প্রথম দুই-তিন লাইন পড়েই ঠিক করি অনুবাদ করতে হবে

ছবি তুলেছেন রনি দে
প্রখ্যাত অনুবাদক জি এইচ হাবীব। চার দশক ধরে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ‘তাড়িখোর’, ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’, ‘গোলাপের নাম’, ‘সোফির জগৎ’ তার অনূদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ২০২৪ সালে অনুবাদে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব অনুবাদ দিবস। এ উপলক্ষে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন শিবব্রত বর্মন।
আপনার শৈশব, কৈশোর ও প্রথম তারুণ্যের বইপাঠের জগৎটি কেমন ছিল?
এখনকার চেয়ে একেবারেই অন্যরকম ছিল। ১৯৭৪ সাল থেকে আমরা থাকতাম ঢাকার মিরপুরে। পল্লবীতে ছিলাম প্রথমে, পরে ১০ নম্বরে চলে আসি। পড়াশোনা করেছি শহীদ আবু তালেব উচ্চবিদ্যালয়ে। তখন বিদ্যানিকেতন নাম ছিল। পরে উচ্চবিদ্যালয় নাম হয়। সেখানে কিছু বইয়ের দোকান ছিল, যেগুলোকে আমরা লাইব্রেরি নামে চিনি। সেখান থেকে শুরু আমার বই পড়া। শুরুটি হয়েছিল গোয়েন্দা গল্প, দস্যু বনহুর, কুয়াশা দিয়ে। ওই লাইব্রেরি বা বইয়ের দোকানগুলো থেকে আমরা বই ভাড়া নিতাম। এরকম একটি পদ্ধতি ছিল যে এক টাকা, দুই টাকা, তিন টাকা জমা রাখতাম। তার পরে চার আনা, আট আনা দিয়ে বইগুলো ভাড়া নিয়ে পড়তাম। এই করতে করতে দেখা গেল যে ক্যাডেট কলেজে পড়ার বয়স হয়ে গেছে। ক্লাস সেভেনে চলে গেলাম মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে। সেখানে একটি লাইব্রেরি ছিল শহীদ খুরশিদ গ্রন্থাগার। সেখানে বই পড়তাম।
ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পাঠাগার বলতে যেটি বোঝায়, সেটির অভিজ্ঞতা হয়নি আপনার?
না, সে অর্থে হয়নি। কারণ, সে অর্থে কোথায় পাঠাগার? শাহবাগের যে পাঠাগার, সেখানে গিয়ে সেবা প্রকাশনীর বই না পেয়ে হতাশ হয়েছিলাম। মিরপুরে ওই অর্থে কোনো পাঠাগার আমি চিনতাম না। ১৯৮০ সালে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে যখন ক্যাডেট কলেজে গেলাম, তখন একটি জগৎ খুলে গেল। আমাদের ক্যাডেট কলেজের যে সাপ্তাহিক রুটিন, সেখানে একটি পিরিয়ড ছিল লাইব্রেরি পিরিয়ড। তখন আমরা ওই লাইব্রেরিতে চলে যেতাম। সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে যেতে হতো। সেটি খুবই আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। তখন ক্রাইম জনরার বাইরে অন্যান্য বইপত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন, এখনো আছেন— রফিক কায়সার। তিনি নানা বইপত্রের কথা প্রায়ই বলতেন। আমরা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে চলে আসি, তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন— তুমি এই ছুটির মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলো শেষ করে ফেলো। তিনি আরেকটি জিনিসের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সেটি ‘দেশ’ পত্রিকা। সেটিও পড়তাম।
পাঠক জি এইচ হাবীব থেকে কীভাবে লেখক জি এইচ হাবীবে রূপান্তর ঘটল আপনার? অধিকাংশ লোক শেষ পর্যন্ত পাঠক থেকে যায়, রূপান্তর ঘটে না। আপনার কেন মনে হলো যে আমাকে লিখতে হবে?
