দুই কিডনি ছিল অকেজো, মায়ের স্বপ্ন পূরণে মৃত্যুকে হারিয়ে জজ হলেন তাইজুল

মা হাওয়া বেগমের সঙ্গে এস এম তাইজুল ইসলাম। ছবি: আগামীর সময়
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তখন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন এস এম তাইজুল ইসলাম। দুই কিডনি অকেজো হয়ে গেছে, নিয়মিত ডায়ালাইসিস চলছে। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। তবে যে পরিবারে একবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন ছিল, তাদের কাছে এত টাকা ছিল অকল্পনীয়।
তাইজুলের মনে তখন একদিকে বেঁচে থাকার আকুতি, অন্যদিকে মায়ের স্বপ্ন। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানো ছেলেটিকে নিয়ে মা হাওয়া বেগমের একটাই স্বপ্ন ছিল- ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে একদিন বিচারকের আসনে বসাবেন।
মৃত্যুর সঙ্গে সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হন তাইজুল। বন্ধু, সহপাঠী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা এবং মায়ের অক্লান্ত চেষ্টায় ২০১৭ সালে ভারতে তার কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। এরপর দীর্ঘ প্রস্তুতি।
এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে চূড়ান্তভাবে সিভিল জজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন এস এম তাইজুল ইসলাম।
একসময় যে ছেলের বেঁচে থাকা নিয়েই ছিল শঙ্কা, সেই ছেলেই এখন বিচারকের আসনে বসার অপেক্ষায়। তার এই পথচলায় রয়েছে পিতৃহীন শৈশব, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, মায়ের দীর্ঘ ত্যাগ, মরণব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ এবং মানুষের সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ানোর এক গল্প।
ছোট্ট তাইজুলকে নিয়ে মায়ের লড়াই
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের তোতা মিয়া সরকারের সন্তান তাইজুল ইসলাম। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব এসে পড়ে মা হাওয়া বেগমের ওপর।
সংসারে তখন অভাব নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হাওয়া বেগমকে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। কখনো মাঠে কাজ করেছেন, কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা নিয়েছেন নিজের ভাইদের কাছ থেকেও।
হাওয়া বেগম বললেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কখনো এমনও হয়েছে, ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারিনি। আমার ভাইয়েরা তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কাজ করেছি, পরিশ্রম করেছি। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল- আমার ছেলে একদিন জজ হবে।’
৩১ বছর ধরে সন্তানদের জন্য একাই সংগ্রাম করেছেন হাওয়া বেগম। ছেলের সাফল্যের দিনে সেই দীর্ঘ সংগ্রামের কথাই বারবার মনে পড়ছে তার।
অভাবের সংসারেও মেধার পরিচয়
অভাবের মধ্যেও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জন করেন। ওই মাদ্রাসার ইতিহাসে তিনিই প্রথম সব বিষয়ে ‘এ’ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থী।
এরপর ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। মানবিক বিভাগ থেকে ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও ‘এ’ প্লাস অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন।
ততদিনে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্বপ্নের পথেই হঠাৎ নেমে আসে অন্ধকার।
দুই কিডনি অকেজো
২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথা। ২০১৫ সালে ধরা পড়ে কিডনির সমস্যা। একপর্যায়ে চিকিৎসকরা জানান, তার দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে।
শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়। একসময় চিকিৎসকরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। তখন প্রয়োজন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা।
তাইজুল বললেন, ‘আমার দুটি কিডনি যখন ড্যামেজ হয়ে গেল, তখন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় ৩০ লাখ টাকা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলো। তখন মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না, মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারব না।’
একদিকে জীবন বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে বহু বছরের স্বপ্ন। থমকে যায় পড়াশোনা, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ভবিষ্যৎ।
অসুস্থ তাইজুলের পাশে দাঁড়ায় মানুষ
তাইজুলের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন।
ছেলের চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে হাওয়া বেগম নিজের জমিজমা ও যা কিছু ছিল, তা বিক্রির চেষ্টা করেন। তাতেও প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসার অর্থ জোগাড় হয়।
২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে তাইজুলের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
তাইজুলের মা হাওয়া বেগম স্মৃতিচারণা করেন, ‘আমার ছেলে এমন রোগে পড়েছিল যে মনে হয়েছিল, তাকে আর বাঁচাতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আর মানুষের সহযোগিতায় সে ফিরে এসেছে। আমার ছেলে আজ জজ হয়েছে। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’
‘আমি যদি মারা যাই, তাহলে কীভাবে জজ হব?’
