কনস্ট্রাকশন কোম্পানির আড়ালে চীনা-তাইওয়ানি চক্রের ‘সাইবার ফাঁদ’

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের সাগরপাড়ের রিসোর্ট। বাইরে পর্যটকদের স্বাভাবিক আনাগোনা। কিন্তু ভেতরে ছিল সারি সারি কম্পিউটার, মনিটর আর বিপুলসংখ্যক আইফোন। গোপনীয়তা রক্ষায় তৈরি করা হয়েছিল ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ। একটি বড় হলরুম পরিণত করা হয়েছিল কম্পিউটার ল্যাবে। কক্সবাজারে পর্যটনের আড়ালে এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯৩৮টি পুরনো মডেলের আইফোনসহ বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জাম উদ্ধারের পর চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য সামনে এসেছে।
পুলিশের অভিযোগ, কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথা বলে চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন একাধিক রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতারণার কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।
এ ঘটনায় ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পলাতক রয়েছেন আরও চারজন। পাশাপাশি ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রামু থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহারে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলা বিশেষ শাখার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা এবং উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লু রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পারে, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে এক চীনা নাগরিক গত এপ্রিল থেকে এসব রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের দাবি, তার প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তার সহযোগী হিসেবে পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।
অন্যদিকে উ ওয়েইপিং নিজেকে ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি জানান। তবে জেলা বিশেষ শাখার অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার পর চক্রটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভেতরের কাঠামো ও সাজসজ্জায় পরিবর্তন আনে। নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন জনবল নিয়োগ করে রিসোর্ট ব্যবস্থাপনাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় বলে পুলিশের অভিযোগ।
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে মেরিনা বিচ ভিলার বড় একটি হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব তৈরির তথ্য পায় পুলিশ। একই সঙ্গে সেখানে তৈরি করা হয় ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ।
প্রথম দফায় ২৫ আগস্ট ওই রিসোর্টে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের অনেকে পেছনের খোলা সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানায়। পরে হলরুমে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১ হাজার ৯৩৮টি পুরনো মডেলের আইফোন। এর সঙ্গে পাওয়া যায় ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি বহনযোগ্য কম্পিউটার, দুটি মুদ্রণযন্ত্র, ৪০টি মাউস, একটি বিদ্যুৎ সংরক্ষণ যন্ত্র ও ২৪টি সংযোগ বোর্ড।
এ ছাড়া জব্দ করা হয়েছে চীনের দুটি জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের একটি পদমর্যাদার ব্যাজ ও পুলিশ প্রতীকযুক্ত একটি টাই। পাওয়া গেছে গ্রামীণফোনের চারটি ও রবির একটি সিম কার্ড, ১৫টি নোটখাতা এবং একটি দিনলিপি। পুলিশের তত্ত্বাবধানে জব্দ করা সরঞ্জামগুলো বর্তমানে রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপকের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
অভিযানের পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। ২৬ আগস্ট ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মেরিনা বিচ ভিলা পরিদর্শন করে। তারা কম্পিউটার ল্যাব, শব্দরোধী কক্ষ, আইফোনসহ বিদেশি নাগরিকদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন।
পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মৌখিকভাবে মত দেন যে সেখানে অবস্থানকারী চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকরা প্রতারণা ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এর দুই দিন পর ২৮ আগস্ট পুলিশের অপরাধ তদন্তের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসির উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে।
পুলিশের এজাহারে উদ্ধৃত সিটিটিসির মতামত অনুযায়ী, চক্রটি কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন দেখানো, নকল বা ভুয়া বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা নেওয়া, ‘এক্সিট ফ্রড’ এবং অর্থ আত্মসাতের মতো অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তবে এসব কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ধরন নিশ্চিত করতে জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছে সিটিটিসি।
মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযানের পর কয়েকজন বিদেশি নাগরিক কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পায় পুলিশ। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কলাতলীর দুটি হোটেলে অভিযান চালানো হয়।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় পরিচালিত এসব অভিযানে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ছয়টি মুঠোফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট ও তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, উ চিয়ানশিয়ং ও ঝাং ঝেমিং। পলাতক চারজন হলেন ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, উ জিপিং ও জিয়ান ঝাং।
পুলিশের অভিযোগ, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি সংশ্লিষ্ট জেলা বিশেষ শাখায় দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব রিসোর্টে অবস্থানকারী চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের বিষয়ে এমন কপি জমা দেওয়া হয়নি। বিদেশি নাগরিকদের রিসোর্ট ভাড়া দেওয়ার তথ্যও মালিকপক্ষ জেলা বিশেষ শাখাকে জানায়নি বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
তারা কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন, রিসোর্টের ভেতরে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন এবং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার দাবির পক্ষে বৈধ কাগজপত্র কোথায়, এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একে ফজলুল হক।
ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য এখন ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন ঘিরে। এত বিপুলসংখ্যক পুরনো মডেলের ফোন এক জায়গায় কেন রাখা হয়েছিল, কম্পিউটার ও মনিটরগুলো দিয়ে কী কাজ করা হতো, ছয়টি শব্দরোধী কক্ষের প্রয়োজনই বা কেন হয়েছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্টে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক অবস্থান করছিলেন। তাদের সবাই কথিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কি না, নাকি তাদের একটি অংশকে ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হচ্ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, রামু থানায় করা অভিযোগের সূত্র এবং ঢাকা থেকে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ ও অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। শুক্রবার বিকালে আটক ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।





