ঘোষণার ২৯ বছর পরও হয়নি বানিয়াচং পর্যটন কেন্দ্র

আবু ইউছুফ খাঁন ওয়াক্ফ এষ্টেট। ছবি: আগামীর সময়
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় একটি জনপদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এ এলাকা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রাম হিসেবে পরিচিত বানিয়াচংকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। তবে ২৯ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি সেই ঘোষণা।
স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে পর্যটনকেন্দ্র, আঞ্চলিক জাদুঘর ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি অধিকাংশই। এতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন।
৪৯৭ বর্গমাইল আয়তনের বানিয়াচং উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন। উপজেলা সদরটি প্রায় সাড়ে ৩ মাইল দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের। প্রচলিতভাবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রাম হিসেবে পরিচিত। বানিয়াচং উত্তর-পূর্ব, বানিয়াচং উত্তর-পশ্চিম, বানিয়াচং দক্ষিণ-পূর্ব ও বানিয়াচং দক্ষিণ-পশ্চিম, এই চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল এই গ্রাম।
ভূগোলের প্রচলিত সংজ্ঞায় কয়েকটি পাড়া বা মহল্লা নিয়ে একটি গ্রাম এবং কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠিত হয়। কিন্তু বানিয়াচংয়ের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে চারটি ইউনিয়ন নিয়েই একটি গ্রাম। প্রাচীনকালে বানিয়াচং ছিল একটি স্বাধীন রাজ্যের রাজধানী। রাজা কেশব মিশ্রকে এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বানিয়াচংয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে মুঘল আমলে নির্মিত প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ফার্সি শিলালিপিযুক্ত কালিকাপাড়া জামে মসজিদ, বিবির দরগাহ জামে মসজিদ ও পুরানবাগ জামে মসজিদ উল্লেখযোগ্য। রয়েছে রাজা কেশব মিশ্রের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, বার ভূঁইয়া খ্যাত যোদ্ধা আনোয়ার খাঁর বাড়ির পাথরের খুঁটি, দেওয়ান আলী রাজার প্রাচীন রাজবাড়ি, শ্যাম-বাউল আখড়া ও কালীবাড়ী।
এ ছাড়া বাইসাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বাড়ি, ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের বিপ্লবী হেমসেন ও সুশীল সেনের বাড়ি এবং কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর পূর্বসূরিদের জমিদার বাড়িসহ রয়েছে অসংখ্য পুরোনো স্থাপনা।
১৯৯৭ সালের ১৯ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বানিয়াচংয়ের সাগরদিঘীর পশ্চিম পাড়ে এক জনসভায় এখানে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৯ সালের ৭ মে কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর মৃত্যুর পর তৎকালীন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ তার পূর্বসূরিদের পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি সেখানে সুবীর নন্দী গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি। নন্দীপাড়ায় এসিল্যান্ড কার্যালয়ের পাশে বাড়িটি এখনো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
উপজেলা সদরের চাঁনপাড়া গ্রামে অবস্থিত ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের বাড়িটিও সংরক্ষণের বাইরে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল ওয়াহেদ মিয়া বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন। তার দাবি, ক্রয়সূত্রে তিনি বাড়িটির মালিক। স্থানীয়দের অভিযোগ, রামনাথ বিশ্বাসের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে ছবি বা ভিডিও করতে গেলে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বাধা দেন।
২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর রাজীব নূরসহ কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে ছবি তুলতে ও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ আছে। ওই ঘটনার পর এলাকায় আন্দোলন গড়ে ওঠে। বানিয়াচংয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণের দাবিও জোরালো হয়।
তখন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রামনাথ বিশ্বাসের বাড়িতে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল। পরে আর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন সেই সাইনবোর্ডও নেই।
রূপরাজখাঁর পাড়ায় অবস্থিত বিপ্লবী হেমসেন ও সুশীল সেনের বাড়িটিও পরিত্যক্ত। স্থানীয় মধু মিয়া বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন। তার দাবি, ক্রয়সূত্রে তিনি এর মালিক।
বানিয়াচং গ্রামের চারদিকে বৃত্তাকারে ঘিরে আছে ‘গড়ের খাল’। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে রাজধানী বানিয়াচংকে সুরক্ষিত রাখতে প্রতিরক্ষা পরিখা হিসেবে খালটি খনন করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে প্রায় ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে খালটি পুনঃখনন করা হয়। তবে অভিযোগ, পুনঃখননের কাজ সঠিকভাবে হয়নি এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থও হয়েছে নয়ছয়।
