্চা মানে জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে নতুন সাহিত্য সৃষ্টি।’

কবিতা, গদ্য, কাব্যনাটক—সাহিত্যের সকল শাখায় ভাষা ও নির্মাণশৈলীতে নতুনত্ব আনা সৈয়দ হক কবিতায় এতটাই নিমজ্জিত থাকতেন যে যখন লিখতে বসতেন তখন একটা প্রবল জলরাশি হঠাৎ করে একটা নির্গমের পথ পেয়ে যেন দৌড়ে বেড়িয়ে যেতো; নিজেই খাল কেটে চলে যেতো। সেই নিমজ্জন আমরা ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’য় অনুধাবনও করতে পারি।

কবি ব্রিটিশশাসিত বাংলা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বকার সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে যে পরিস্থিতি ছিল, সেই সব সামাজিক অস্থিরতার চিত্র এঁকেছেন গ্রন্থটিতে। তবে সৈয়দ হকের মুন্সিগিরি এই যে ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডে মানুষের জীবনের নৈরাশ্য, উদভ্রান্তি, ক্ষয়, অবসাদ, বিবমিষা, রিরংসা, বিকার ও বিক্ষোভ প্রভৃতি বিষয় ও বস্তুর আত্মজৈবনিক উচ্চারণ তার কবিত্বশক্তির দ্বারা সমষ্টিগতভাবে প্রকাশ করতে করেছেন। নারী, প্রেম, রিরংসা, আত্মবেদনা, অসংগতি, ইতিহাস, মিথ, ঐতিহ্য এবং সমাজসহ নানান পার্থিব বিষয় ও বস্তুও তিনি সমকালীন জীবনের পটভূমিতে স্থাপন করে প্রকাশ রেখেছেন। উল্লেখ্য, তার চিত্রে জনজীবনের প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ শুধু যে উঠে এসেছে তাই নয়, জনজীবনে প্রচলিত ভাষাকেও তিনি নতুন মর্যাদা দান করতে পেরেছেন।

জনজীবনে প্রচলিত ভাষাকেও সৈয়দ শামসুল হক নতুন মর্যাদা দান করতে পেরেছেন‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কাব্যনাট্যের সবচেয়ে বড় শক্তিটি কি শুধু এর ভাষায়? প্রথাগত গদ্যের পরিবর্তে তীব্র আবেগঘন, ছন্দোময় ও কাব্যিক সংলাপে? লোকায়ত শব্দের সাথে আধুনিক কাব্যরীতির মিশ্রণ-এ? বা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের যুদ্ধের গল্প? না, আসলে। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে এদেশের সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা, দোলাচল, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং শেষাবধি পরম আকাঙ্ক্ষিত বিজয়ের যে রূপান্তর, তা এই নাটকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ঠিকই। তবে সৈয়দ হক যে গভীর ব্যাপারটি প্রতিবিম্বিত করেছেন তা হলো: হৃদয় সরলতা আর ঝঞ্ঝাট অপছন্দ হওয়ার কারণে এই জাতির মানুষ অবরুদ্ধ ও শোষিত হয় বটে; কোথায় যাবে কি করবে, শুরুতে সেই দিশাও তারা পায় না ঠিকই; তবে ভয়ের দেয়াল ভেঙে শৃঙ্খলমুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য রক্ত দিতে তারা পিছপা হয় না। বাচ্চার খিদের মুখে শুকনা দুধ দিয়ে এদেশের নারীরাও ঠিক একজোড়া চক্ষু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মুক্তির জন্য।

আজ পাঁচ দশক পরেও যখনই কোনো অন্যায় বা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তখন থিয়েটারের মঞ্চে কিংবা মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে নতুন করে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ঝংকৃত হয়। ফলে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, কেবল কোনো সাধারণ মানুষের হাঁটার শব্দ নয় ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, এই কাব্যনাট্য একটি জাতির আত্মআবিষ্কারেরই ইতিহাস:

মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা/ মানুষ আসতে আছে ফুলবাড়ী নাগেশ্বরী থিকা/ মানুষ আসতে আছে যমুনার বানের লাহান/ মানুষ আসতে আছে মহররমে ধূলার সমান/ মানুষ আসতে আছে ছিপ ডিঙি শালতি ভেলায়/ মানুষ আসতে আছে লাঠি ভর দিয়া ধূলা পায়/ মানুষ আসতে আছে বাচ্চাকাচ্চা-বৌ-বিধবা বইন/ মানুষ আসতে আছে আচানক বড় বেচইন...

[‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’]

সৈয়দ হককে অনুসরণ করে তার কালের ও তার পরবর্তী কালের কবিরা আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেনকাব্যনাট্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় লেখার সময়ই সৈয়দ হকের মনে প্রশ্ন আসে: ‘ভাষার একটি রূপ কি স্মৃতি, অনুষঙ্গ, কল্পনা এবং অভিজ্ঞতার বিশেষ একটি সীমা নির্দেশ করে দেয় উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে? এলোমেলো চুল আর আউলাঝাউলা কেশ কি মর্মের ভেতরে এক এবং অভিন্ন?’ এই সব প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে গিয়ে তিনি ‘পরানের গহীন ভিতর’-এর সনেটগুলো লিখেছেন। কবি এও বলেছেন, ‘ইংরেজি ভাষার আওতার ভেতরেই একজন মার্কিন কালো কবি, একজন স্কটিশ কবি, একজন আফ্রিকান কবি যদি লৌকিক বাগুঙ্গি, শব্দ এবং উচ্চারণ ব্যবহার করে সার্থক ও স্মরণীয় কবিতা লিখতে পারেন, আমরাই-বা বাংলায় সে সম্ভাবনা পরীক্ষা করে কেন দেখব না?’ এই সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে গিয়ে সৈয়দ হক অনুভব করেছেন তার পূর্বকালের অজানা-অচেনা লোককবিদের উপস্থিতি। এবং তাঁদের সঙ্গে লড়াই করে তার কালের এবং তার অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা এমন বাক্য গঠনরীতি, উচ্চারণ-সুর ও ঝোঁক এবং লৌকিক অনুষঙ্গের ভেতরে প্রসূত করে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার রীতিটি বাংলাসাহিত্যে অনেক পুরনো ব্যাপার। সৈয়দ হককে অনুসরণ করে তার কালের ও তার পরবর্তী কালের কবিরা আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ করি, সৈয়দ হকের পরানের গহীন ভিতর রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত নয়। কবিতাগ্রন্থটির কবিতাগুলো কবি এমন এক পোয়েটিক ডিকশন-এ লিখেছেন, যে ভাষাটি কবির নিজের সৃষ্ট। ‘আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক... ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর,’ এই কথা উল্লেখ করে সৈয়দ হক বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন যে এটা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা নয়। কবিত্বের জাদুর কাঠিতে বাংলার মানুষের মুখের ভাষার যে মিষ্ট ও সহজ অভিব্যক্তি, কবি তা ধারণ করে কবিতার পঙক্তিতে সপ্রাণ করে তুলেছেন।

