চায়ে চুমুকের সুখ নেই শ্রমিকের মনে
১৮৭ টাকার মজুরিতে চলে না সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙে জরিনা বেগমের। কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে কাক ডাকা ভোরেই চা বাগানের পথে হাঁটা শুরু করেন। সারা দিন চা পাতা তোলেন। কাজ শেষে ঘরে ফেরেন ক্লান্ত শরীরে। দিন শেষে তার হাতে আসে প্রায় ১৮৭ টাকা। এই টাকা দিয়েই খাবার, পোশাক, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা— সবকিছুর হিসাব মেলাতে হয়। এভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন দেশের হাজারো চা শ্রমিক। সপ্তাহে এক দিন ছুটি এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোর জন্য মাসে সব দিন কাজের সুযোগ থাকে না। এই আয়েই চলে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় সদস্যের একটি পরিবারের জীবন।
শ্রমিকদের হিসাবে, মাসে একজন শ্রমিকের নগদ মজুরি প্রায় ৫ হাজার ৬১০ টাকা। এর বাইরে সপ্তাহে রেশন হিসেবে পান ২ কেজি আটা। কিন্তু সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে হয় নিজেদের উদ্যোগে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে এই আয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ন্যূনতম ৫০০ টাকা করার দাবি তুলেছেন চা শ্রমিকরা। একই সঙ্গে ২০২৩ সালে জারি হওয়া মূল মজুরির ওপর প্রতি বছর ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল, চা জনগোষ্ঠীর ভূমির মালিকানা নিশ্চিত এবং দ্রুত চা শ্রমিক ইউনিয়নের সিবিএ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা। এসব দাবিতে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ, কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ করেছেন শ্রমিকরা। চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা প্রণব জ্যোতি পাল বলেছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের এই চার দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে চা শ্রমিকরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।
হৃদয় লোহার ও হৃদেশ মোধিসহ অনেক শ্রমিকের দাবি, বর্তমান মজুরি দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোও কঠিন।
চা শ্রমিকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি, প্রতি বছর মূল মজুরির ওপর ৫ শতাংশ করে মজুরি বৃদ্ধির কাঠামো বাতিল করা। তাদের বক্তব্য, মূল মজুরি কম থাকায় এর ওপর ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেও হাতে আসা অতিরিক্ত অর্থ খুব বেশি হয় না। অথচ খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে নিয়মিত।
চা শ্রমিকদের সংকটে জড়িয়ে আছে ভূমির অধিকারও। চা বাগানগুলো সরকারি খাসজমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানে বসবাসকারী শ্রমিকদের বসতভিটার স্থায়ী বন্দোবস্ত বর্তমানে নেই। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি বাগানে বসবাস ও কাজ করেও নিজেদের বসতভিটার জমির স্থায়ী মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
চা শ্রমিক ফেডারেশন, সিলেট জেলা শাখার আহ্বায়ক হৃদয় লোহার বললেন, যে ঘরে তারা বছরের পর বছর বসবাস করছেন, সেই বসতভিটার স্থায়ী নিরাপত্তা না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে চা শ্রমিক ইউনিয়নের সিবিএ নির্বাচন। সর্বশেষ সিবিএ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ২৪ জুন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও এরপর আর নির্বাচন হয়নি।
চা শ্রমিক অধিকার আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হৃদেশ মোধি বললেন, ‘সিবিএ নির্বাচন শুধু একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি শ্রমিকদের হয়ে কথা বলার নেতৃত্ব কতটা বৈধ, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হবে— তারও প্রশ্ন। এখন শ্রমিকদের অপেক্ষা-আলোচনা কত দ্রুত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়, আর সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়িত হয়।’
সরকারের সামনে এখন একদিকে চা শিল্পের উৎপাদন ও বিনিয়োগের স্বার্থ, অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা— দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ।
লাক্কাতুড়া চা বাগানের রেবেকা বেগম রুবি, লিটন, সঞ্জয় নাথসহ একাধিক চা শ্রমিকের দাবি, তাদের মজুরি নির্ধারণের সময় শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বা শতাংশের হিসাব নয়, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হোক।