একজন লোক যখন শৈশবে পরিবারে মা-বাবাকে কোনো কিছু করতে দেখে, তখন তার সেই জিনিসটি করার আগ্রহ তৈরি হয়। আমার বাসায় তো ওভাবে কেউ লেখালেখি করত না। কিন্তু যখন আমি সেবা প্রকাশনীর নানা বই পড়ছি, ‘রহস্য পত্রিকা’ পড়ছি এবং সেগুলো বেশিরভাগই অনুবাদ বা বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে, তখন মনে হলো যে— আচ্ছা, এরকম তো তাহলে আমিও লিখতে পারি। তারও আগে, আমাদের ক্যাডেট কলেজের এক বড় ভাই ছিলেন। নাম আজম। আমার চেয়ে কয়েক বছরের সিনিয়র ছিলেন। মিরপুরে থাকতেন। আর আমাদের এলাকা পল্লবী। ভাবলাম, আমরা দস্যু বনহুরের মতো কিছু লিখতে পারি কিনা। যৌথভাবে আমরা লেখারও চেষ্টা করছিলাম। পরে দেখি যে এগুলো খুব একটা এগোচ্ছে না। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আর্থার কোনান ডয়েল, আগাথা ক্রিস্টি পড়েছি। আমি দুই-একটা গল্প অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার টেস্ট সিরিয়াস লেখার দিকে গেল। দেখা গেল, আমার যে ধরনের বইয়ের প্রতি আগ্রহ, সেগুলোর মূল লেখকের শৈলী বজায় রেখে, বাক্যের দৈর্ঘ্য বজায় রেখে অনুবাদ করলে সেবা প্রকাশনীতে তা অ্যালাউড না
এগুলো নিছক মকশো করার জন্য করছিলেন, নাকি ছাপানোর উদ্দেশ্যে?
আমার তো ইচ্ছা ছিল যে এগুলো শেষ করব। কিন্তু দেখা গেল, নানা কারণে ওগুলো শেষই করতে পারিনি। সেই অর্থে লেখালেখি শুরু হয় ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়ে আসার পর। ক্যাডেট কলেজে ছিলাম ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৬ সালের শেষের দিকে একটি গল্পের অ্যাডাপ্টেশন করলাম। নাম ছিল ‘দ্য কিলিং মেশিন’। জ্যাক রিচি নামে এক ভদ্রলোকের একটি গল্প। ‘রহস্য পত্রিকা’য় পাঠিয়ে দিলাম। এটি বের হয়েছিল ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। দেখে তো আমি একেবারে আনন্দে আটখানা।
এটিই আপনার প্রকাশিত প্রথম সাহিত্যকর্ম?
যদি না আমি ক্যাডেট কলেজে সাইক্লো স্টাইলে ছাপা পত্রিকায় দুটো কবিতার কথা বলি। রফিক কায়সার স্যারের সান্নিধ্য যেহেতু পেয়েছিলাম, হতে পারত সিরিয়াস সাহিত্যকর্মেই আমি চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বইগুলো আমাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে অনুবাদ বা অ্যাডাপ্টেশনটাকেই বোধ হয় আমার বেটার মনে হয়েছিল। তারপর তো বুঝেই গেলাম, কবিতাতে আমার হবে না। তখন ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে অনুবাদ বা অ্যাডাপ্টেশন করি।
তাহলে অ্যাডাপ্টেশন দিয়ে শুরু, তাই তো...
হ্যাঁ, আমাদের দেশীয় পটভূমিতে ওটা করা হয়েছিল। নামধাম, জায়গা, একেবারে চরিত্রের নামও পাল্টে দিয়ে করেছিলাম। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, গিয়ে দেখি এক হাজার টাকা লেখার বিল হয়েছে। সেই ১৯৮৭ সালে। ১৯৮৭ সালে ‘রহস্য পত্রিকা’য় একটি গল্প লিখলে বিল হতো এক হাজার টাকা। এখনো কিন্তু ওই এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যেই বিল হয়। এই বিল পেতে আমার কিছুই করতে হয়নি। জাস্ট অফিসে গিয়েছি, আস্তে করে দিয়ে দিয়েছে। হয়তো মার্চ বা এপ্রিলে গিয়েছিলাম।
ক্যাডেট কলেজের পর উচ্চতর পড়ালেখা কোথায় করলেন?
