শরণখোলা
গ্রাহকদের ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও এজেন্ট ব্যাংক পরিচালক

অভিযুক্ত ওমর ফারুক রাজু
ভুয়া জমা রসিদ তৈরি করে তাতে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সিল দিয়ে দেওয়া হতো। নিজের মোবাইল থেকে টাকা জমার এসএমএস পাঠানো হতো গ্রাহকেদের মোবাইলে। এমন প্রতারণার মাধ্যমে দেড় শতাধিক গ্রাহকের প্রায় পাঁচ কোটি হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওমর ফারুক রাজু নামে বাগেরহাটের শরণখোলার তাফালবাড়ি বাজারে অবস্থিত ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের এক পরিচালকের বিরুদ্ধে।
গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন। সেই থেকে বন্ধ রয়েছে এজেন্ট ব্যাংকের আউটলেটটিও।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিচালক ওমর ফারুক রাজু গ্রাহকের এই বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে গোপনে নেপাল পাড়ি জমিয়েছেন। সেখান থেকে ইউরোপে ঢোকার পরিকল্পনা করছেন তিনি। এমনটাই জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও তাফালবাড়ি বাজারের ব্যবসায়ীরা।
রাজু পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হতাশ হয়ে পড়েছেন গ্রাহকরা। পলাতক রাজু সাউথখালী ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শাহ আলম হাওলাদারের ছেলে। এ ঘটনায় বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শরণখোলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষ থেকে।
এদিকে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে পরিচালকের লাপাত্তা যাওয়ার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সামনে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছেন। এ সময় ভুক্তভোগীদের জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ করারও আহ্বান জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালে তাফালবাড়ি বাজারে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম শুরু করেন রাজু। স্থানীয় এবং অনেকের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের সুযোগে ধীরে ধীরে মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন তিনি। ডিপোজিটের বিপরীতে মোটা অংকের লভ্যাংশের প্রলোভন দেখানো হয় মানুষকে। এক লাখ টাকা জমা রাখলে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা লাভ দেওয়া হবে বলে প্রচার করা হয়। গ্রাহকরাও বেশি লাভের আশায় এবং তার ওপর আস্থা রেখে টাকা জমা রাখতে শুরু করেন। তার প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে জীবনের শেষ সম্বলটুকু জমা করেছেন অনেকেই। এভাবে দেড় শতাধিক গ্রাহকের আস্থা আর বিশ্বাসকে পুঁজি করে এখন লাপাত্তা প্রতারক রাজু।
ভুক্তভোগী গ্রাহক আ. খালেক পঞ্চায়েত জানান, তার ৩৫ লাখ টাকা এজেন্ট ব্যাংকে জমা রয়েছে। তবে টাকা জমা দেওয়ার পর তাকে একটি স্লিপ দেওয়া হয়েছিল। এখন জানতে পারেন সেই স্লিপটি ভুয়া।
মিনারা বেগম জানান, তার জমা রয়েছে ৩৮ লাখ, বিউটি আক্তার জানান, তিনি জমা করেছিলেন ১০ লাখ, খালিদ সরদার জানান, তিনি জমা করেছিলেন ২০ লাখ। এ ছাড়া জামাল হোসেন ৩ লাখ, জলিল গাজী ৫ লাখ, পান্না ফরাজী ৫ লাখ ৫০ হাজার, বেল্লাল মিয়া ৯ লাখ, রাসেল শরীফ ৮ লাখ ২০ হাজার, গিয়াস মিয়া ৪ লাখ ৫০ হাজার, সজল শেখ ৩ লাখ ৫০ হাজার, বাবুল হাওলাদর ১০ লাখ টাকা জমা করেছিলেন।
এ ব্যাপারে তাফালবাড়ি বাজার কমিটির সভাপতি আ. রাজ্জাক মৃধা জানিয়েছেন, রাজুর আচার-ব্যবহার ভালোই ছিল। মানুষ তাতেই মুগ্ধ হয়েছে। সেই সুযোগ নিয়ে সেও প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল, যা জানতেন না গ্রাহকরা। তার কাছে প্রতিদিন গ্রাহকরা এসে অভিযোগ করছেন। তাদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ আর সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া কিইবা করার আছে তার?
স্থানীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, শরণখোলায় এর আগেও ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিংকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, উপজেলা সদরের রায়েন্দা বাজারের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এক এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালকের বিরুদ্ধেও প্রায় দেড় কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন।
তাদের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে যাবে। বিশেষ করে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের সময় গ্রাহকরা প্রকৃত ব্যাংক রসিদ, এসএমএস ও হিসাবের তথ্য যাচাই না করলে প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হবে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেটগুলোর পরিচালকদের দিকে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নজরদারি রাখার আহ্বান তাদের।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বাগেরহাট জেলার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সিনিয়র সেল্স ম্যানেজার শেখ ওবায়দুল ইসলামের ভাষ্য, গ্রাহকদের অভিযোগ পেয়ে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আউটলেটটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। যাদের কাছে বৈধ জমা রশিদ আছে, তাদের জেলা শাখায় অভিযোগ করতে বলেছি। কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে যাদেরটা সঠিক প্রমাণিত হবে, চাইলে তাদের আমানত ফেরৎ দেওয়া হবে।
এই ব্যাংক কর্মকর্তা আরো বলেছেন, ঘটনাস্থলে যেসকল গ্রাহক অভিযোগ নিয়ে এসেছেলেন, তাদের মধ্যে তাৎতক্ষণিক পর্যালোচনায় ৩০ লাখ টাকা জমার সঠিক স্লিপ পেয়েছি। বাকি যারা তাদের সবার জমা স্লিপ ফেক (ভুয়া) বলে মনে হয়েছে। গ্রাহকদের সঙ্গে এমন প্রতারণা এবং ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার দায়ে পরিচালক ওমর ফারুক রাজুর বিরুদ্ধে মামলা হবে।
শরণখোলা থানার ওসি রোকেয়া খানম বলেন, তাফালবাড়ি ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গ্রাহকদের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরির আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওমর ফারুক রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শাহ আলম হাওলাদার বললেন, রাজু পিরোজপুরে তার বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে ২৩ সেপ্টেম্বর চলে যায়। সেই থেকে তার মোবাইল বন্ধ। কোথায় আছে তা বলতে পারছি না।
ছেলের কাছে মানুষ এত টাকা পাবে, তা আগে কেউ আমাকে বলেনি। এখন অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসছেন। কিন্তু আমার কিইবা করার আছে এখানে। আর এত টাকা শোধ করা সামর্থও আমার নেই, বলেন এই বাবা।





