মাদক নির্মূলের নামে সালিশ, কান ধরে উঠবস ও টাকা আদায়ের অভিযোগ

ছবি: আগামীর সময়
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে মাদক নির্মূলের নামে ‘রোদারপুড্ডা আলোকিত প্রজন্ম’ নামের একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে সালিশ বসিয়ে মানুষকে হেনস্তা, কান ধরে উঠবস করানো, ঘোরানো এবং টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক সেবনের অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটক করে সংগঠনের উদ্যোগে বসানো সালিশে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে।
সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্যে ‘রোদারপুড্ডা আলোকিত প্রজন্ম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। সংগঠনের সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে দিন-রাত এলাকায় টহল দেন। কারও বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ উঠলে তাকে আটক করে এশার নামাজের পর সংগঠনের উদ্যোগে বসানো সালিশে হাজির করা হয়। সেখানে সংগঠনের পক্ষ থেকে তৈরি করা নিয়ম অনুযায়ী বিচার করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সালিশে মাদক সেবনের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কান ধরে ঘোরানো, কান ধরে উঠবস করানো, জুতাপেটাসহ বিভিন্নভাবে অপমান ও লাঞ্ছিত করা হয়। কেউ সালিশে হাজির না হলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী রোদারপুড্ডা মাইজহাটির সিদ্দিক মিয়ার ছেলে মো. সোহাগ মিয়া অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির মিথ্যা অভিযোগ তুলে সালিশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের এক দিন পর সালিশে উপস্থিত হওয়ায় তাকে কান ধরে ঘোরানো, জুতাপেটা এবং কান ধরে উঠবস করানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। এসব ঘটনা জানাজানি হলে তার ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন সোহাগ।
আরেক ভুক্তভোগী রোদারপুড্ডা এলাকার আক্কাস আলীর ছেলে জিহাদ মিয়া (২৮) অভিযোগ করেন, রিজন, খোকন, জিহাদুলসহ ২০ থেকে ২৫ জন তাকে মাদক সেবনের অভিযোগে আটক করে প্রায় দুই ঘণ্টা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন। তার মা-বাবা তাকে ছাড়িয়ে নিতে গেলেও তারা ছাড়েননি। পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলে তার কাছে মাদকের কোনো আলামত না পাওয়ায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
জিহাদ আরও অভিযোগ করেন, পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর ওই রাতেই তাকে ও তার মা-বাবাকে গ্রামের সালিশে হাজির করা হয়। সেখানে তার পরিবারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয় এবং তাকে কান ধরে উঠবস ও ঘোরানো হয়। এসব ঘটনা এলাকার বাইরে কাউকে জানালে বা অভিযোগ করলে তিন মাসের জেল দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রোদারপুড্ডা গ্রামের সাবেক মেম্বার মো. আলম মিয়া বলেন, চেয়ারম্যান প্রার্থী হচ্ছেন জানতে পেরে একটি পক্ষের হয়ে সংগঠনের কয়েকজন সদস্য তার বাড়িতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে তার ছেলেকে তল্লাশি করেন। এ সময় ভিডিও ও ছবি তোলা হয়। তার ছেলে সিগারেটও সেবন করেন না বলে দাবি করেন আলম মিয়া। পরে বাধ্য হয়ে নিকলী থানায় অভিযোগ করলে তার ছেলেকে মাদক কারবারি আখ্যা দিয়ে এলাকায় মিছিল করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোনো আলামত না পাওয়ার পরও ধারীশ্বর গ্রামের সিয়ামকে (২০) ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়ালহাটির জলিল (২৫) ও কফিল (৫৫) হাওরে মাছ ধরতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে গাঁজা সেবনের অভিযোগ তোলা হয়। পরে ফরজ আলী (৩৫) ও রাজীবের (৩৮) নেতৃত্বে তাদের আটক করে সংগঠনটির কাছে হস্তান্তর করা হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ ছাড়া রোদারপুড্ডা মাইজহাটির ইয়াকুব ও তসলিমকে মাদক সেবনের অভিযোগে আটক করে যথাক্রমে ৬ হাজার ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং সালিশে কান ধরে সাত পাক ঘোরানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারীশ্বরের ফেরদৌস (২৮), বাঁধন (১৭), আলমগীর (২৫) ও জারইতলার আকাশ (১৮)সহ আরও কয়েকজনকে জুতাপেটা, কান ধরে ঘোরানো, অপমান-লাঞ্ছিত এবং জরিমানা করার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে ‘রোদারপুড্ডা আলোকিত প্রজন্ম’-এর প্রচার সম্পাদক মো. আব্দুল হালিম হোসাইনী বলেন, প্রমাণসহ মাদকসেবীদের আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়। যেসব ক্ষেত্রে পুলিশ আসামি নিচ্ছে না, সেসব বিষয়ে গ্রামের মুরব্বিরা বিচার করছেন। সাংগঠনিক দায়িত্ব হিসেবে মাদকসেবীদের আটক করে সালিশের দরবারে হাজির করা হয়েছে। সামাজিক জুরি বোর্ডের মাধ্যমে মুরব্বিরা শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সালিশে কান ধরে উঠবস করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কান ধরে উঠবস করানো সামাজিক শাস্তির আওতাভুক্ত ছিল। মাদক সেবনের অভিযোগে আটক কয়েকজনকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজনকে সামাজিক বিচারের আওতায় আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংগঠনের সভাপতি আরিফ রাব্বানী বলেন, তাদের সংগঠনের মাধ্যমে বেশ কিছু মাদকসেবীকে আটক করা হয়েছে। কয়েকজনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে। আর কয়েকজনকে গ্রামীণ সালিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। অনেকের বিষয় গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
সালিশে আটক ব্যক্তিকে জুতাপেটা করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছেলে তার বাবার হাতে শাসিত হয়েছে, এর জন্য গ্রামবাসী বা সংগঠন দায়ী নয়। সালিশে কান ধরে ঘোরানো ও উঠবস করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে গ্রামের সালিশকারীরা বলতে পারবেন।
রোদারপুড্ডা গ্রামের সালিশকারক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল করিম সালিশে কান ধরে উঠবস করানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কাউকে জরিমানা করা হয়নি। তবে একজনকে কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে এবং কয়েকজনকে মুফতির কাছে তওবা করানো হয়েছে। মাদক সেবনের অভিযোগে চারজনকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সংগঠন ও গ্রামের বিচার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইশতিয়াক বলেন, নিকলী থানায় যোগদানের পর তিনি জানতে পেরেছেন, রোদারপুড্ডা এলাকায় একটি সংগঠনের কিছু লোক সালিশে কান ধরে ঘোরানো, উঠবস করানো এবং টাকা আদায় করছে। বিষয়টি জানার পর এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের থানায় সোপর্দ করতে বলা হয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না বলেও জানান তিনি।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




