সেতু-কালভার্টে আটকে ভৈরবের দম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় যে ভৈরব নদে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে চলত নৌকা, সেই নদই এখন অনেকটা স্থির জলাশয়। কোথাও কচুরিপানার দখল, কোথাও বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও আবার পানি থেকে বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। নদ পুনরুজ্জীবিত করতে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬ কিলোমিটারের মধ্যে ৯২ কিলোমিটার পুনঃখনন ও ৪ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়েছিল। কিন্তু খনন শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ফেরেনি জোয়ার-ভাটা, স্বাভাবিক হয়নি নৌ চলাচল। নদটির ওপর নির্মিত ৫৪টি অপরিকল্পিত সেতু-কালভার্ট পানিপ্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় দ্রুত পলি জমছে, সঙ্গে অব্যাহত আছে দখল ও দূষণ। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে খনন করা ভৈরবের প্রাণ ফিরছে না; বরং সেতু-কালভার্টের নিচেই আটকে পড়েছে এর স্রোত।
নদটি কেন এমন অবস্থায় পড়ল, এর একটি বড় কারণ খুঁজে পাওয়া যায় খনন প্রকল্পের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। পরে চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়ায় ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় চৌগাছার তাহেরপুর থেকে অভয়নগরের আফরাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার অংশের মধ্যে ৯২ কিলোমিটার পুনঃখনন ও ৪ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়। শহর অংশের সৌন্দর্যবর্ধনেও ব্যয় করা হয় ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ সালের দিকে কাজ শেষ হয়।
পাউবো কর্তৃপক্ষ বলছে, নদের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ও পানিপ্রবাহে বড় বাধা ৫৪টি অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট। নদের স্বাভাবিক প্রস্থ যেখানে ১৫০-২৫০ ফুট, সেখানে এসব সেতুর দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৪ থেকে ১২০ ফুট। ফলে সেতু ও কালভার্টের নিচ দিয়ে পানিপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে। পানির গতি কমে দ্রুত পলি জমছে, ধীরে ধীরে আবারও ভরাট হয়ে পড়ছে খনন করা নদের তলদেশ।
পাউবোর হিসাবে, ৫৪টি সেতু-কালভার্টের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ২৬টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের ১৯টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের চারটি, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তিনটি, রেলওয়ের একটি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একটি রয়েছে।
শুধু পানিপ্রবাহের বাধাই নয়, নদপাড়ের দূষণও ভৈরবের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যশোর সদরের নূরপুর এলাকার নদপাড়ের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেনের দাবি, তিন-চার বছর আগে নদ খনন করা হলেও এখন জোয়ার-ভাটা হয় না, পানিও ঠিকমতো নামে না। কচুরিপানা ও ময়লায় নদ ভরে গেছে। তার এলাকায় একটি নতুন সেতু হওয়ার কথা থাকলেও সেটিও হয়নি।
নদ খননের পরও যখন পানি প্রবাহিত হচ্ছে না, তখন বিপুল অর্থ ব্যয়ে করা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও। লোন অফিসপাড়ার বাসিন্দা চুন্নু মিয়ার অভিযোগ, ব্যয় করা হয়েছে শত শত কোটি টাকা। তার মতে, নদ দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে শুধু খনন করে কোনো লাভ হবে না।
স্থানীয় মানুষের এই ক্ষোভের সঙ্গে নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীদের বক্তব্যও অনেকটা মিলে যায়। ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য তাসলিমুর রহমানের ভাষায়, ‘দীর্ঘ আন্দোলনের পর নদ খনন করা হলেও উজানের নদীর সঙ্গে এখনো করা হয়নি সংযোগ। খননের সময় চিহ্নিত ৫৪টি সংকীর্ণ সেতুও অপসারণ করা হয়নি। বরং নদী আইন অনুসরণ না করে কয়েকটি নতুন সেতু নির্মাণ হয়েছে। ফলে ফিরে আসেনি নদের স্বাভাবিক প্রবাহ।’
তবে সমস্যার বিষয়ে যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অবগত, তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্যে স্পষ্ট। যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বললেন, ‘নদটি সঠিকভাবেই খনন করা হয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্টের কারণে আবারও ভরাট হচ্ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে জোয়ার-ভাটা। নদের পানিপ্রবাহে বাধা তৈরি করছে— এমন ৫১টি সেতু-কালভার্ট চিহ্নিত করা হয়েছে।’
তিনি মনে করেন, এর মধ্যে ২৯টি অপসারণ বা পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। এসব স্থাপনা দ্রুত অপসারণ করা না হলে দড়াটানা থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত প্রায় ৫৭ কিলোমিটার নদ কার্যকারিতা হারাবে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন এ কর্মকর্তা।




