চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিধি মানে না কোনো সরকারই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাকের আল মাহমুদ (ছদ্মনাম) বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। তার বাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহের এক উপজেলায়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহমুদের বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) প্রতিবেদন পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, তার বাবা একজন ব্যবসায়ী। বর্তমানে তিনি স্থানীয় বণিক সমিতির সহসভাপতি। ২০০৭ সালে তিনি (মাহমুদের বাবা) উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংসদ নির্বাচনে কাজ করেছেন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হলে তিনি মাহমুদের জন্য একটি আধাসরকারি পত্র (ডিও) দেন। এর ভিত্তিতে একই বছরের ৭ জুলাই ফের প্রতিবেদন দেয় এসবি। পরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তার বাবা একজন ব্যবসায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয় নন। তার পরিবারের কোনো সদস্য রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত নন। একই প্রার্থীর দুই ধরনের প্রতিবেদন থাকায় নিয়োগবঞ্চিত হন মাহমুদ। শুধু মাহমুদ নন, বিগত পাঁচটি (৩৮তম-৪২তম) বিসিএসে অন্তত ২৩৯ প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল পিএসসি; কিন্তু কেউ নিয়োগ পাননি।
আওয়ামী আমলের এ ধারা থেকে বের হতে পারেনি ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও। ওই সময় পিএসসির সুপারিশ পেয়েও ৪৩ ও ৪৪তম বিসিএসে অন্তত আড়াইশ প্রার্থী নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন পুলিশি প্রতিবেদনে ‘বিরূপ’ মন্তব্য থাকায়। শুধু ক্যাডার পদেই নয়; প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকসহ নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে এবং অপরাধে জড়ানোর তথ্য থাকলে তাকে নিয়োগের জন্য অনুপযুক্ত বিবেচনা করা যায়; কিন্তু বাস্তবে যাচাইয়ের নামে প্রার্থী বা তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হয়। আবার কোনো কোনো সময় প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ না করলে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে। এভাবেই নিরীহ প্রার্থীদের রাজনৈতিক ‘তকমা’ দিয়ে বছরের পর বছর নিয়োগ ও পদোন্নতিবঞ্চিত করা হচ্ছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থীদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে নিয়োগ দেওয়ারও নজির রয়েছে।
অথচ বিদ্যমান বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ অনুযায়ী একজন প্রার্থীকে মেডিকেলে আনফিট (অযোগ্য) বা ‘অপরাধী’ গণ্য করে পুলিশ প্রতিবেদন না দিলে তাকে নিয়োগবঞ্চিত করার বিধান নেই। এমনকি প্রার্থীর মা-বাবা বা পরিবারের কোনো সদস্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও প্রার্থীকে বঞ্চিত করা যাবে না। কারণ, সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য পুলিশ বা রাষ্ট্রের কোনো সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়ার বিধান আছে। এর মূল উদ্দেশ্য— চাকরিপ্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত কি না, সেটা যাচাই করা। একই বিধান নন-ক্যাডারসহ সরকারি সব চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তবে এই অভিযোগ মানতে নারাজ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো বিসিএসের রেজাল্ট হয়নি। তারপরও আমরা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পিএসসির সুপারিশের আলোকে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। নিয়মের বাইরে কিছুই করা হবে না।’
ফৌজদারি অপরাধী অথবা মেডিকেলে আনফিট না হলে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই
ফিরোজ মিয়া
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অনুচ্ছেদের ২৯ ধারা অনুযায়ী, চাকরিতে পিএসসির সুপারিশের পর তথাকথিত ভেরিফিকেশনের নামে কাউকে বাদ দেওয়া সংবিধানসম্মত নয়। কার বাবা, দাদা, নানা, খালু কখন কী করেছেন, কোন দল করেছেন; তা বিবেচ্য বিষয় নয়।
জানতে চাইলে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার আগামীর সময়কে বললেন, ‘এই অনাচার ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে চলে এসেছে। ১৯৫৫ ব্যাচে সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) পরীক্ষায় পটুয়াখালীর বাউফলের এ বি এম আবদুল লতিফ মনোনীত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্র ১৯৫৩-৫৪ সেশনে এসএম হলের ভিপি ছিলেন। কিন্তু বিরূপ পুলিশি প্রতিবেদনের কারণে চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। সেই ধারা আজও চলছে। তবে আগে এখনকার মতো এতটা প্রকট ছিল না। এ থেকে মুক্তি শুধু রাজনৈতিক ঐক্যই দিতে পারে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানাচ্ছে, আওয়ামী আমলের মতো একই পথে হেঁটেছে অন্তর্বর্তী সরকারও। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ৪৪তম বিসিএসের গেজেট হয়। সেই গেজেটে নিয়োগের জন্য পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ১৮৬ জনের নাম ছিল না। অন্যরা যথারীতি চাকরিতে যোগ দিলেও বঞ্চিতরা এখনো চাকরির জন্য ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। ভুক্তভোগীদের দাবি, যাচাই-বাছাইয়ের নামে পুলিশ ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক ‘তকমা’ দিয়ে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে ৪৩তম বিসিএসেরও অন্তত ৬৫ জন পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও গেজেট না হওয়ায় চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি।
অনুসন্ধান বলছে, ৩৮তম বিসিএসে সব ধরনের পরীক্ষা শেষে ২ হাজার ৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল পিএসসি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিয়েছিল ২ হাজার ১৫১ জনকে। ওই বিসিএসের ৫৩ জন নিয়োগ পাননি। একইভাবে ৩৯তম বিসিএসে (বিশেষ) ৬ হাজার ৭৯২ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ৬ হাজার ৭৩২ জনকে। এখানেও ৬০ জন নিয়োগ পাননি। ৪০তম বিসিএসে সুপারিশ পেয়েছিল ১৯৬৩ জন অথচ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল ১৯৩১ জনের। এ দফায় ৩২ জন বঞ্চিত হন। ৪১তম বিসিএসে পিএসসি সুপারিশ করেছিল ২ হাজার ৫২০ জনকে, নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ২ হাজার ৪৫৯ জনকে। এ বিসিএসেও ৬১ জন এখনো নিয়োগ পাননি। ৪২তম বিশেষ বিসিএসে ৪ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল পিএসসি। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৯৬৭ জনকে। অর্থাৎ আরও ৩৩ জন বাকি ছিল নিয়োগের। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জানানো হয়েছিল, আওয়ামী সরকারের সময়ে ২৮তম বিসিএস থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত পিএসসির সুপারিশ করা অনেক প্রার্থী নিয়োগবঞ্চিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ২৫৯ জনকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়ার মতে, পুলিশ যাচাই করতে পারে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ, দাগি অপরাধী হওয়া বা এ ধরনের কোনো অপরাধের তথ্য পায়; কিংবা শারীরিক অযোগ্যতা প্রমাণিত হলে শুধু ওই প্রার্থীকে বাদ দেওয়া যেতে পারে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রথা বাতিল করার সুপারিশ করেছে। কারণ হিসেবে কমিশন বলেছে, এ স্তর থেকে জনপ্রশাসনে রাজনীতিকরণ শুরু হয়। এ ছাড়া কমিশন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল ঘোষণার আগে কোনো প্রার্থীর পুলিশি যাচাই বাতিল করারও সুপারিশ করা হয়। বলা হয়েছে, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ বিভাগের কাছে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কি না, সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাইবে। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে।