১৯৮৬ সালে ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হওয়ার পর ভর্তি পরীক্ষা দিলাম ঢাকা আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলো, কিন্তু সে সময় বোধ হয় একটা কিলিং হয়েছিল। আমার বাসার সবাই বলল, ঝামেলার মধ্যে যেও না, তুমি জাহাঙ্গীরনগরে চলে যাও। ওখানে ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি— দুটোতেই হয়েছিল। খুব ইন্টারেস্টিং যে, বাংলা পরীক্ষায় আমি প্রথম হয়ে গেছিলাম। যখন ভাইভা দিতে গেলাম, ওখানে ছিলেন হায়াৎ মামুদ স্যার ও আফসার আহমেদ স্যার। আফসার স্যার বললেন, তাহলে তুমি বাংলাতেই পড়ো। মজার ব্যাপার হলো, হায়াৎ মামুদ স্যার বাংলার শিক্ষক হয়েও বললেন— না, ও ইংরেজিতেই পড়ুক। তার পর তো ইংরেজিতে ভর্তি হলাম। তখনকার চেয়ারম্যান শফি আহমেদ স্যার, শেকসপিয়ার বিশেষজ্ঞ, আমাদের প্রথম ক্লাস নিয়েছিলেন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমার যেটি হয়েছে ইনটিউশনটাই কাজ করেছে বোধ হয় খুব বেশি। এক লাইন-দুই লাইন পড়ে আমি অনেক সময় ঠিক করে ফেলেছি যে এই বইগুলো অনুবাদ করব
ওদিকে ‘রহস্য পত্রিকা’য় আপনার একের পর এক গল্প ছাপা হতে লাগল?
হ্যাঁ। ‘রহস্য পত্রিকা’য় ছাপতে ছাপতে আমি ভাবলাম, এখন তাহলে একটি বই করা যাক না কেন? মানে সাহস বাড়ছিল। আমার মনে আছে, তখন পে-ফোন ছিল। মিরপুরে একটি জায়গা থেকে পয়সা ফেলে ফোন করা যেত। আমি কাজীদাকে (কাজী আনোয়ার হোসেন) ফোন করলাম। বললাম, আমি একটি বই অনুবাদ করতে চাই— ‘দ্য সাইন অব ফোর’। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনার তো গল্প বের হয়েছে এখান থেকে। এক কাজ করেন, প্রথম চ্যাপ্টারটি অনুবাদ করে জমা দেন।’ তখন ওই প্রথম চ্যাপ্টারের অনুবাদ নিয়ে তার কাছে জমা দিলাম।
সেটিই প্রথম কাজীদার সঙ্গে দেখা? কেমন দেখলেন তাকে?
আমি যে ‘রহস্য পত্রিকা’য় লেখা দিতে যেতাম, সেখানে সম্ভবত কাজীদার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে ‘রহস্য পত্রিকা’ যারা চালাতেন, তাদের সঙ্গে। আমি লেখা শেখ আবদুল হাকিমের হাতে দিয়ে এসেছিলাম। তখন দেখতাম, রকিব হাসান, নিয়াজ মোরশেদ আছেন। রওশন জামিলের সঙ্গে পরে পরিচয় হয়েছিল। আমি ‘দ্য সাইন অব ফোর’-এর এক চ্যাপ্টার লিখে নিয়ে গেলাম কাজীদার তিনতলার ঘরে, দুরুদুরু বুকে। তিনি খুব রাশভারী লোক ছিলেন। তখন আমি মাত্র ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। তিনি পাণ্ডুলিপিটি নিলেন। বোধ হয় ব্যাকগ্রাউন্ডে, মানে তার পেছনে মিউজিক বাজছিল। যতদূর মনে পড়ে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক, ইন্সট্রুমেন্টাল কিছু একটা বাজছিল। তার হাতে পাণ্ডুলিপি দিয়েই চলে এলাম। খুব যে বেশি আলাপচারিতা হয়েছে এমন না বা তিনি সেই অর্থে কিছু জানতেও চাননি যে আমি কী করি? পরে যখন ওটার প্রুফ হয়েছে জানিয়ে আবার ডাকলেন, তখন দুই-চারটি কথা বলেছিলেন যে একজন লেখক বা একজন অনুবাদককে কতটা কেয়ারফুল থাকতে হয় বানানের ব্যাপারে, শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে। তার বক্তব্য ছিল, আপনি একটু উঁচু জায়গা থেকে লিখছেন এবং আপনার পাঠকরা সেটি পড়ছে। তাদেরও সম্মান এবং মর্যাদা আছে। ফলে আপনি যে জিনিসগুলো লিখছেন, সেটি যেন ঠিকমতো হয়। বাক্যের বানান, বাক্যের গঠন যেন ঠিকমতো হয়। পাংচুয়েশনগুলো যেন ঠিকমতো হয়— এ রকম কিছু উপদেশও দিয়েছিলেন তিনি।
কত কপি ছাপা হয়েছিল আপনার বই?
