ফুলবাড়িয়ায় নিবন্ধন জালিয়াতি
তাদের জন্মই হয়নি তবু জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ
- জন্মই হয়নি অথচ দেওয়া হয়েছে নিবন্ধন আবার ৪৫ দিন পর দেখানো হয়েছে ‘সেই শিশু’র মৃত্যু
- ২০২৫ সালে ১১৫ শিশুর জন্ম ও পরে মৃত্যুনিবন্ধনের অভিযোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গর্ভে নেই শিশু অথচ জন্ম হয়েছে! জন্মের ৪৫ দিন পর আবার সেই শিশুকে দেখানো হয়েছে মৃত। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের নথিতে এমনই ‘অলৌকিক’ ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে প্রমাণ ছাড়াই ১১৫ শিশুর জন্ম ও পরে মৃত্যুনিবন্ধনের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) হাজেরা খাতুনের বিরুদ্ধে।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন শাখা। গত ১ জুলাই রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার সামিউল ইসলাম রাহাদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে রাঙ্গামাটিয়া ইউপির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হাজেরা খাতুনকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে গত ৮ জুলাই ইউপিতে ওই চিঠি পাঠানো হয়।
ইউপি সূত্রে জানা গেছে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের সহকারী নিবন্ধক হিসেবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে অনলাইনে তথ্য এন্ট্রি করেন। এরপর নিবন্ধকের দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান তা অনুমোদন করেন।
কিন্তু রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে প্রমাণ ছাড়াই ১১৫টি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের একটি উদাহরণ আরও বিস্ময়কর। পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের হৃদয় হাসানের ছেলে ‘তাফসির’ নামে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা হলেও স্থানীয়দের দাবি, ওই গ্রামে এ নামে কোনো ব্যক্তি নেই।
ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, শুধু জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হাজেরা খাতুনের বিরুদ্ধে ট্রেড লাইসেন্স ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজেও অনিয়ম এবং অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত পরিষদে উপস্থিত না থাকার অভিযোগও করেছেন তারা।
জন্মনিবন্ধন করাতে সরকারি ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন বিনামূল্যে, ৪৫ দিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ২৫ টাকা এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সে ৫০ টাকা ফি নির্ধারিত। তবে রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে জন্মনিবন্ধনের জন্য ন্যূনতম ২০০ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো রশিদ দেওয়া হয় না।
বিষ্ণুরামপুর গ্রামের ইদ্রিস হাওলাদারের ছেলে তাজিম হাওলাদার প্রায় ২০ বছর বয়সে জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে ২০০ টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, টাকা নেওয়া হলেও তাকে কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি।
গত আগস্টে রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে ৯৬টি জন্ম ও ১৭টি মৃত্যুনিবন্ধন করা হয়। এসব নিবন্ধনে ২০০ টাকা করে নেওয়া হলে মোট ২২ হাজার ৬০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হাজেরা খাতুন বলেছেন, তার আইডি ও পাসওয়ার্ড ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) উদ্যোক্তাকে দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, উদ্যোক্তাই ভুয়া জন্ম ও মৃত্যু সনদের কাজ করেছেন। এ ঘটনায় রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে তাকে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না বলে লিখিত অঙ্গীকার করেছেন।
সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা নেওয়ার বিষয়ে হাজেরা খাতুন বলেছেন, পরিষদের বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে। সে কারণেই জন্মনিবন্ধনের সময় অতিরিক্ত কিছু টাকা নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ইউডিসি উদ্যোক্তা লিমন চৌধুরী তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানের কাজে তিনি সহযোগিতা করেন; তাদের স্বাক্ষরেই জন্ম ও মৃত্যু সনদ দেওয়া হয়।
ইউপি চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, তার আইডি ও পাসওয়ার্ড সচিব জানেন। তার অভিযোগ, লক্ষ্য পূরণ করতে প্রমাণ ছাড়াই জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করে তাকেও বিপাকে ফেলা হয়েছে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ বলেছেন, ভুয়া তথ্য দিয়ে জন্ম ও মৃত্যু সনদ তৈরির অভিযোগে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। চিঠিটি ইউপিতে পাঠানো হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রমাণ ছাড়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা অন্যায় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



