শাবিপ্রবিতে ৬ পদের বিপরীতে ৬ গুণ শিক্ষক নিয়োগ
- বিগত প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

সংগৃহীত ছবি
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ছাড়পত্র দিয়েছিল ছয়টি পদের জন্য। বিপরীতে ৬ গুণ শিক্ষক নিয়োগ দেয় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বিগত প্রশাসন। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিমের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের আমলের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিভাগে ৩৭ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে ওই নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলছে বর্তমান প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিগত প্রশাসন বিভিন্ন সময় ৩৫টি পদের জন্য পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে বিজ্ঞাপিত পদের চেয়েও দুজন বেশি, অর্থাৎ মোট ৩৭ জন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর আগে সাবেক উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বাধীন বাছাই বোর্ড ১৯টি বিভাগে ৫৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। সিন্ডিকেট চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ৩৭ পদে নিয়োগের। এর মধ্যে ইউজিসির বাজেট প্রাপ্তিসাপেক্ষে শর্তসাপেক্ষে নিয়োগ দেওয়া হয় দুটি পদে, যার উল্লেখ বিজ্ঞাপনে ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী পদ শূন্য হলে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও, দুটি পদে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়— যা আইনবহির্ভূত বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। জানা গেছে, ইউজিসি কর্তৃক সমাজকর্ম, নৃবিজ্ঞান, বাংলা, লোকপ্রশাসন, ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি (এফইটি) এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমইই) বিভাগে মাত্র একটি করে ছয়টি পদের ছাড়পত্র ছিল। কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৌশল অবলম্বন করে সমাজকর্ম বিভাগে বিজ্ঞাপিত দুটি পদের বিপরীতে তিন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একটির বিপরীতে দুই, বাংলায় একটির বিপরীতে তিন এবং নৃবিজ্ঞানে একটির বিপরীতে দুজন শিক্ষক নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সিএসই বিভাগে তিন, সিইইতে তিন, ইইইতে তিন, এফইটিতে এক, পরিসংখ্যানে তিন, আইপিইতে দুই, বিএমবিতে দুই, জিইবিতে এক, সমাজবিজ্ঞানে এক, সিইপিতে চার, ইংরেজিতে এক, আর্কিটেকচারে এক এবং রসায়ন বিভাগে একজন প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। অন্যদিকে লোকপ্রশাসন বিভাগে একজন নিয়োগ পেলেও তিনি যোগ দেননি। ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে (এফইএস) তিনটি পদে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও এবং বোর্ড দ্বিগুণ সুপারিশ করা সত্ত্বেও চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন প্রশাসনের দুই শীর্ষ কর্তা একে অপরের ওপর দায় চাপান। তৎকালীন নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ও সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিম বললেন, ‘প্রশাসনের দায়িত্ব হলো বিজ্ঞপ্তি দেওয়া আর বাছাই বোর্ডের দায়িত্ব ছিল আমার। কয়টি পদ অনুমোদিত বা কতজন নেওয়া হবে, তা সম্পূর্ণ উপাচার্য ও প্রশাসনের বিষয়।’ ছয়টি পদের বিপরীতে ৩৭ জন নিয়োগের বিষয়ে তিনি বললেন, ‘এটা তো আমার পার্ট না। এটার উত্তর দেবে প্রশাসন। ইউজিসির ফাইনাল অনুমোদন পাওয়ার পরই এগুলো সিন্ডিকেটে উঠেছে। আর যা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সব মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে।’ অন্যদিকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বললেন, ‘প্রভাষক নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ছিলেন উপ-উপাচার্য, তিনি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন। সিন্ডিকেটে যেসব বিভাগে অতিরিক্ত প্রস্তাব ছিল তা আমরা বাদ দিয়েছি। তারপরও কিছু বিভাগের খুব সংকটের কারণে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার।’
তবে বিগত প্রশাসনের এই নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বললেন, ‘যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাতে ইউজিসির স্পষ্ট আপত্তি রয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি মোটেও যথাযথ ও স্বচ্ছ হয়নি। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে এখনো ফেরেননি এমন অনেককে অব্যাহতি দেখিয়ে তড়িঘড়ি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর আগেই নিয়োগ সম্পন্ন করার ঘটনা নির্দেশ করে, তৎকালীন নিয়োগে নিয়মের চরম লঙ্ঘন করা হয়েছে।’ সার্বিক বিষয়ে জানতে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি এসব বিষয় নথিপত্র ঘেঁটে দেখে বলতে পারবেন। পরে তিনি আর কিছু জানাননি।