এটি ইন্টারেস্টিং যে পাঁচ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। মাসুদ রানা সিরিজ তখন আরও বেশি ছাপা হতো— ১০ থেকে ১২ হাজার কপি বা আরও বেশি। প্রথম তিন মাসে এগুলো বিক্রি হয়ে যেত। সেবা প্রকাশনীর প্রথম বিলটা দিত এক মাস পর। ১৬ ফেব্রুয়ারি বেরিয়েছে বইটি। মার্চ মাসের ১৬ বা ১৭ তারিখের দিকে গেলাম। প্রথম মাসে যা বিক্রি হয়েছে, তাতে ৫ হাজার ৬০০ টাকার বেশি বিল হয়েছে। তারা ৭ শতাংশ রয়্যালটি দিতেন তখন। ১৯ টাকা বইয়ের দাম।
আপনি সেবা প্রকাশনীর নিয়মিত অনুবাদক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেটি হলেন না। ব্যাপারটি কীভাবে ঘটল?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার টেস্ট একটু চেঞ্জ হলো। শুধু জনরা লিটারেচারের প্রতি আগ্রহ থেকে আমার টেস্ট সিরিয়াস লেখার দিকে গেল। দেখা গেল, আমার যে ধরনের বইয়ের প্রতি আগ্রহ, সেগুলোর মূল লেখকের শৈলী বজায় রেখে, বাক্যের দৈর্ঘ্য বজায় রেখে অনুবাদ করলে সেবা প্রকাশনীতে তা অ্যালাউড না। আমার তখন মনে হয়েছিল, এটি করলে রস ক্ষুণ্ণ হয়।
ফলে সেবার নিয়মিত অনুবাদক হওয়ার দিকে আপনার আগ্রহ থাকল না?
না, থাকল না। যদিও টাকা হয়তো পাওয়া যেত। সেই সময় পাঁচ হাজার টাকা অনেক।
বিশ্বসাহিত্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে কীভাবে অনুবাদের জন্য বই বাছাই করেন?
‘সেরেনডিপিটি’ বলে একটা কথা আছে না? অনেকটা ইনটিউশন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমার যেটি হয়েছে, ইনটিউশনটাই কাজ করেছে বোধ হয় খুব বেশি। এক লাইন-দুই লাইন পড়ে আমি অনেক সময় ঠিক করে ফেলেছি যে এই বইগুলো অনুবাদ করব। আমি ওই অর্থে সিরিয়াসলি করলাম ‘তাড়িখোর’ (দ্য পাম ওয়াইন ড্রিংকার্ড) আর ‘অদৃশ্য নগর’ (দ্য ইনভিজিবল সিটিজ)। ‘পাম ওয়াইন ড্রিংকার্ড’-এর প্রথম দুই-তিন লাইন পড়েই ঠিক করলাম, এটি আমাকে অনুবাদ করতে হবে।
জনরার বাইরে সেটিই আপনার প্রথম সিরিয়াস লিটারারি কাজ?
