স্মরণে শেখ ইসতিয়াক
অকালে ঝরে যাওয়া এক সুরেলা স্বপ্ন

শেখ ইসতিয়াক (জন্মতারিখ অজ্ঞাত সাল ১৯৬০— প্রয়াণ ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯)
আশির দশকের শেষদিক। বাংলা গানের আকাশে তখন নতুন নতুন তারার সমারোহ। সেই তারার মাঝে এমন এক শিল্পীর আবির্ভাব, যাঁর কণ্ঠ যেন স্বর্গ থেকে আসা—যে সুর শ্রোতাদের হৃদয়ের গহীনে পৌঁছে এক অদ্ভুত উন্মাদনার সঞ্চার করত। সেই মায়াবী কণ্ঠস্বরের অধিকারী শেখ ইসতিয়াক, যাঁকে শ্রোতারা ভালোবেসে ডাকতেন 'মেলোডি কিং' নামে। বাংলা আধুনিক সংগীতের ইতিহাসে এমন এক ধ্রুবতারা তিনি, যিনি অল্প সময়ের জন্য আমাদের মাঝে ছিলেন, কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু সুর ও গান, যা আজও শ্রোতাদের মনে বেজে ওঠে, তারা গুনগুন করে ওঠেন।
১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পীর সংগীতের প্রতি অনুরাগ ছিল আশৈশব। খুব অল্প বয়সেই ধ্রুপদী সংগীতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে ঝুঁকতে থাকেন আধুনিক গানের প্রতি। গানের পাশাপাশি গিটারেও দারুণ দখল আনতে শুরু করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৭৪ সালে, গড়ে তোলেন ব্যান্ডদল 'সন্ন্যাসী'। সেই সময় বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের জগৎ ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছিল। তরুণ শেখ ইসতিয়াক তাঁর অসাধারণ গিটার বাদন দক্ষতা ও মঞ্চ পরিবেশনার মাধ্যমে অল্প সময়েই সংগীতপ্রেমীদের নজর কাড়েন। বিভিন্ন মঞ্চে, হোটেলে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গান করতে থাকে 'সন্ন্যাসী', আর ধীরে ধীরে গিটারিস্ট হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন শেখ ইসতিয়াক।
তাঁর সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিলেন কিংবদন্তি সুরকার ও সংগীতশিল্পী লাকী আখন্দ। তাঁর সান্নিধ্যে শেখ ইসতিয়াকের সংগীতচর্চা আরও সমৃদ্ধ হয়। লাকী আখন্দ তাঁর গিটার প্রতিভার বিশেষ প্রশংসা করতেন। লাকী আখন্দের জনপ্রিয় গান 'এই নীল মণিহার'-এর সৃষ্টির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে শেখ ইসতিয়াকের নাম। ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার আজিমপুরে এই গানের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় শেখ ইসতিয়াক গিটারে একটি সুর তুলছিলেন। লাকী আখন্দ কিবোর্ডে সেই সুরকে আরও সমৃদ্ধ করেন এবং গীতিকার এস এম হেদায়েত সেই সুরের ওপর গানটির কথা রচনা করেন। এভাবেই সৃষ্টি হয় বাংলা সংগীতের এক স্মরণীয় গান, যেখানে শেখ ইসতিয়াকের গিটারবাদনের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৮৬ সাল শেখ ইসতিয়াকের সংগীতজীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ বছরই 'ওগো বিদেশিনী' চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে তিনি পেশাদার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। একই বছরে প্রখ্যাত সুরকার মাকসুদ জামিল মিন্টুর সুরে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম 'নন্দিতা'। অ্যালবামটি প্রকাশের পরপরই শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে এবং শেখ ইসতিয়াক রাতারাতি পরিচিত হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে।
'নন্দিতা' অ্যালবামের গানগুলোতে ছিল মেলোডির অপূর্ব সৌন্দর্য, হৃদয়ছোঁয়া কথা এবং শেখ ইসতিয়াকের মায়াবী কণ্ঠের অনন্য সমন্বয়। বিশেষ করে 'নীলাঞ্জনা' গানটি তাঁকে এনে দেয় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। গানটির সুর, আবেগ এবং তাঁর মিষ্টি কণ্ঠের পরিবেশনা শ্রোতাদের মাঝে এক নতুন অনুভূতির সৃষ্টি করে। অনেক শ্রোতাই তাঁর কণ্ঠে উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী কিশোর কুমারের গানের মতো এক ধরনের আবেগ ও মাধুর্যের ছোঁয়া খুঁজে পেতেন।