গড়ের খালের বাইরে হাওরের মধ্যে বানিয়াচং উত্তর-পশ্চিম ইউনিয়নের সইদ্দাটুলা সাত মহল্লার নিয়ন্ত্রণে আছে ‘লক্ষী বাঁওড়’ নামে একটি জলাবন। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘খরতির জঙ্গল’ নামেও পরিচিত। প্রায় ৩০০ একর আয়তনের এই জলাবনের অধিকাংশ জমির মালিক সরকার। কিছু অংশ ‘আবু ইউসুফ খান ওয়াকফ এস্টেটের’ হওয়ায় পুরো বনটি সইদ্দাটুলা গ্রাম্য পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণে আছে।
স্থানীয় কয়েকজন জানালেন, জলাবনের শুকনো কাঠ ও মাছ বিক্রি করে গ্রাম্য পঞ্চায়েত প্রতিবছর প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা আয় করে। এ অর্থ পঞ্চায়েতের বিভিন্ন কাজে ব্যয় এবং এলাকাবাসীর মধ্যে বণ্টন করা হয়। পর্যটকদের কাছেও জলাবনটি আকর্ষণীয়। ২০২৩ সালে এর কাছেই পর্যটন করপোরেশন প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই কক্ষের একটি রেস্টহাউস নির্মাণ করেছে।
বানিয়াচং সদর একসময় শহর ছিল, এমন উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও সাহিত্যে। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মৈমনসিংহ গীতিকায় ‘বাইন্যাচঙ্গ শহর’ হিসেবে বানিয়াচংয়ের উল্লেখ রয়েছে। ‘আইন-ই-আকবরী’ ও ‘বাহার-ই স্থান গায়েবী’ গ্রন্থেও বানিয়াচং রাজ্যের বিস্তৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ ও সিলেটের অনেক এলাকা থেকে বুড়িগঙ্গার তীর পর্যন্ত এই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে এসব গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
বানিয়াচংয়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ৬৬ একর আয়তনের বিশাল জলাধার সাগরদিঘী। এটি ‘পদ্মাবতীর দিঘী’, ‘কমলাবতীর দিঘী’ ও ‘কমলা রাণীর দিঘী’ নামেও পরিচিত। দিঘীটিকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে দুটি লোককাহিনী প্রচলিত রয়েছে।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এই দিঘীর পাড়ে বসে তার বিখ্যাত ‘কমলা রাণীর দিঘী’ কবিতা লিখেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে। কবিতাটি তার ‘সূচয়নী’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
লোককাহিনি অনুযায়ী, রাজা পদ্মনাভের আমলে রাজ্যে পানির সংকট দেখা দিলে প্রজাদের জন্য দিঘীটি খনন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন খননের পরও সেখানে পানি ওঠেনি। পরে স্বপ্নে রাজাকে বলা হয়, তার স্ত্রী কমলা রাণীকে দিঘীতে বিসর্জন দিলে সেখানে পানি উঠবে। প্রজাদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে রাণী আত্মবিসর্জনে রাজি হন। এরপর দিঘীতে পানি ওঠে বলে লোককাহিনিতে বলা হয়েছে।
এই কাহিনি নিয়ে হবিগঞ্জের নাট্যকার রুমা মোদক ‘কমলাবতীর দিঘী’ নামে একটি নাটক রচনা করেন। হবিগঞ্জের নাট্য সংগঠন ‘জীবন সংকেত’ নাটকটি দেশ-বিদেশে মঞ্চস্থ করেছে।
সাগরদিঘীকে ঘিরে ‘হব্যা’ ও ‘গোমা’ নামে দুই পালোয়ানের আরেকটি জনশ্রুতিও রয়েছে। তারা দিঘীর দুই পাড় থেকে পাথরের তৈরি দাড়াগুটি দিয়ে খেলতেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে। অনেকের মতে, হব্যা ও গোমা একই ব্যক্তি। তবে এসব তথ্যের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত নয়।
দিঘীর সৌন্দর্য বাড়াতে অতীতে পুনঃখনন করা হয়েছিল। এর ফলে দিঘীর পরিবেশেরও উন্নতি হয়। বর্তমানে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এটি দেখতে আসেন। তবে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
১৯৯৯ সালে জাতীয় জাদুঘরের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. শামছুজ্জামান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন, ভাষাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজীব হুমায়ুন এবং লেখক ড. সৈকত আসগর বানিয়াচং সফর করেন। তারা প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ এবং এলাকায় একটি আঞ্চলিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পর্যটন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তে পারে বলে মত দেন।
তবে এখনো বানিয়াচংয়ে কোনো আঞ্চলিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মুরাদপুর ইউনিয়নের বিথঙ্গল আখড়া ছাড়া বানিয়াচংয়ের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে এরই মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিতে।
২০২৪ সালে হবিগঞ্জ-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েল বানিয়াচংয়ের পর্যটনকেন্দ্র বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। সাগরদিঘীর চারপাশের বসতি উচ্ছেদ না করে ভেতরের দিকে ওয়াকওয়ে ও একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও এসিল্যান্ড মেহরাব হোসাইন আক্ষেপ করে বললেন, ‘সেই ১৯৯৭ সাল থেকে বলা শুরু, কিন্তু করা হয়নি শেষ! বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশনা দিলে দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করব।’
হবিগঞ্জ-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবনও বানিয়াচংয়ের পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার।