জনরার বাইরে এটিই প্রথম। বইটি ছোট আছে আর প্রথম লাইনটিই তো আমাকে পাগল করে দিল। এরকম ঘটনা আরেকবার ঘটে ‘ইনভিজিবল সিটিজ’-এর ব্যাপারে। তখন আমি কাজ করি ‘দৈনিক আজকের কাগজে’। মাসরুর আরেফিনের কাছে দেখলাম ‘ইনভিজিবল সিটিজ’। সেটিরও প্রথম দুই-তিন লাইন পড়ে আমার ইচ্ছা হলো অনুবাদ করার। চুজ করার ব্যাপারটা বললেন না? এখানে কিন্তু আমি পুরোটা আগে পড়ে ফেলিনি।
বইটি ভর করে আপনার ওপরে যে, এটি অনুবাদ করতেই হবে?
হ্যাঁ, ওই যে সেরেনডিপিটি! কীভাবে যেন পেয়ে যাই বা একটা বই সামনে চলে আসে। তবে আমি কখনো ভাবিনি যে ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড’ অনুবাদ করব। হঠাৎ একদিন লুৎফর সাহেব (সন্দেশ প্রকাশনী) আমাকে অনুরোধ করলেন। তার কিছুদিন আগে আমি ১০০ টাকা দিয়ে সেকেন্ডহ্যান্ড একটা ভালো কপি কিনেছিলাম বইটির। ভাবলাম, ঠিক আছে, তাহলে এটি করা যায়। তখন ১৯৯৫ সাল। ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় চাকরি করি। এটি অনুবাদ করতে করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসি চাকরি নিয়ে। বইটি শেষ করতে আমার প্রায় পাঁচ বছর লেগেছে।
আপনি যাদের বই অনুবাদ করেছেন, তাদের অনেকেই ইংরেজি ভাষার মূল লেখক নন; তারা ইতালীয়, স্প্যানিশ, নরওয়েজিয়ান। মূল ভাষা না জেনে ইংরেজি অনুবাদের ওপর নির্ভর করে অনুবাদ করা কি অনুবাদকে কিছুটা পরোক্ষ করে দেয়? সরাসরি মূল ভাষা থেকে অনুবাদ খুব প্রয়োজনীয়?
বর্তমানে অনুবাদের ক্ষেত্রে দুটো কথা মানা হয়— মূল ভাষা থেকে করতে হবে এবং যে ভাষায় অনুবাদ করবেন, সেটিতে দক্ষতা সোর্স ল্যাঙ্গুয়েজের চেয়ে বেশি থাকতে হবে। ওয়েস্টে সাধারণত মূল ভাষা ছাড়া গ্রাহ্যই করা হয় না। কিন্তু আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বুঝতে হবে। বিদেশে একজন অনুবাদক একজন লেখককে নিয়েই পড়ে থাকেন। যেমন— উইলিয়াম উইভার। তিনি উমবের্তো একোর বেশিরভাগ বই অনুবাদ করেছেন। আমার এখানে বাস্তবতা হলো একজনের একটি বই ভালো লাগল, তো আরেকজনের আরেকটি বই ভালো লাগল। এ দুজন দুই ভাষার। আমাদের এখানে তৃতীয় একটি ভাষা জানা লোক খুব কম। এখন আমি যদি ইতালীয় বা নরওয়েজিয়ান ভাষা শিখতে যেতাম, তবে আমার মন যে অন্য বইয়ের দিকে টানছিল, সেগুলোর কী হতো? আমার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের চেয়ে মনটাই বেশি চলে। আমার কাছে ইংরেজিটাই মূল টেক্সট। অবশ্যই এতে কিছু ‘লস্ট ইন ট্রান্সলেশন’ হয়। তবে মূল ভাষা থেকে করলেই যে অনুবাদ ভালো হবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই, যদি না ভাষায় অনুবাদকের ভালো দক্ষতা থাকে। বুদ্ধদেব বসু বা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যদি মূল ভাষা শেখার অপেক্ষায় কলম গুটিয়ে বসে থাকতেন, তবে আমাদের সাহিত্য কতটা দরিদ্র থেকে যেত?
