মিষ্টি পেলেন তেতো স্বাদ

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ফাইল ছবি
স্বামী কাউন্সিলর ছায়েদুর রহমান নিউটন হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর বিএনপিতে সহানুভূতি পেয়ে আসছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। দলীয় পদ-পদবির পর সংসদ সদস্য হয়ে আইনসভায়ও রেখেছিলেন পা।
কিন্তু নিজের এলাকা ঢাকার মিরপুরে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি দখলের উদ্দেশ্যে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় নাম আসার পর দলের শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষের মুখে সংসদ সদস্যপদ হারাতে হলো তাকে। তিনি যে কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন, সেই কমিটিও হয়েছে বিলুপ্ত।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রে হামলার পর থেকে নারী আসনের সংসদ সদস্য মিষ্টির নাম ছিল আলোচনায়। কারণ হামলাকারীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর যে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানার টানিয়েছিল, তাতে সম্পৃক্ত ছিলেন মিষ্টি।
সমিতিতে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করলেও হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন মিষ্টি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থেমে ছিল না, থামছিল না মিষ্টিকে নিয়ে আলোচনাও। পাঁচ দশক ধরে সেবা দিয়ে আসা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভাঙচুর নিয়ে নানা প্রতিবাদও হচ্ছিল।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ঘটনার সময় ছিলেন নিউ ইয়র্কে। দেশে ফেরার পর তিনি বিষয়টি শুনে চরম ক্ষুব্ধ হন বলে তার দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালেই খবর আসে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন সংসদ নেতা তারেক রহমান।
এমন নির্দেশনা পাওয়ার পর দুপুরে মিষ্টিকে দেখা যায় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দপ্তরে।
মিষ্টি পদত্যাগ করতেই গিয়েছিলেন, এমন খবর ছড়িয়ে পড়লেও সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসছিল না।
তবে দুপুরের পর সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনে সব জল্পনার অবসান ঘটে। স্পষ্ট হয়ে যায়, মিষ্টি আর সংসদ সদস্য নেই।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করায় জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর আসনটি (নারী আসন ২৩) শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। এই আসন সংসদের দলগুলো সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংখ্যার অনুপাতে বণ্টিত হয়।
বিএনপির মনোনয়নে এবারের ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। গত ৩ মে তারা নিয়েছিলেন শপথ। তার মধ্যে একটি আসন শূন্য হলো। এখন এখানে উপনির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।
গত মার্চ মাসে যাত্রা শুরুর পর ত্রয়োদশ সংসদে এটাই পদত্যাগের প্রথম ঘটনা। আর একটি ভিন্ন ঘটনা রয়েছে। তা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী থেকে জি এম নজরুল ইসলামের বহিষ্কৃত হওয়া। ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে গেলেও তার সংসদ সদস্যপদ এখনো টিকে আছে।
স্বামীর মতো মিষ্টিও একসময় বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রদলের নেতা ছিলেন। কলেজ ছাত্রসংসদের এজিএসও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মিষ্টির ভাই ছিলেন ছাত্রদলের একসময়ের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু, যিনি আওয়ামী লীগ আমলে গ্রেপ্তার হয়ে বন্দি থাকা অবস্থায় মারা যান।
মিষ্টির স্বামী নিউটনও ছিলেন ছাত্রদলের প্রভাবশালী নেতা। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন তিনি। পরে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরও হয়েছিলেন। কাউন্সিলর থাকা অবস্থায় ২০০২ সালে তাকে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপিতে সক্রিয় হন মিষ্টি। প্রথমে কাউন্সিলর হয়েছিলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদও পান তিনি। আওয়ামী লীগ আমলে ২০টি মামলার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে মিষ্টি জানিয়েছিলেন।
সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমার বেড়ে ওঠা। দলের নীতি ও আদর্শ থেকে কখনোই বিচ্যুত হইনি।’
তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট।
সুইডেনের সংস্থা রাড্ডা বারনেনের (সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেন) সহায়তায় এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছিল পাঁচ দশক ধরে। মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১০ কাঠা জমিতে তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তৈরি করেছিল।
এই জমিটি দখল করতে আগে থেকে তৎপর ছিল স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তার ধারাবাহিকতায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেখানে টানিয়ে দেওয়া হয় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইন বোর্ড।
পরে অবশ্য সেই সাইন বোর্ডটি খুলে ফেলা হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সংস্কারের কাজও শুরু হয়েছে এরই মধ্যে।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মী এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান।
এর পরপরই মিষ্টিকে পদত্যাগ করার নির্দেশনা আসে। তার আগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যত দখলবাজির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর বার্তা দিয়েছেন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।