‘তােমারে যে ভালােবাসে এর থিকা আরাে পাঁচগুণ/ আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান,/ আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন/ দোয়াত ভরায়া দিমু...’ উল্লেখ করি, ১৯৮০ সালে ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকায় নবী মুনশী ছদ্মনামে কবিতাগ্রন্থটির সনেটগুলো প্রকাশিত হওয়ার সময় সৈয়দ হকের বিবাহিত জীবন প্রায় ১৫ বছরের। উদ্ধৃত পঙক্তিগুলো পাঠ করে আমাদের এই বিস্ময়েও বিস্মিত হতে হয় যে কোন সে তুমুল রূপবতী সৈয়দ হককে এমন তুমুল প্রেমে হাবুডুবুরত রাখতে পেরেছেন! আর প্রেমের উত্তাপে সাচ্চা ঈমানদারের মতন আল্লাহর কসম খেয়ে কবি তার প্রেমিকাকে তার চেয়ে বেশি যে ভালােবাসে, প্রেমিকাকে নয়, সেই প্রেমিককেই দিতে চেয়েছেন আরাে পাঁচগুণ বেশি ভালবাসা! এমনকি ভরিয়ে দিতে চেয়েছেন দোয়াতে শরীরের খুন পর্যন্ত!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উল্লেখ করে বলা যায়, প্রেমের দ্বারা চেতনা যে পূর্ণশক্তি লাভ করে, সেই পূর্ণতার দ্বারাই মূলত মানুষ সীমার মধ্যে অসীমকে, রূপের মধ্যে অপরূপকে দেখতে পায়। সৈয়দ হকও হয়ত সীমার মধ্যে অসীমকে, রূপের মধ্যে অপরূপকে দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও যদি বিস্ময়ের অন্ত না রয় না, কবির দ্বিধাথরথর তুমুল পঙক্তিগুলোর শেষ পঙক্তি দুটির গভীরে মনোনিবেশ করতে হয়। কবিতা দিয়েই প্রেমের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিতে চেয়েছেন প্রেয়সীকে। কিন্তু প্রেমে থরথর কবি হৃদয়ের গোপন-গভীর তীরতীর তীব্র তলদেশের তারোধিক গভীরে দুঃখ রেখে বানপ্রস্থ প্রেমিকদশার পরও প্রেমের চেতনা পূর্ণশক্তি লাভ করার কারণে কবিতার ও প্রেমিকার প্রতি রাখা ঈমান থেকে সরে না-এসে বলেন: ‘সে য্যান আমার থিকা আরাে ভালাে পদ্য লেখে আর/ যাদুমন্ত্রে রূপার শিকল হাতে দিতে পারে তার।’

সৈয়দ হকও আত্মপরিচয়ের প্রত্নচিহ্ন আঁকেন তার কাতর প্রেমিকের দ্বারা‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/ যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর ৷’— অদৃশ্য এক রুমাল নাড়ানো—এ মূলত প্রেমিক বাজিকরের বড় দারুণ বাজি। সৈয়দ হক দেখান, যেহেতু হৃদয়রাজ্যটির সার্বভৌমত্ব শুধুই প্রেমিকের, ফলে প্রেমিক কোন কালে পাওয়া-না-পাওয়ার পরোয়া করে না। প্রেমিকের চিরাচরিত স্বভাব এই যে, সে খেলা দেখাবে তার দেখানোর ইচ্ছায়; সে ডাহুক উড়িয়ে দিয়ে বুকের গভীরে দীর্ঘ হুতাশ করবে; সোনার মোহর তার পড়ে থাকবে পথের ধূলায়; ধরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বুকে পুষে রাখলেও প্রেমের গোঁ-ভররত প্রেমিক ধরবে না ডাহুকটিকে। প্রেমিকজীবন বাজি রাখবে সে পরানের গহীন ভিতরে।

‘সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,

খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,

ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,

সোনার মোহর তার পড়া থাকে পথের ধূলায়।’

[পরানের গহীন ভিতর ]

‘পরানের গহীন ভিতর’-এ সৈয়দ হক চর্যাপদের পদগুলির নরনারীর আনন্দ, দুঃখ এবং জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের মিশ্রণকেও যেমন অবলম্বন করেছেন, তেমনি বৈষ্ণব পদাবলী, ইউসুফ-জুলেখা, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও গুলে বকাওলী-এর মতো কাব্যগুলোর মানবীয় ও নন্দনপ্রীতিমূলক প্রেমকেও অবলম্বন করেছেন। মধ্যযুগের কাব্যে প্রেম ছিল মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা ও আনন্দ-মধুর জীবনের প্রতিচ্ছবি। চণ্ডীদাস যেমন কাতর স্বরে বলেন, ‘সই, কেমনে ধরিব হিয়া?/ আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়, আমার আঙিনা দিয়া!’; সৈয়দ হকও আত্মপরিচয়ের প্রত্নচিহ্ন আঁকেন তার কাতর প্রেমিকের দ্বারা, ‘এখন কোথায় যাই, এইখানে বড় সুনসান,/ মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কিনা জানি না—/ জগৎ এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা।’

বাংলাসাহিত্যে ধ্রুপদি মর্যাদা লাভ করা এই কবিতাগ্রন্থটিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় নিহিত রয়েছে: কবি বাংলার নরনারীর প্রেমের বাজি, জীবনের ক্লেদ, জটিলতা, জীবন-জিজ্ঞাসা আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেই প্রেমিকশোভার রূপটি প্রতিবিম্বিত করেছেন। তবে কবি শুধু প্রেমিকের দহনই কবিতাগ্রন্থটিতে প্রকাশমান রাখেননি, প্রেম, প্রেমিকার হৃদয়েও সিঞ্চনরত থেকেছেন। নারীত্বকে ধারণ করে গ্রন্থটির ১৫, ১৭ এবং ৩৩ নম্বর সনেটে নারী হৃদয়ের আকুতি তো এঁকেছেন। চিত্রকল্প এবং উপমার প্রয়োগে তিনি কথকের ভূমিকায় রেখেছেন নারীকে: ‘তোমার খামচির দাগ এখনো কি টকটাকা লাল,/ এখনো জ্বলন তার চোৎরার পাতার লাহান।/ শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কি সোন্দর গাল...’

‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর/ নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।’— এই আকুতি এঁকে কবি আবার বলেন, ‘আমারে সোন্দর তুমি কও নাই কোনো একদিন,/ আমার হাতের পিঠা কও নাই কি রকম মিঠা,/ সেই তুমি তোমারেই দিছি আমি যুবতীর চিন-/ চোখ-কানা দেখ নাই বিছানায় আছে লাল-ছিটা?’ নারীর অবহেলা সইতে না-পারার প্রত্নচিহ্নটিও তুলে ধরেছেন সৈয়দ হক। কার্ল ইয়ুং যৌনতাকে জীবনশক্তির একটি শক্তিশালী প্রতীকী অভিব্যক্তি হিসাবে দেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই শক্তি যখন অস্বীকার করা বা দমন করা হয় তখন নেতিবাচক মানসিক ফলাফলের দিকে পরিচালিত করতে পারে। যৌন অবহেলায় নারীর মনে নদীর মত শুকিয়ে চর জাগে; নারীর মন অন্য পুরুষকে আকাঙ্ক্ষা করে— এই ব্যাপারটি কবি আলোকিত করেছেন এই ভাবে: ‘তয় কি তোমারে আমি ফাঁকি দিয়া পিছন বাড়িতে/ যামু তার কাছে কও আমারে যে দিতে যায় পান? অথবা জিগার ডালে ফাঁসি নিয়া নিজের শাড়িতে/ ভূত হয়া তোমার গামছায় দিমু আন্ধারে টান? তখন আমারে তুমি দেখি হেলা করো কি রকম।’

সৈয়দ হক বাংলার চিরাচরিত অবদমিত মনেরও একটি ছবি এঁকেছেন এই গ্রন্থটিতেযৌনতাকে দমন করার পরিবর্তে সংহত করা উচিত বলেও মনে করতেন ইয়ুং। অচেতন বা অবদমিত যৌন প্রবণতা যদি উপেক্ষা করা হয় তবে আসক্তি, আবেশ, সম্পর্কের সমস্যা বা সংবেদনশীল বিচ্ছিন্নতা হিসাবে প্রকাশ হতে পারে। সৈয়দ হক বাংলার চিরাচরিত অবদমিত মনেরও একটি ছবি এঁকেছেন এই গ্রন্থটিতে।

