কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পঞ্চগড়ে

কয়েক বছর আগেও খুব অল্প সংখ্যক মানুষই জানত, বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এ বিষয়টি সবার জানার পেছনে বড় ভূমিকা রাখা ফিরোজ আল সাবাহ লিখেছেন কাঞ্চনজঙ্ঘা আর পঞ্চগড়ের ট্যুরিস্ট স্পট নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকছে তার তোলা নজরকাড়া ছবি
পঞ্চগড়ের মানুষ হয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে পরিচয় একদম বুঝ হওয়ার পর থেকেই। একটা ধোঁয়াটে অথচ ভীষণ রঙিন স্মৃতি আজও আমার মনকে নাড়া দেয়। শরতের মিষ্টি রোদে বাবার সঙ্গে ভেসপা মোটরসাইকেলের সামনে বসে যখন মেঠোপথ ধরে গ্রামের বাড়ির দিকে যেতাম ক্ষেত দেখতে, উত্তরের নীল আকাশের কোণে এক অদ্ভুত রুপালি পাহাড়ের রেখা ভেসে উঠত। সেই কোমল চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। বাবা আলতো করে বলতেন, ‘ওটা হিমালয়, বাবা!’ তখন হয়তো সেই সুবিশাল পর্বতমালা কিংবা তার দূরত্বের হিসাব বোঝার মতো বয়স আমার হয়নি; কিন্তু সেই বরফশুভ্র দূর পাহাড়ের চূড়া আমার অবচেতন মনে এক গভীর অনুরাগের বীজ বুনে দিয়েছিল। এর পর থেকে প্রতি বছর শীতের শুরুতে দেখতাম সেই হিমালয়; আকাশের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকতে। কাঞ্চনজঙ্ঘা হয়ে ওঠে সকালে স্কুল যাওয়ার সাথি; বিকালের বিস্তীর্ণ মাঠে খেলার সাথি। এভাবেই কৈশোর কেটে যায়।
সেই শৈশবের বিস্ময় নতুন করে আমার সামনে উপস্থিত হয় আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে। ততদিনে হিমালয় পর্বতমালা নিয়ে অনেক পড়াশোনা, মুভি গল্প গিলে খেয়েছি। ২০০৯-১০ সালের দিকে প্রাপ্তবয়স্ক চোখ, ক্যামেরা আর একবুক কৌতূহল নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম উত্তর জনপদের শেষ সীমানা তেঁতুলিয়ায়। হেমন্তের এক সোনাঝরা সকালে যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্চ, বরফাবৃত চূড়া আমার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলো, আমি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম! চোখের সামনে যা দেখছিলাম, তা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। আমার বাড়ি থেকে যেমন দেখা যায়, তার চেয়ে কয়েক গুণ স্পষ্ট দেখা যায় তেঁতুলিয়া থেকে।
বাংলাদেশের মতো একটি সমতল ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে এভাবে স্পষ্ট ও মোহনীয় রূপে দেখা যাচ্ছে— এটি কোনো সাধারণ ভৌগোলিক ঘটনা হতে পারে না। এটি প্রকৃতির এক বিরল ও অলৌকিক উপহার।
অথচ সেই সময় বিস্ময়করভাবে খেয়াল করলাম, স্থানীয় মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এক দৈনন্দিন দৃশ্য ছিল। সমতল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যমানতার পেছনে যে পর্যটনের এক বিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে তখন কারও কোনো বিশেষ তোড়জোড় বা মাথাব্যথা ছিল না। নিজ জেলা পঞ্চগড় থেকে স্বদেশের মাটিতে বসেই ভারতের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাওয়ার বিষয়টি দেশ ও দশের সামনে তুলে আনার তাগিদ থেকে আমি নিরলস কাজ শুরু করি। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তে ক্যামেরা হাতে অপেক্ষা করা, ফ্রেমের পর ফ্রেমে রুপালি চূড়াকে বন্দি করা এবং তা গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়। ফেসবুকে পোস্ট করা শুরু করলাম। হলাম ট্রলের শিকার।
