ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই চট্টগ্রামের ১২ কারাগারে
- ধারণক্ষমতার তিন গুণ বন্দি
- ৫ কারাগারে মহিলা বন্দি রাখার অবকাঠামো নেই
- ৭ সাবজেল নির্মাণের প্রস্তাব

‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী’— বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার লাইন। বন্দির অস্বাভাবিক চাপে চট্টগ্রাম বিভাগের ১২ কারাগারের পরিস্থিতি এখন এমনই! সব কটি কারাগার মিলিয়ে বন্দি রাখা যাবে ৭৭৭৫ জন। কিন্তু গড়ে থাকছে ২০-২১ হাজার। কারাবিধি অনুযায়ী, একজন বন্দির জন্য কারাগারে ৩৬ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা। এখন এই একজনের বরাদ্দের জায়গায় থাকছেন দু-তিনজন। তিন গুণ বেশি বন্দি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।
মানবাধিকার আইনজীবী রাসেল মোহাম্মদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আদালতে আনা বন্দিদের কাছ থেকে তাদের করুণ কারাজীবনের কথা শুনি। কারাগারের ভেতর একজন নাগরিকের ন্যূনতম মানবিক ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে না। বিনা বিচারে হাজার হাজার বন্দি দুই-আড়াই বছর ধরে কারাগারে। অথচ বিচার ও জামিন পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার।’
অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে সাত উপজেলায় সাতটি সাবজেল নির্মাণের প্রস্তাব কারা অধিদপ্তরকে দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-প্রিজন্স) মোহাম্মদ ছগির মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘চট্টগ্রামের পটিয়া ও বাঁশখালী, কক্সবাজারের চকরিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া, নোয়াখালীর হাতিয়া এবং বান্দরবানের লামায় একটি করে মোট সাতটি সাবজেল নির্মাণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে চৌকি আদালতের কার্যক্রম চলমান আছে। চৌকি আদালতের সঙ্গে একটি করে সাবজেল করা হলে বন্দিদের জেলা কারাগারে আনতে হবে না।’
১২ কারাগারের কোনটিতে কত বন্দি: কর্তৃপক্ষের গত শনিবারের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১২ কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে ১৩ হাজার বেশি বন্দি অবস্থান করছেন। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এদিন বন্দি ছিলেন ৬৯৩৮ জন। অথচ এ কারাগারের ধারণক্ষমতা ১৯৮৫। ৮৩০ জনের ধারণক্ষমতার কক্সবাজার জেলা কারাগারে ছিলেন ৩ হাজার ৫১ জন। রাঙামাটি জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ১৪৫ জন। বন্দি ২৭৬ জন। বান্দরবান জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ১১৪ জন। বন্দি ৫১৬ জন। খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৮১ জন। বন্দি ২৭৮ জন। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির ধারণক্ষমতা ১৭৪২ জন। শনিবার কারাগারে ছিলেন ৩৪১৭ জন। ৫০০ বন্দির ধারণক্ষমতার নোয়াখালী জেলা কারাগারে শনিবার ছিলেন ১১২৯ জন। ৭৮০ জনের ধারণক্ষমতার ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বন্দি ছিলেন ২১৮৫ জন। চাঁদপুর জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪৭৫ জন। বন্দি ১১৮০ জন। লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ২৯৫ জন। বন্দি ৬৮২ জন। ফেনী জেলা কারাগার-১-এ বন্দি ধারণক্ষমতা ৩৯২ জন। ছিলেন ৬১৬ জন। আর ১৭২ জন বন্দির ধারণক্ষমতার ফেনী জেলা কারাগার-২-এ ৪৪৭ জন পুরুষ বন্দি রাখা হয়েছে।
এদিকে কারা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১২ কারাগারে ২৩৬ জন মহিলা বন্দি রাখার জায়গা আছে। রাখতে হয়েছে ৭৮৬ জন। যার মধ্যে ২৩ জন বিদেশি নারী। কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী-১, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে আলাদাভাবে মহিলা বন্দি রাখার কোনো অবকাঠামো নেই। অথচ এসব কারাগারেও বিশেষভাবে ২৩৬ জন মহিলা বন্দি রাখতে হয়েছে।
চাপ বেশি রাজনৈতিক বন্দির: মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে কমপক্ষে ২৯ হাজার জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে। তাদের বিশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত ২৮৩৬ জন, বিএনপির ৩১৮ জন, জামায়াতের ৫৮ জন, এনসিপির ৩৩ জন ও চরমপন্থী ২৮ জন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে একই সময়ে ৩৭ হাজার ১৩৫ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যার মধ্যে ১১ হাজার ৩৮৮ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।
কারাধ্যক্ষ সৈয়দ শাহ্ শরীফ আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাজনৈতিক মামলায় বন্দির কথা যেভাবে বলা হচ্ছে আসলে বিষয়টি সেরকম নয়। চট্টগ্রাম কারাগারে পাঁচশ জনের মতো নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন আছেন। এর চেয়ে অনেক বেশি আছেন মাদক মামলার আসামি। মোট বন্দি হিসাব করলে রাজনৈতিক বা বিশেষ বন্দির সংখ্যা সে অর্থে খুব বেশি নয়।’
আইনজীবী রাসেল মোহাম্মদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘চট্টগ্রামে রাজনৈতিক মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার মানুষের নামে গণমামলা হয়েছে। গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এখন ঝটিকা মিছিল করছে ১০ জন। মামলা হচ্ছে ২০০-২৫০ জনের নামে। এছাড়া যেসব মামলায় গ্রেপ্তার, সেই মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করা হচ্ছে না। বিনা বিচারে বন্দিদের কারাগারে থাকতে হচ্ছে। ফলে কারাগারের ওপর চাপ বাড়ছে।’



