বানিয়াচংয়ে এখনো টিকে আছে বিলুপ্তপ্রায় করাতি পেশা

ছবি: আগামীর সময়
একসময় হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার যেকোনো পাড়া-মহল্লায় গেলেই হাত করাত দিয়ে গাছ চিড়ার দৃশ্য চোখে পড়ত। করাতিদের সুর মিলিয়ে করাত টানার সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর প্রায় দেখাই যায় না।
গাছগাছালিতে সমৃদ্ধ বানিয়াচংয়ে একসময় করাতি পেশায় অসংখ্য মানুষ নিয়োজিত ছিলেন। তারা শুধু নিজ এলাকায় নয়, আশপাশের এলাকাতেও গিয়ে গাছ চিড়ার কাজ করতেন। তখন তাদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে কাঠ চিড়ার কাজে যান্ত্রিক করাতের ব্যবহার বাড়তে থাকায় জীবিকার তাগিদে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। ফলে বর্তমানে হাত করাত দিয়ে গাছ চিড়ার ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত।
সম্প্রতি সেই বিরল দৃশ্য দেখা গেল বানিয়াচং বিএডিসি অফিসের দক্ষিণ পাশের পুকুরের পূর্ব পাড়ে, ১ নম্বর বানিয়াচং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান খানের পৈতৃক নয়াবাড়িতে। সেখানে তিনজন করাতি মিলে একটি বড় কড়ই গাছ চিড়ছিলেন। একজন গাছের ওপর দাঁড়িয়ে করাত ওপরে টেনে তুলছেন, আর নিচে থাকা দুজন করাত নিচের দিকে টানছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে গাছটি চিড়ে কাঠ তৈরি করা হচ্ছিল।
করাতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় বানিয়াচংয়ের মতো সারা দেশের গ্রামাঞ্চলেই করাতি সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করতেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে গাছ কাটা ও চিড়াই ছিল তাদের পৈতৃক পেশা। কোনো গৃহস্থের গাছ কাটার প্রয়োজন হলে করাতিদের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অধিক আয়ের আশায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। ফলে করাতি পেশা এখন বিলুপ্তির পথে। তবে জীবিকার প্রয়োজনে দেশের কয়েকটি এলাকায় এখনো কিছু মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রেখেছেন।
নব্বইয়ের দশকের আগেও করাতিদের গাছ চিড়ার দৃশ্য দেখতে পাড়ার ছেলেরা ভিড় জমাত। করাত টানার সময় তারা ছন্দ মিলিয়ে গান গাইতেন, আর আশপাশের মানুষও আগ্রহ নিয়ে তা উপভোগ করতেন। করাতিরা ভোরে গুড়-পান্তা খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন। সাধারণত একটি দলে তিনজন গাছ চিড়ার কাজে ব্যস্ত থাকলেও আরেকজন রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবেই পুরো শুষ্ক মৌসুমজুড়ে তাদের কর্মব্যস্ততা চলত।
জানা যায়, সে সময় মাটিতে গর্ত করে অথবা কাঠের বিশেষ কাঠামো তৈরি করে গাছ চিড়ানো হতো। এ ধরনের করাত চালাতে ওপরে ও নিচে অন্তত দুজনের প্রয়োজন হতো। হাতলযুক্ত বড় করাত দিয়ে টেনে টেনে একটি গাছ থেকে বিভিন্ন মাপের বিম ও তক্তা তৈরি করা হতো। এসব কাঠ দিয়ে ঘরের ছাউনি, দরজা-জানালা এবং বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরি করা হতো।
তখন কাঠ চিড়ার মজুরি নির্ধারণ করা হতো বর্গফুট হিসেবে। একটি মাঝারি আকারের গাছ কাটা ও চিড়াতে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ হতো এবং কাজ শেষ করতে তিন দিনেরও বেশি সময় লাগত।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন হাট-বাজারের করাতকলে অল্প সময় ও কম খরচে প্রয়োজন অনুযায়ী কাঠ চিড়িয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি কাঠের আসবাবপত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় যান্ত্রিক করাতকলের গুরুত্বও বেড়েছে।
তবে বানিয়াচংয়ে এখনো হাতে গোনা কয়েকজন করাতি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাদের দলনেতা রূপরাজখারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা অনীল দাস, যিনি রমাকান্ত দাস নামেও পরিচিত।
তিনি বলেছেন, ‘আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের এই পেশা প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। এখন খুব কমই কাজ পাই। তবে বড় গাছ মেশিনে তোলা কঠিন হলে তখন আমাদের ডাকা হয়। আমরা সেগুলো ছোট ছোট অংশে কেটে দিই।’




