গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষুব্ধ মানুষ, নিরাপত্তাহীনতায় কর্মীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একদিকে গ্যাস সংকট, অন্যদিকে লোডশেডিং। গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেয়ে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মীরাও ভুগছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। সংস্থাটি ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে দেশ জুড়ে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে। গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিংয়ের ফলে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বিভিন্ন এলাকায়। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ও স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে আজ বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।
চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট ও তীব্র দাবদাহের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে গত কয়েকদিনে চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় বেড়ে গেছে লোডশেডিং। দৈনিক গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ফলে বিভিন্ন স্থানে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করছে। এতে সেখানকার কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।
আজ বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বঙ্গোপসাগর উত্তাল হওয়ার কারণে ভাসমান টাওয়ার সামিট থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে হঠাৎ করে আবার সংকট শুরু। সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সমস্যা সমাধানের জন্য।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে কারও হাত নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ বিকাল নাগাদ গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা কিছুটা কমবে। লোডশেডিং কমে আসবে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণে এই সংকট চলছে বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেকোনো সময় এই সংকটের মুখোমুখি হতে হতো দেশকে।
ভোগান্তির জন্য মানুষের কাছে আবার ক্ষমা চেয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
আজ বুধবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। এর আগে অবশ্য লোডশেডিং ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বর্তমানে দেশে ৫ কোটি ২০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহকই আরইবির। অর্থাৎ মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব সমিতির আওতায়। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। ফলে কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের গ্রাহকরা বিক্ষোভ, ভাঙচুর করছেন।
গত ১০ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে জামুর্কি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সাবস্টেশনে হামলা চালান বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। সেখানে আব্দুল লতিফ নামে এক লাইনম্যানকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পরদিন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেন। এর আগে গত ১ আগস্ট রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন।
একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে অসহনীয় লোডশেডিং ও বেশি বিলের অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এক মিটার রিডারকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারাও গ্রাহকদের রোষের মুখে পড়েন।
নেত্রকোনায় দিন-রাত মিলিয়ে কোনো কোনো এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে।
নীলফামারীর ডোমার জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় লিখিতভাবে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। সেখানে সাদা পোশাকে পুলিশি নজরদারি ও রাতে টহল বাড়ানো হয়েছে।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গোপালগঞ্জ এলাকায় কর্মরত কর্মীদের নিরাপত্তা চেয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি।
ফের কমেছে গ্যাস সরবরাহ
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস নিয়ে ভোগান্তি বেড়ে যায়। ১৫ দিন পর আংশিক চালুর পর গ্যাস সরবরাহ উন্নতি হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী একটি কার্গো সামিট পরিচালিত টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৪১ কোটি ঘনফুট। অথচ টার্মিনাল দুটির সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট।
এদিকে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে সাময়িক বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনালটির সক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট।
বৈরী আবহাওয়ায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গতকাল থেকে আবার বেড়েছে গ্যাস সংকট। বাসাবাড়ি থেকে সব খাতে এর প্রভাব পড়ছে। গতকাল রাত থেকেই সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পেয়ে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন মানুষ।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুরের একটি সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। হঠাৎ স্টেশনের কর্মীরা মাইকে ঘোষণা দেন—‘গ্যাসের চাপ নেই। দয়া করে আপনারা আর লাইনে দাঁড়াবেন না।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দীর্ঘদিনের এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সুযোগ আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমেই এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে হবে। অযোগ্য লোকদের সরিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক লোক বসাতে হবে।’
‘এই মুহূর্তে সংকট কাটাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো খুবই জরুরি। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করা যাবে। এতে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি,’ যোগ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে মুমূর্ষু রোগীর সঙ্গে তুলনা করে এই বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, ‘মন্ত্রণালয়ে এবং সরকারের আশপাশে যারা আছেন তারা ভুল বোঝানোর কারণে সরকার অন্ধকারে রয়েছে। এটা সরকারকে বুঝতে হবে। না হলে সংকট আরও বাড়বে।’
অপরদিকে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বললেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আমদানি করা এলএনজি দিয়ে সমাধান হবে না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক জোর দেওয়া খুবই জরুরি।’