প্রত্নতত্ত্ব আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কোথায় এবং কখন মানুষ পৃথিবীতে বাস করত এবং তারা কীভাবে বসবাস করেছিল তাও। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সময়ের সাথে পরিবর্তন পরীক্ষা করেন, নিদর্শন এবং ব্যাখ্যা খোঁজেন। কিন্তু সৈয়দ হক বাঙালির প্রেম, বিরহ, কামতৃষ্ণা, বিচ্ছেদবেদনা, প্রবৃত্তির সবটুকু সারাৎসার ধারণ করে আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রত্নচিহ্নই শুধু আঁকেন তাই নয়, এঁকেছেন দমের ভিতরে থামা আচমকা অচিনঘাটে গিয়ে পড়া তিস্তানদীর বুকরঙ্গি মাছের কাতার, যমুনার চিতল প্রভৃতি:

আবার তোমার কোলে ফিরা যায় তোমার সন্তান,

আবার তোমার কোলে, খালি কোল, উথলায়া পড়ে

দুধের ঘেরানে ভরা, জননী গো, পুন্নিমার চান–

আবার সে ঘরে ফিরা আইসাছে সারাদিন পরে।

আবার সে আইসাছে করালের ঘুম চক্ষে নিয়া,

চক্ষের ভিতরে তার গেরেপ্তার বিহানের সোনা,

তবনের নীল খোপে শিমুলের লাল রঙ নিয়া,

আবার সে আইসাছে, জননী গো, তুমি কাইন্দো না।

[পরানের গহীন ভিতর ২৪]

লেখক: কবি প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

সৈয়দ শামসুল হক
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    বিদায় নেবেন কর্মীরা, ৩৭০ বিষধর সাপের কী হবে

    বিদায় নেবেন কর্মীরা, ৩৭০ বিষধর সাপের কী হবে

    হাসিনার বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে বাংলাদেশ-ভারত, আশা যুক্তরাষ্ট্রের

    হাসিনার বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে বাংলাদেশ-ভারত, আশা যুক্তরাষ্ট্রের

    সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ১৩ প্রার্থী চূড়ান্ত, কে কোথায়

    সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ১৩ প্রার্থী চূড়ান্ত, কে কোথায়

    প্রশাসকরাই পাচ্ছেন বিএনপির সবুজ সংকেত

    প্রশাসকরাই পাচ্ছেন বিএনপির সবুজ সংকেত

    দুই কিডনি ছিল অকেজো, মায়ের স্বপ্ন পূরণে মৃত্যুকে হারিয়ে জজ হলেন তাইজুল

    দুই কিডনি ছিল অকেজো, মায়ের স্বপ্ন পূরণে মৃত্যুকে হারিয়ে জজ হলেন তাইজুল

    কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পঞ্চগড়ে

    কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পঞ্চগড়ে

    জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যসহ আটক অর্ধশতাধিক

    জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যসহ আটক অর্ধশতাধিক

    বান্দরবানের ৪ প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ ফ্রি

    বান্দরবানের ৪ প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ ফ্রি

    তাদের জন্মই হয়নি তবু জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ

    তাদের জন্মই হয়নি তবু জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ

    বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক

    বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক

    মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, মামলা বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

    মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, মামলা বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

    পুলিশে ‘ফ্যাসিবাদের’ চর, কড়া হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

    পুলিশে ‘ফ্যাসিবাদের’ চর, কড়া হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

    ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, হাতবোমা বিস্ফোরণ

    ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, হাতবোমা বিস্ফোরণ

    ভেরিফিকেশন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই : মন্ত্রণালয়

    ভেরিফিকেশন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই : মন্ত্রণালয়

    গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে টিকাদান

    গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে টিকাদান