সিটি করপোরেশনে প্রশাসকেই ভরসা বিএনপির
- জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দেখে সিদ্ধান্ত নেবে দল
- দলের প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে সবুজ সংকেত পেয়েছেন অনেকে
- সবুজ সংকেত পাওয়াদের জনগণের আস্থা অর্জনের পরামর্শ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রশাসকরাই আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হতে চাইছেন। এরই মধ্যে তারা দলের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপও শুরু করেছেন। দলের নীতিনির্ধারকরাও বলছেন, গ্রহণযোগ্যতা আর জনপ্রিয়তা থাকলে দল তাদের বিবেচনা করবে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, বিদ্যমান প্রশাসকদের কেউ যদি পদত্যাগ করে নির্বাচন করতে চান এবং দায়িত্ব পালনকালে তিনি যদি ভালো কাজ করেন, তার যদি জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকে, তাহলে অবশ্যই দল বিবেচনা করবে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের মধ্যে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে ছয়জন প্রশাসক নিয়োগ দেয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। একসময় তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন।
এ ছাড়া বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা দায়িত্ব পালন করেছেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র হিসেবেও। গত নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন তিনি।
আসন্ন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আব্দুস সালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘মেয়র নির্বাচন করতেই তো এসেছি এখানে (প্রশাসক)। অতীতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া আমি দীর্ঘদিন রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে যুক্ত। আশা করছি, নাগরিক সেবা নিশ্চিতে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে কাজ করতে পারব। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যানের ওপর। তিনি মনোনয়ন (সমর্থন) দিলে নির্বাচন করব। এখন স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছি, যাতে জনগণ বুঝতে পারে যে— আমাকে দায়িত্ব দিলে তাদের জন্য কাজ করতে পারব। এটা পরীক্ষার আগে পরীক্ষা হয়ে যাবে।’
যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। তবে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান তিনি।
শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সরকার আমাকে কাজ করতে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক করে পাঠিয়েছে। আমি কাজ করছি নাগরিক সেবা নিশ্চিতে। আগামীতে দল যদি আমাকে মেয়র পদে সমর্থন দেয়, সেক্ষেত্রে আমি নির্বাচন করব। দল যদি অন্য কাউকে সমর্থন দেয়, তার পক্ষেই কাজ করব। দলই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’
তবে প্রশাসক আব্দুস সালাম ও শফিকুল ইসলাম মিল্টনের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী হতে চান বিএনপির আরও অনেকে। দলের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। এ বিষয়ে সেলিমা রহমান বলেছেন ‘বিএনপি বড় দল, তা ছাড়া বিএনপি এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। সুতরাং অনেকেই আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইবেন, এটা স্বাভাবিক। যথাসময়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে, দল কাকে সমর্থন দেবে।’
এদিকে প্রশাসকের অনেককে এরই মধ্যে মেয়র নির্বাচনে দলের প্রার্থী করার বিষয়ে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির হাইকমান্ড মাঠ গোছানোর অংশ হিসেবে তাদের কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে যাদের দলীয় সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদেরই প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কাজের মধ্য দিয়ে তারা জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের বর্তমান কার্যক্রম, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের সময় কেউ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে কিংবা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট সিটিতে নতুন মুখ বিবেচনায় আসতে পারে।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার আশা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে প্রশাসক নিয়োগ হওয়ায় অন্তত এক বছরের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সরকারের একাধিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আরও যারা আলোচনায়: দক্ষিণে মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আরও আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সাবেক ডেপুটি মেয়র কাজী আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস।
ঢাকা উত্তর সিটিতে আলোচনায় যারা: ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন দলের কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ কাইয়ূম, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তর) এবিএমএ রাজ্জাক, আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক কফিল উদ্দিন আহমেদ।
তাবিথ আউয়াল ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে দলের মেয়র প্রার্থী ছিলেন। এমএ কাইয়ুম ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। মোস্তফা জামান ও কফিল উদ্দিন আহমেদ বিগত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে ছিলেন বিএনপির অন্যতম মনোনয়নপ্রত্যাশী।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। খুলনা-২ আসনের এই সাবেক সংসদ সদস্য এবার একই আসন থেকে নির্বাচন করে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। বিগত জাতীয় নির্বাচনে তিনি সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে মেয়র পদে নির্বাচন করে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েও পাননি।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে বসানো হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি গাজীপুর-২ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
ছয় সিটির ধারাবাহিকতায় গত ১৪ মার্চ বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লায়ও বিএনপি নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেয় সরকার। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন বিলকিস জাহান শিরীন। তিনি বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। মাহফুজুর রহমান দায়িত্ব পান রাজশাহী সিটির। তিনি মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলে আসছেন।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রুকুনোজ্জামান রোকন হন সেখানকার নগর সংস্থার প্রশাসক। রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন মাহফুজ উন নবী চৌধুরী; যিনি রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব। কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা হন সেখানকার সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। সবশেষ গত ১৮ মে নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে জেলা বিএনপির সহসভাপতি এম আর ইসলাম স্বাধীনকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।