অনুবাদ যদি সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম হয়, তাহলে একটি দেশের সাহিত্যের ইতিহাসে অনুবাদ সাহিত্যের উল্লেখ কেন আলাদা করে থাকে না?
থাকা উচিত! এজরা পাউন্ড যেমন বলেছেন, অনুবাদ সাহিত্য মূল সাহিত্যকে পরিপুষ্ট করে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনুবাদকে শুধু দু-একটি পাসিং রিমার্ক ছাড়া তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ মধ্যযুগের আলাওলের মতো মহাকবিদের রচনাও অনুবাদ বা অ্যাডাপ্টেশন ছিল। পিটার ফ্রান্স যেমন ‘অক্সফোর্ড গাইড টু লিটারেচার ইন ইংলিশ ট্রান্সলেশন’ সম্পাদনা করেছেন, সেখানে কোন ভাষা থেকে কোন রচনাটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে, তা লেখা আছে। আমাদেরও ‘বাংলা একাডেমি গাইড টু লিটারেচার ইন বেঙ্গলি ট্রান্সলেশন’-এর মতো কাজ হওয়া দরকার। তাহলে আমরা কারা বই অনুবাদ করেছেন, তাদের সম্পর্কে জানতে পারতাম। একজন লেখকের জীবন ও কর্ম নিয়ে বই লেখা হয়, কিন্তু বাংলায় কোনো অনুবাদকের ওপর কোনো বই নেই। অথচ তারা এই ভাষায় বিভিন্ন ভাষা থেকে প্রচুর অনুবাদ করে ভাষাটিকেই পরিপুষ্ট করে দেন।
আপনি সাধারণত ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ করেন। এর উল্টোটি করার পরিকল্পনা আছে কি?
আমি
ইনডিপেনডেন্টে চাকরি করার সময় বুদ্ধদেব
বসুর একটি রচনা— এই
মুহূর্তে আনফরচুনেটলি ভুলে গেছি কোন
রচনা—সেটির কিছুটা ইংরেজি অনুবাদের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনো ফিকশন বা
নন-ফিকশন সেই অর্থে অনুবাদ
করা হয়নি। একটা বড় কারণ
বোধ হয় এই, আসলে
আমার ভালোবাসা ও প্রবণতাটা মূলত
বাংলা ভাষার দিকে। খুব ভালো ইংরেজি
হলে আমার পড়তে ভালো
লাগে, তবে ইংরেজি লেখার
প্রতি আমার একটা অনীহা
আছে—যদিও আমি ইংরেজি
সাহিত্যে পড়াশোনা করেছি, ইংরেজি পড়াই। ইংরেজি লেখার ব্যাপারে অনীহা থাকার কারণে একটা দুর্বলতা বা
অক্ষমতা তৈরি হয়েছে যে
আমি ওই অর্থে লিখতে
চাই না বা লিখতে
পারি না। তবে আমি
এটা অবশ্যই মনে করি, আমাদের
সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এই সাহিত্যের
এমন অনেক লেখা আছে,
যেগুলো ইংরেজিতে বা অন্য ভাষায়
অনূদিত হওয়া উচিত। কিছু কিছু হয়েছে,
কিন্তু পরিমাণে খুবই কম। যতটুকুই
হয়েছে, তা ইংরেজিভাষী পাঠকদের
কাছে খুব
কমই গেছে।
এখন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) হাজির হওয়ার পর একটা অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে অনুবাদক আগামীতে কি নিছক একজন সম্পাদকে পরিণত হবেন?
বর্তমানে পেইড এআই মডেলগুলো নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারদর্শী। কিন্তু সাহিত্য বা কবিতার অনুবাদ এআইর পক্ষে করা বেশ কঠিন বলে আমার মনে হয়। যদি সেটি নাও হয়, সেখানে হিউম্যান ইন্টারভেনশনটি লাগবে। অনুবাদকরা যে শুধু সম্পাদক হয়ে থাকবেন, সেটি নয়। অনুবাদক হিসেবে আরও অনেক দিন তাদের মনে হয় ভূমিকাটি পালন করতে হবে।
(২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)