'নীলাঞ্জনা'র সেই অমর পঙক্তি আজও শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়— "নীলাঞ্জনা, ওই নীল নীল চোখে চেয়ে দেখো না,/ তোমার ওই দুটি চোখে আমি হারিয়ে গেছি/ আমি বোঝাতে তো কিছু পারিনা"। কিন্তু শেখ ইসতিয়াকের কণ্ঠের জাদু শুধু 'নীলাঞ্জনা'তেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর দরাজ ও অভিমানী কণ্ঠে একেকটি গান যেন হয়ে উঠেছিল নিস্তব্ধতা ভাঙার হাতিয়ার। প্রেমের আবেগ যেন বেদনাকেও হার মানায়, আর তাই আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে আর শেখ ইসতিয়াকের কণ্ঠে ফুটে ওঠে— "আমার মনের ফুলদানীতে/ রাখো তোমার মন/ সাজিয়ে দেব যতন করে/ ফুলেরও মতন"। এই গানটি আজও যখনই বেজে ওঠে, শ্রোতাদের মন যেন হারিয়ে যায় এক অজানা আবেগের জগতে। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ছিল এমন যে, তিনি যখন গাইতেন, তখন মনে হত সুরগুলো তাঁর কণ্ঠ থেকে নয়, বরং হৃদয় থেকে ঝরে পড়ছে।
তাঁর সংগীতজীবনে মোট সাতটি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিটি অ্যালবামেই তিনি মেলোডিনির্ভর গান, আবেগঘন সুর এবং শ্রুতিমধুর সংগীতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। 'নন্দিতা'র পর প্রকাশিত হয় 'টিপ টিপ বৃষ্টি', 'প্রজাপতির ডানায়', 'রূপালী চাঁদ'সহ আরও কয়েকটি অ্যালবাম। এর মধ্যে অন্যতম ছিল 'তুমি অভিমানী', যা তাঁর সংগীতজীবনের শেষ দিকের উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম। নিজের সুর ও সংগীতে তৈরি এই অ্যালবামেও শেখ ইসতিয়াক তাঁর চিরচেনা মেলোডির ধারা ধরে রেখেছিলেন।
শেখ ইসতিয়াকের গাওয়া গানগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ছিল 'টিপ টিপ বৃষ্টি'। এই গানটির কথা ও সুর আজও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে— "এলেই যদি কেন চলে যাবে/ এখনি, ও তুমি/ একটু পরে শুরু হবে টিপটিপ বৃষ্টি/ ভিজে যাবে তুমি"। এই গানটির প্রতিটি শব্দে যেন বৃষ্টির ছোঁয়া, যেন এক অমলিন ভালোবাসার গল্প। শেখ ইসতিয়াকের কণ্ঠে এই গানটি যখন বেজে ওঠে, তখন শ্রোতারা যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেন এক স্নিগ্ধ, শান্ত, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়। তাঁর আরেকটি অমর গান 'একদিন ঘুম ভেঙে দেখি'। এই গানটির কথাগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। জীবনের অনিশ্চয়তা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, আর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস—সবকিছু যেন ফুটে উঠেছিল এই গানটিতে।
শেখ ইসতিয়াকের কণ্ঠের আরেকটি বিশেষত্ব ছিল—তিনি কিশোর কুমারের গায়িকির প্রতি দুর্বল ছিলেন। তাঁর গায়িকিতে কিশোর কুমারের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যেত। লাকী আখন্দের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, শেখ ইসতিয়াক কিশোর কুমারের স্টাইলে গান করতেন, এমনকি 'হে হে হে' করার মতো অঙ্গভঙ্গিও অনুকরণ করতেন। লাকী আখন্দ তাঁকে বলেছিলেন, "ইসতিয়াক, তুমি অন্যকে নকল করা বাদ দাও।" কিন্তু তবুও শেখ ইসতিয়াকের কণ্ঠে কিশোর কুমারের সেই আবেগ ও মাধুর্যের ছোঁয়া শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাকী আখন্দ বলেছিলেন, "ইসতিয়াককেই আমি বেশি ভালোবাসতাম। তার অনেক গুণ ছিল, কিন্তু ইসতিয়াক আমার কথা শোনেনি। তারপরও ইসতিয়াকের ব্যাপারে আমার দুর্বলতা ছিল। কারণ, তার মা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, 'ইসতিয়াকের বাবা আসামে খুব ভালো গান করতেন। তুমি ওর প্রতি একটু খেয়াল রেখো।' তাকে বলেছিলাম, ঠিক আছে খালাম্মা, সে যদি আমার কথা শোনে, তাহলে অবশ্যই তার প্রতি খেয়াল রাখব, কিন্তু সে তো কথা শোনেনি।" লাকী আখন্দের এই স্মৃতিচারণে শেখ ইসতিয়াকের প্রতি তাঁর গভীর স্নেহ ও অভিমানের ছাপ স্পষ্ট। শেখ ইসতিয়াকের গিটার ছিল লাকী আখন্দের খুব পছন্দের। 'নীল মণিহার' গানে শেখ ইসতিয়াক গিটার বাজিয়েছিলেন, যা সেই গানটিকে দিয়েছিল এক ভিন্ন মাত্রা।