অসুস্থতার দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো আবেগাপ্লুত হন তাইজুল। তিনি আবেগ প্রকাশ করলেন, ‘একদিকে আমার জীবন, অন্যদিকে আমার ক্যারিয়ার- সবকিছু শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, আমি যদি মারা যাই, তাহলে কীভাবে জজ হব? এই চিন্তা আমাকে আরও ভেঙে দিত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।’
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
তাইজুল বললেন, ‘আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছি। আমার মা চেয়েছিলেন আমি জজ হই। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন- অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তারা যদি সেদিন পাশে না দাঁড়াতেন, হয়তো আমি আজ এখানে থাকতাম না। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে আছি এবং আজ জজ হতে পেরেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।’
জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ১২০তম হয়ে স্বপ্নপূরণ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসে সেই দিন। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন এস এম তাইজুল ইসলাম।
যে মা একসময় ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে সহযোগিতা চেয়েছেন, সেই মায়ের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু।
তাইজুলের ভাই নাজমুল ও বোন খুরশিদা বললেন, ‘আমরা কখনো ভাবিনি ভাই আবার সুস্থ হয়ে সংসারের হাল ধরবে। এমন রোগ হয়েছিল যে সবাই ভেবেছিল, সে হয়তো আর বাঁচবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমত আর মানুষের সহযোগিতায় ভাই বেঁচে ফিরেছে। আজ সে জজ হয়েছে, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের।’
‘যে ছেলেটি আর বাঁচবে না ভেবেছিলাম’
তাইজুলের সাফল্যে আনন্দিত তার এলাকার মানুষও। একসময় যে ছেলেটির বেঁচে থাকা নিয়েই শঙ্কা ছিল, সেই ছেলেই এখন এলাকার গর্ব বলে মনে করছেন তারা।
এলাকাবাসী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম তাইজুল আর বাঁচবে না। কিন্তু মানুষের সহযোগিতায় সে চিকিৎসা পেয়েছে, সুস্থ হয়েছে। আজ সে জজ হয়েছে। এটা শুধু তার পরিবারের নয়, আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের বিষয়।’
হাসপাতালের বিছানা থেকে বিচারকের আসনে
পূর্ব আলীপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান সরদার বললেন, তাইজুলের গল্প কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের দীর্ঘ ত্যাগ, একজন সন্তানের লড়াই এবং বিপদের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।
পিতৃহীন শৈশব থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। এরপর দুই কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। নিয়মিত ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন, দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে আবার পড়াশোনায় ফেরা। প্রতিটি ধাপেই ছিল নতুন পরীক্ষা।
তিনি বললেন, একসময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাইজুলের একমাত্র আকুতি ছিল- ‘আমি বাঁচতে চাই।’ সেই বেঁচে থাকার লড়াই তাকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে বিচারকের আসনের দোরগোড়ায়।
আর এই পথ জুড়ে ছিলেন একজন মা- যিনি অভাবের সংসারে তিন সন্তানকে আগলে রেখেছেন, ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে হাত পেতেছেন, আর ৩১ বছর ধরে বুকের ভেতর লালন করেছেন একটি স্বপ্ন। ছেলের সাফল্যের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নই পূর্ণতা পেল বলে মনে করছেন তাইজুলের এলাকাবাসী।