তেঁতুলিয়ার শালবাহান বা নতুনগাছ এলাকার সবুজ ধানক্ষেতের আলপথ ধরে লাঙল-জোয়াল কাঁধে কৃষকের হেঁটে যাওয়ার পেছনে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল সোনালি কাঞ্চনজঙ্ঘা কিংবা তুলসিয়া বিলে পরিযায়ী পাখির ডানার ঝাপটানি আর তার পটভূমিতে বরফাবৃত পর্বতরাজের রূপ যখন ক্যামেরায় তুলে আনলাম, তখন দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে সেই দৃশ্যগুলো প্রচার হয়। শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘাই নয়; আমাদের পঞ্চগড় থেকে যে সিকিমের ৬ হাজার ৮৮৮ মিটার উঁচু সিনিওলচু কিংবা নার্শিং পর্বতও খালি চোখে স্পষ্ট দেখা যায়, সেসব বিরল দৃশ্য আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রামাণ্য রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মৌসুমে তেঁতুলিয়ায় আসা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজনও করেছি, যাতে মানুষ সমতল থেকে হিমালয় দর্শনের আনন্দ উপলব্ধি করতে পারেন। দীর্ঘ এক যুগের এই সাধনার পর আজ যখন দেখি তেঁতুলিয়ার পর্যটনশিল্প মূলত কাঞ্চনজঙ্ঘাকে কেন্দ্র করেই এক নতুন জোয়ার পেয়েছে, দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক কেবল এই দৃশ্য দেখতে ছুটে আসছেন— তখন হৃদয়ে এক পরম তৃপ্তি অনুভব করি। সেরা সময় কখন
অক্টোবর ও নভেম্বরে যখন উত্তরবঙ্গের আকাশ মেঘ ও ধূলিকণাহীন হয়ে ওঠে, তখন তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলোর আঙিনায় কিংবা মহানন্দা নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এক জাদুকরী মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। প্রাতঃসূর্যের আলো যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র চূড়ায় পড়ে, তখন মুহূর্তেই রঙ বদলাতে শুরু করে পর্বতরাজ। প্রথমে কাঁচা রুপালি, তারপর ঈষৎ গোলাপি, আর সূর্য আরও একটু ওপরে উঠতেই পুরো চূড়াটি প্রদীপ্ত কাঁচা সোনার মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে।আরও দেখবেন
তবে পঞ্চগড়ের রূপ শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়; উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা এই জেলা সমৃদ্ধ প্রাচীন ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও অতুলনীয় নৈসর্গিক সৌন্দর্যে
ভিতরগড় দুর্গনগরী: পঞ্চগড় সদর উপজেলায় অবস্থিত ভিতরগড় প্রাচীন ইতিহাসের এক মহাসমুদ্র। প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল দুর্গনগরীটি আনুমানিক ষষ্ঠ শতকে মহারাজা পৃথু কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। ইট-পাথরের সমন্বয়ে তৈরি চার স্তরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর, বিশালাকার শালমারা দীঘি এবং মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসপ্রেমীদের এক ভিন্ন যুগে নিয়ে যায়।
মির্জাপুর শাহি মসজিদ: চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মসজিদে মোগল যুগের সূক্ষ্ম কারুকার্য, সুদৃশ্য তিনটি গম্বুজ এবং পোড়ামাটির নকশা দেখতে পাওয়া যায়।
রকস মিউজিয়াম: পঞ্চগড় সরকারি কলেজে স্থাপন করা হয়েছে দেশের একমাত্র ‘রকস মিউজিয়াম’। উত্তরবঙ্গের ভূগর্ভ থেকে পাওয়া কয়েক হাজার বছরের পুরনো বিভিন্ন আকৃতি ও রঙের পাথর, খনিজ, জীবাশ্ম এবং এ অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর নানাবিধ স্মারক এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
গোলকধাম মন্দির: দেবীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ১৮৪৬ সালে নির্মিত এই ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দিরটি ভারতীয় সনাতন শৈলীর সঙ্গে গ্রিক স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে তৈরি।
সমতলের চা বাগান ও সীমান্ত নদী: সমতলভূমিতে বিস্তৃত চা বাগানের সবুজ ক্যানভাস দেখতে পাওয়া যায় একমাত্র পঞ্চগড়েই। ভারত সীমান্তে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটসহ ছোট-বড় চা বাগান এই জনপদকে এক সবুজ স্বর্গে পরিণত করেছে। সেই সঙ্গে মহানন্দা নদীতে সূর্যাস্ত এবং নদী থেকে পাথর সংগ্রহের দৃশ্য পর্যটকদের অনন্য আবেগ এনে দেয়।
আসুন, আমরা আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখি এবং পঞ্চগড়ের এই অপরূপ রূপকে বিশ্বমঞ্চে আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরি। এখনো অনেকের কাছে অচেনা এই প্রান্তিক জনপদে আপনাকে স্বাগত!