সাউন্ডটেকের কর্ণধার সুলতান মাহমুদ বাবুল শেখ ইসতিয়াকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, "এক সময়ের অসম্ভব জনপ্রিয় এই শিল্পী তার অ্যালবাম তার বাবা-মাকে উৎসর্গ করে যান, যা তিনি মৃত্যুর পূর্বেই আমাকে বলে যান। তিনি নিজের গানের ব্যাপারে সবসময় আশাবাদী ছিলেন। কখনো হতাশ হতেন না। আমাকে বলতেন, এবারের অ্যালবামে আরও ভালো গান করেছি। ইনশাআল্লাহ শ্রোতারা পছন্দ করবে। একদিন আমারই এক অনুষ্ঠানে আসার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন তিনি, উপহারও কিনেছিলেন। কিন্তু আসতে পারেননি। নিয়তি তাকে আমাদের থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে।" এই স্মৃতিচারণে শেখ ইসতিয়াকের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক ফুটে ওঠে—তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, হাসিখুশি ও আশাবাদী।
শেখ ইসতিয়াকের খুব কাছের মানুষ ছিলেন লাবু রহমান—ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহশিল্পী এবং সংগীতজীবনের অনেক স্মৃতির ভাগীদার। শেখ ইসতিয়াককে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো, তিনি বলছিলেন, "ইশতিয়াকের কথা বললে পরে বলতে হয় ও একজন ভালো বন্ধু। ও একজন ভালো মিউজিশিয়ান এবং একজন ভালো জেন্টলম্যান। এন্ড এজ এ গিটারিস্ট হি ওয়াজ অসাম। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ৮০ দশকের গোড়ার দিকে। স্টুডিওতে পরিচয় হলো, আর কয়েক সেকেন্ডেই আমরা গুড ফ্রেন্ডস হয়ে গেলাম। সম্পর্কটা আরো গভীরে গড়ালো ৮৬-৮৫ এ বাংলাদেশের প্রথম সাফ গেমসের সময়। সমর দাসের সাফ গেমসের দলে ইশতিয়াক ছিল, আমিও ছিলাম সমর দাসের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। ফাইনালি স্টেডিয়ামেও বাজিয়েছি। দ্যাট ওয়াজ ওয়ান্ডারফুল এক্সপেরিয়েন্স। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ইশতিয়াক চলে আসতো আমার বাসায়। একসাথে চলে যেতাম রেডিওতে। রেকর্ডিং থাকলে রেকর্ডিং করতাম, নইলে রুমি ভাইয়ের ক্যাটস আই-এ গিয়ে গান রেকর্ড করে নিয়ে আসতাম।
একদিন হঠাৎ ওর বাসায় ঢুকে দেখলাম উপরে কে যেন গান রেওয়াজ করছে। ইসতিয়াকের মাকে জিজ্ঞেস করলাম, খালাম্মা গান গায় কে? তিনি বললেন, ওই ঘরে ইসতিয়াক আছে, ওকে জিজ্ঞেস করো। আমি ঘরে ঢুকলাম, দেখলাম ইসতিয়াক তাড়াহুড়ো করে হারমোনিয়াম ঢুকাচ্ছে ভিতরে। অনেকটা সময় ধরে ওর কাছ থেকে গান শুনলাম। সে আমাকে 'নীলাঞ্জনা' শোনালো, আমি তো অভিভূত। তখনই বললাম, এই গানগুলি রেকর্ড করতে হবে। তখন মিন্টু ছিল আমাদের সাথে—মকসুদ জামিল মিন্টু। মিন্টুর একটা গান, ইমতিয়াজ বুলবুলের একটা গান, বাকিগুলো ইসতিয়াকের, রিন্টুর লেখা কিছু গান ছিল। এই গানগুলো আমরা রেকর্ড করলাম। বললাম, গান রেকর্ড করার আগে তোর পয়সা লাগবে না। তখন ঝংকার স্টুডিওতে সবাই মিলে ওর ছটা গান রেকর্ড করলাম—উইদাউট টেকিং এনি মানি। ওর গান করতে হবে, সোজা কথা। পরে গেলাম বাচ্চু ভাইয়ের বাসায়, বললাম আমার বন্ধুর গান খুব ভালো। উনি গান শুনে বললেন, তোমার রেকর্ডিং কালকেই। আনন্দমেলা অনুষ্ঠানে ওর গান রেকর্ড হলো, আর গান হিট হয়ে গেল।
