গরিবের ডাক্তার খুরশীদ আলম

চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে রোগী দেখছেন ডা. মোহাম্মদ খুরশীদ আলম
‘আমার মা মারা যান ২০১০ সালে। তিনি কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। আমার বাবা তাকে সুস্থ করতে অনেক চেষ্টা করেও সফল হননি। মায়ের অসুখের কষ্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার এলাকার মানুষ, যারা অর্থের অভাবে ভালো চিকিৎসা পান না, আমি তাদের চিকিৎসা দেব।’
কথাগুলো বলছিলেন ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজিস্ট (অবেদনবিদ) ডা. মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।
ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কাশিমপুর গ্রামে তিনি বাবা-মায়ের নামে গড়ে তুলেছেন রশিদ-আনোয়ারা ফ্রি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। সাত বছরে এ কেন্দ্রে চিকিৎসা পেয়েছেন আট হাজারের বেশি রোগী। তাদের বিনামূল্যে ওষুধ দেন তিনি। এর মধ্যে দুই শতাধিক রোগীকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে নামমাত্র খরচে অস্ত্রোপচার করে সুস্থ করা হয় তার উদ্যোগে। বিভিন্ন রোগ নিরূপণ কেন্দ্রেও রোগী পাঠিয়ে ফ্রি চিকিৎসা ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। প্রতি মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফ্রি রোগী দেখা হয় এই চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে।
ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কাশিমপুর এলাকার মরহুম আব্দুর রশিদ ও মরহুমা আনোয়ারা বেগমের সন্তান ডা. মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ফেনী সদর হাসপাতালে অবেদনবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বদলি হন মহিপালের বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে। বর্তমানে রয়েছেন ফেনী জেনারেল হাসপাতালে।
ডা. খুরশীদ বলেছেন, ‘এর আগে বিভিন্ন সময়ে এলাকার যেসব রোগী আমার কাছে আসতেন, তাদের সেবা দিতাম। তবে চেম্বার চালু করে ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি ২০২০ সাল থেকে।’
তিনি বললেন, ‘আমরা সপ্তাহে এক দিন ফ্রি চিকিৎসার পাশাপাশি জেলার কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কী ধরনের সেবা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করি। এ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বছরে কমপক্ষে একবার আয়োজন করা হয় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প।’ পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়নের রোগী এসে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ডা. খুরশীদ এলাকায় বিভিন্ন জনহিতকর কাজের সঙ্গে জড়িত। দক্ষিণ কাশিমপুর গ্রামে নিজের চার শতক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন রশিদ-আনোয়ারা জামে মসজিদ। এলাকার রাস্তা মেরামতেও সহযোগিতা করেন তিনি। গত বছর ৩০০ ফুট দীর্ঘ রশিদ মেমোরিয়াল সড়ক মেরামত করেছেন নিজ খরচে। অনেক সময় গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য দেন শিক্ষা সহায়তা। অর্থাভাবে কারও বিয়ে আটকে গেলে বাড়ান সহায়তার হাত। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে তার সংসার।
স্থানীয় বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত আনসার অ্যাডজুট্যান্ট সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘ডা. খুরশীদ আমাদের এলাকার গর্ব। তিনি যেভাবে ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছেন, তা এক কথায় অসাধারণ।’ সিরাজুল বললেন, ‘এলাকার দরিদ্র মানুষের সেবায় রশিদ-আনোয়ারা ফ্রি চিকিৎসাকেন্দ্র হতে পারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’
ফেনী শাহিন ক্লিনিকের নির্বাহী পরিচালক ফজলুল হকের ভাষ্য, ডা. খুরশীদ একজন মানবিক চিকিৎসক। অনেক রোগীকে তিনি নিজের পকেটের টাকায় বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য পাঠান। কারও কারও ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারেও সহায়তা করেন তিনি।



