ঋণের বোঝা সামলাতে মার্কিন দরজায় বাংলাদেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকার পরিচালন ও উন্নয়নে কত টাকা ধার করা হবে, কখন এবং কোথা থেকে তা আসবে— এ প্রশ্নের সঙ্গে এবার যোগ হচ্ছে আরও কয়েকটি মৌলিক চিন্তা। সেগুলো হচ্ছে— সেই ঋণ অর্থনীতিকে কতটা ঝঁুকিতে ফেলতে পারে, পরিশোধ ব্যয়ের চাপ, নগদ টাকার প্রবাহ (রাজস্ব) ও সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ পদ্ধতির আধুনিকায়ন। এসব সংস্কার না হলে ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে দেশ— এমন শঙ্কা নীতিনির্ধারকদের। তাদের ভাষ্য, এ মুহূর্তে সরকারের ঘাড়ে ঝুলছে ২২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। আগামীতে এর আকার আরও বাড়বে। বিশাল অঙ্কের এই ঋণের লাগাম টানতে সরকার পূর্ণাঙ্গ সহায়তা চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) কাছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা ও ওয়াশিংটন এ বিষয়ে একাধিক চিঠি চালাচালি করেছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই অর্থ সচিবকে এ-সংক্রান্ত প্রজেক্টে নোটিফিকেশন লেটার (প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনপত্র) দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি কারিগরি সহায়তা অফিস (ওটিএ)। ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ঋণব্যবস্থাপনা উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র যে কারিগরি সহায়তা দেবে, সে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে অনুমোদন হয়েছে।
ওই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঋণব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কয়েকটি খাতে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনা, অভ্যন্তরীণ ঋণ বাজার উন্নয়ন, সরকারি বন্ড, শেয়ার ইস্যু, মুদ্রা ও সরকারি সিকিউরিটিজ ইস্যু। পাশাপাশি আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সংস্কার, সাংগঠনিক কাঠামো উন্নয়ন, স্বতন্ত্র ঋণব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারের নগদ অর্থের আগমন ও বহির্গমনের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়া হবে।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো কার্যপরিধি (টিওআর) চূড়ান্ত করে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষর করা। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে টিওআরের খসড়া পাঠাবে। সেটি পাওয়ার পর সরকারের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রয়োজনীয় মতামত নিয়ে দ্রুত স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা হবে— যোগ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সম্মতিপত্রের জবাব দিতে সম্প্রতি অর্থ সচিব একটি সারসংক্ষেপ অনুমোদনের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে উপস্থাপন করেন। সেখানে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে যে টিওআর স্বাক্ষরিত হবে, সেখানে মন্ত্রী পর্যায়ে স্বাক্ষরের বিষয়টি মৌখিকভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের টিম। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে চিঠি পাঠানো হবে, সেখানে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং ঋণব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে সরকারি ঋণব্যবস্থাপনা জোরদারের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, সেটি চলমান রাখা যেতে পারে বলে সুপারিশ করেছেন অর্থ সচিব। সার্বিক পর্যালোচনার পর সারসংক্ষেপ অনুমোদন করেন অর্থমন্ত্রী।
জানা গেছে, ওই উদ্যোগের সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি। তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের কাছে সরকারি ঋণব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে কারিগরি সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। সেখানে নগদ অর্থ প্রবাহের আগাম আভাস, সরকারি আয়-ব্যয় হিসাব সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঋণব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আধুনিকায়ন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নসহ পাঁচটি ক্ষেত্রে মার্কিন ট্রেজারির সহায়তা চাওয়া হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সহকারী মন্ত্রী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠক হয়। এ ছাড়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সাইডলাইন বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভার্চুয়াল মূল্যায়ন পরিচালনা করে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ অর্থ উপদেষ্টার কাছে একটি প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন পাঠানো হয়। এতে অর্থ বিভাগের ট্রেজাির ও ডেবট ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের (টিডিএমডব্লিউ) সঙ্গে সরকারি ঋণব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের ডিজাইন পর্যায় শুরু করার সম্মতি জানানো হয়। এরপর চলতি বছরের জুনে ট্রেজারি বিভাগের একটি ফিল্ড মিশন বাংলাদেশে আসে। তারা অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, সঞ্চয় অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেন। এই মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নের পরই পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প অনুমোদনের দিকে যায় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
জানতে চাইলে গত সোমবার ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, সরকারি ঋণব্যবস্থাপনায় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের কারিগরি সহায়তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলাম, বাজারব্যবস্থাপনা ও সরকারি সিকিউরিটিজের লেনদেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করেছে। এখন সরকারি ঋণব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আরও বেশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অধীনে আসছে। ফলে নতুন কাঠামোকে দক্ষ ও কার্যকর করতে কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, মার্কিন ট্রেজারির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঋণের স্থায়িত্ব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণের উৎস ও মেয়াদ নির্ধারণ, ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সিকিউরিটিজ ইস্যু অত্যাধুনিক করা সম্ভব। এতে ঋণের উৎসও বৈচিত্র্যময় হবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় আরও স্পষ্ট হবে। ফলে সরকারি ঋণের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি অর্থসংস্থানের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বাজারের আস্থা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ঋণব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে— মন্তব্য করেন ড. সালেহউদ্দিন।
সরকারের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ বেড়ে ২২.৫৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের ঋণের অঙ্ক ৮.৮২ লাখ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্রসহ নন-ব্যাংক খাতের ঋণ ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি এবং বিদেশি ঋণ ৯.৬৪ লাখ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করে চলছে। বিশেষ করে ট্রেজারি বিল-বন্ড, ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র খাত থেকে এ ঋণ নিচ্ছে। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করে। মার্কিন ট্রেজারির কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে বিভিন্ন উৎসের ঋণের খরচ, মেয়াদ, সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রা ও পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত ঋণকৌশল তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া মার্কিন সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নগদ অর্থের আগমন ও বহির্গমনের পূর্বাভাস। অর্থাৎ সরকারের কখন কত টাকা প্রয়োজন হবে, কখন রাজস্ব আসবে, কোন অর্থবছরে কত টাকার ঋণ পরিশোধ করতে হবে— এসবের সঠিক পূর্বাভাস থাকলে আকস্মিক অর্থসংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে। আগাম পূর্বাভাস থাকলে কয়েক মাস আগে থেকেই অর্থের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। এতে হঠাৎ বাজার থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার চাপ কমবে এবং তুলনামূলক কম খরচে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ঋণে ঝুঁকি বিশ্লেষণে সহায়তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন, মেয়াদ পুনর্বিন্যাস এবং সুদ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোকে আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এর প্রভাব শুধু সরকারি ঋণব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে সরকারের অর্থায়নের ব্যয় হ্রাস, ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো যাবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঋণবাজার শক্তিশালী হলে সরকারের অর্থায়নের বিকল্প বাড়বে। ফলে কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।