পরবর্তীতে ইসতিয়াকের শোগুলোতে বাজানোর দায়িত্ব ছিল আমার। ওর সমস্ত গানই আমার বাজানো। রিয়েলি প্রাউড ফর হিম। তারপর বিয়ে করলো পুনমকে। এখন ও চ্যানেলে একটা অনুষ্ঠান করে, তার অনুষ্ঠানে আমি অনেক গিয়েছি ফর দা সেক অফ ইসতিয়াক। ইসতিয়াকের ও পুনমকে দেখলে ইসতিয়াকের কথা মনে হয়। তবে একটা ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন—ও একটা গান গাইতে খুব ভয় পেত। 'আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার' গানটা ইসতিয়াকের গাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সে সাহস হয় নাই। পরে হাদি ভাইকে দিয়ে গাওয়ানো হয়েছে। ও গানটা গাইলে হয়তো আরেকটু অন্যরকম হতো। ওর মৃত্যুটা খুব একটা ভালো মৃত্যু হয় নাই। খুব কষ্টের মৃত্যু। বাথরুমে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। মাথায় আঘাত পেয়ে। এটা খুবই কষ্টকর। পসিবলি আই ওয়্যার ওনলি ওয়ান হু ওয়াজ লাউডলি ক্রাইং। কারণ আমি ওকে খুবই ফিল করতাম। হি ওয়াজ এ গুড ফ্রেন্ড, গুড মিউজিশিয়ান। 'টিপ টিপ বৃষ্টি' গানটা করে সে আমার বাসায় এসে আমার বউকে বলতো, তোর নামে দিয়া একটা গান করছি শোন। আমার বউর নাম ছিল টিপ। গানটা শুনে আমার বউ বলছিল, গানটা কিন্তু হিট করবে। সত্যি সত্যি গানটা হিট হয়েছিল। আমি ওকে এখনো মিস করি, প্রতিদিনই মিস করি। আই কিপ হিম ইন মাই সোল, ইন মাই হার্ট, ইন মাই মাইন্ড অলওয়েজ। ব্লেস ফর হিম।"
লাবু রহমানের এই স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে—শেখ ইসতিয়াক কেবল একজন অসাধারণ শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত বন্ধু, একজন সহযোদ্ধা। লাবু রহমানের কণ্ঠে সেই স্মৃতির আবেগ আজও তাজা।
বিশিষ্ট গীতিকবি গোলাম মোর্শেদের স্মৃতিচারণ এসে সেই বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, "আমার ওনার সাথে পরিচয় ছিলো না। তবে তার গান খুব পছন্দ করতাম। সেই কারণে, যেদিন উনি মারা গেলেন, খুঁজে খুঁজে বিকেলে মোহাম্মদপুরের কোনো এক হাউজিং এ তার বাসায় চলে গেলাম। দেখলাম, ওনাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে নীচের খোলা জায়গায়। আরো দেখলাম, ফিডব্যাক এর লাবু রহমান বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। এই কান্নায় শামিল হলো গানের সব বিখ্যাত মানুষরা। গানের কারখানার এই তিনজন মিস্ত্রি যদি এক সাথে কাজ করতে পারতো, তাহলে 'নীলাঞ্জনা' এর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতো। মানুষ ভালবাসতে শিখতো। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখতো।"
১৯৯৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৩৯ বছর। প্রতিভাবান এই শিল্পীর অকাল মৃত্যু বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। নতুন প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয়, তখন শেখ ইসতিয়াকের নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে। কারণ তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা মেলোডি গানের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। জীবনের দৈর্ঘ্য নয়, সৃষ্টির গভীরতাই একজন শিল্পীকে অমর করে—শেখ ইসতিয়াক তারই উদাহরণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—নীলাঞ্জনা, আমার মনের ফুলদানিতে, টিপ টিপ বৃষ্টি, ভোরের শিশির, শোন আমি কি সেই, একদিন ঘুম ভেঙে দেখি, ভুল করে যদি ডাকো কোনোদিন, নন্দিতা তোমার কথা আমি, জোছনা রাতে মনটা আমার, ভেবেছি ভুলে যাব, এলেই যদি কেন চলে যাবে, রূপালী চাঁদ, প্রজাপতির ডানায়, দূরের আকাশ, হাতছানি দিয়ে, এ জীবন ভরা রাত—এই গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত।
কোনো এক নীরব সন্ধ্যায় যখন তাঁর গানের সুর ভেসে ওঠে, মনে হয়—মেলোডি কিং কোথাও হারিয়ে যাননি; তিনি আছেন তাঁর অমলিন সৃষ্টির মধ্যেই। তাঁর কণ্ঠের সেই সুরেলা ঢেউ আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে বয়ে চলেছে, আর বয়ে চলবে যুগের পর যুগ।









