লোহিতসাগরের নিরাপত্তা জোট বাস্তবসম্মত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বে লোহিতসাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা রক্ষায় গঠিত ১৪ দেশের একটি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা (মেরিটাইম) জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে, ঠিক তখন বাংলাদেশের মতো একটি দেশের এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণের উদ্রেক স্বাভাবিক। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন— এটি কি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বহুল চর্চিত নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত? নাকি এর পেছনে কাজ করছে শুধুই উদীয়মান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা?
প্রথমেই আমাদের এ জোটের গঠনগত প্রকৃতি ও বাংলাদেশের যোগদানের মূল প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। অনেকের মনেই একটি প্রাথমিক সংশয় তৈরি হতে পারে যে, এটি হয়তো ন্যাটোর মতো কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অক্ষ। যেমনটা সম্প্রতি আমরা দেখতে পেয়েছি— সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু কৌশলগত জায়গা থেকে সে ধরনের সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে
লোহিতসাগরের এই বাণিজ্যিক নৌপথ সুরক্ষা জোটকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও এডেন উপসাগরের রুটগুলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ রুট দিয়েই প্রধানত ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ মূল রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ইদানীংকালে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা যাতায়াত বিঘ্নিত হওয়ার যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ ও অস্তিত্ব সরাসরি যুক্ত।
বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এ অঞ্চলে নির্দিষ্ট কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কাঠামোর বাইরে থেকে বাংলাদেশ যদি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে, তবে পরে
লোহিতসাগরে বাংলাদেশি পতাকাবাহী কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হলে সেই সংকটে তার সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে? এ বাস্তবসম্মত ও প্রত্যক্ষ ঝুঁকি বিবেচনা করেই মূলত বাংলাদেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয়। উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আঞ্চলিক কিংবা আদর্শিক যুদ্ধে কোনো পক্ষের হয়ে লড়াই করা নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ধমনি বা বাণিজ্যিক রুটগুলোর নিরবচ্ছিন্ন চলাচল সচল রাখা।
প্রশ্ন ওঠে যে, সৌদি আরব যখন ৫০টির বেশি দেশকে এই মেরিটাইম জোটে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিল, তখন বেশিরভাগ দেশই কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেছে। সে জায়গায় বাংলাদেশ কেন এত দ্রুত এতে সায় দিল?
তবে এ সিদ্ধান্তের পর স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত দিক থেকে ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশের নিজস্ব ঝুঁকির প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। কৌশলগত ও কূটনৈতিকভাবে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈরিতা ঐতিহাসিকভাবেই ছিল না এবং এখনো নেই। অতীতে বহু জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিংবা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ-সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা বা আটকা পড়ার ঘটনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার নিজস্ব অবস্থান ও সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছে। বাংলাদেশ ও ইরানের কূটনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের গভীরতা এতখানি ভঙ্গুর নয় যে, শুধু বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষামূলক কোনো সমন্বিত জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হলেই ইরান তাকে সরাসরি নিজেদের বিরুদ্ধে একটি সরাসরি সামরিক আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করবে।
ইরান সরকার ও তার নীতিনির্ধারকরাও খুব ভালোভাবে বোঝেন, লোহিতসাগরে বাংলাদেশের এ উপস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার স্বার্থে। সেখানে ইরানের ভূখণ্ডে বা তার সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার মতো কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বা অস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশের নেই। তদুপরি, ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা, সংঘাত এড়ানো ও শান্তির পক্ষে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে, সৌদি আরব যখন ৫০টির বেশি দেশকে এই মেরিটাইম জোটে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিল, তখন বেশিরভাগ দেশই কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেছে। সে জায়গায় বাংলাদেশ কেন এত দ্রুত এতে সায় দিল এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোনো সামরিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে কি না?
ঝুঁকি একেবারে শূন্য, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। যেকোনো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জোটের সঙ্গেই নানা ধরনের ঝুঁকি যুক্ত থাকে। তবে এক্ষেত্রে ঝুঁকিটি মূলত দুই তরফা। প্রথমত, যদি বাংলাদেশ এই জোটে না যোগ দিত এবং পরে লোহিতসাগরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হতো বা জাহাজ আক্রান্ত হতো, তবে দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হতো, তার মাত্রা হতো অপরিসীম। অন্যদিকে, জোটে যোগ দেওয়ার পর মূল সতর্কতাটি হতে হবে নীতিগত ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ যেন এ বাণিজ্যের সুরক্ষা দিতে গিয়ে আঞ্চলিক কোনো বড় সংঘাত বা প্রত্যক্ষ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সামরিকভাবে জড়িয়ে না পড়ে। এটি একটি ‘ডিটারেন্স’ বা আক্রমণ প্রতিরোধমূলক মেকানিজম হিসেবে কাজ করা পর্যন্ত ঠিক আছে; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশ যেন সেখানে সামরিক ফ্রন্টে ব্যবহৃত না হয়— আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সেদিকে অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
অনেকে মনে করেন, জাতিসংঘের সরাসরি কোনো রেজল্যুশন বা ম্যান্ডেট ছাড়া এ ধরনের বহুজাতিক জোটে যুক্ত হওয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী ভাবমূর্তি ও নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। তবে বর্তমান আধুনিক বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, জাতিসংঘের একক ভূমিকা বা বৈশ্বিক শাসন কাঠামো বহুক্ষেত্রে স্থবিরতার সম্মুখীন। ফলে বর্তমান যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের নিজেদের সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং কৌশলগত প্রয়োজনে ‘কেস-বাই-কেস’ (Case-by-case) বা বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জোটে যুক্ত হচ্ছে। শান্তিরক্ষা বা আন্তর্জাতিক নীতিমালায় দীর্ঘদিনের চর্চায় বাংলাদেশ যে অনন্য বৈশ্বিক ভাবমূর্তি অর্জন করেছে, শুধু নৌ বাণিজ্যের সুরক্ষায় গঠিত এ জোটের কারণে তা সহজে বিনষ্ট হওয়ার সুযোগ কম।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত লোহিতসাগরের এই মেরিটাইম জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে কোনো বিশেষ ভূরাজনৈতিক অক্ষশক্তির দিকে চূড়ান্তভাবে হেলে পড়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত কৌশলগত প্রয়াস হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত। তবে এ ধরনের স্পর্শকাতর পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো চরম কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও নজরদারি। বাংলাদেশ একদিকে যেন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে তার অর্থনৈতিক ও বিশাল শ্রমবাজারের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে পারে, অন্যদিকে ইরান বা অন্য কোনো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে কোনো প্রকার দূরত্ব তৈরি না করে— পররাষ্ট্রনীতিতে এ সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ





