ইরানে বিয়েবাড়িতে প্রাণঘাতী হামলাটি সরাসরি মার্কিন অস্ত্রের আঘাত

ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ ইরানের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গত মঙ্গলবার ভয়াবহ বিস্ফোরণে চারজন নিহত এবং অন্তত ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ওই হামলার ছবি ও ভিডিও যাচাই করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বার্তা সংস্থাটির যাচাই করা চিত্রগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি অস্ত্রের সরাসরি আঘাতের ফল। অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে লেগে ছিটকে আসা আঘাত নয়।
কুহেস্তাক নামক ছোট শহরের এই ঘটনাটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি নিয়ে আবারও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে একটি ইরানি বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অনেক শিশু ও শিক্ষক মারা যান। ওই ঘটনার পর বিয়েবাড়ির হামলাটিই সবচেয়ে মর্মান্তিক।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছিল, তাদের বাহিনী ১ সেপ্টেম্বর ইরানের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল আইআরজিসির বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার সিস্টেম এবং যোগাযোগ স্থাপনা। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় তেহরানের আগের হামলার জবাবে তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার ঘটনাটি তদন্ত করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এটি তদন্ত করছি, কারণ অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে সচেতন। আমরা প্রকৃত সত্যটি জানতে চাই।’
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনগুলো সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়টার্সকে জানিয়েছে, হামলার রাতে কুহেস্তাকের একটি বাড়িতে বিয়ে উপলক্ষে অনেক মানুষ এসেছিলেন। যাচাইকৃত এবং বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচিত ছবি ও ভিডিও অনুযায়ী, অনুষ্ঠান চলাকালেই বাড়িটির ছাদে সরাসরি আঘাত হানে একটি বোমা।
রয়টার্স এই ঘটনার ভিডিও এবং ছবি অন্তত চারজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে দেখিয়েছে। তারা জানান, ক্ষতির মাত্রা দেখে মনে হচ্ছে এটি ছিল সরাসরি হামলা। অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তু থেকে ছিটকে আসা দুর্ঘটনা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তিনজন বলেছেন, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি কোনো ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং একটি সম্ভাব্য মার্কিন অস্ত্র।
এক বিশেষজ্ঞ বলেন, অস্ত্রটি হয়তো তার মূল টার্গেট থেকে সরে এসে এখানে আঘাত করেছে। সাবেক ব্রিটিশ আর্মি ব্রিগেডিয়ার এবং বিস্ফোরক প্রকৌশলে ডক্টরেটধারী গ্যারেথ কলেটের মতে, ‘যে পরিমাণ বোমা ফেলা হয়েছে, তাতে বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত গাইডেন্স সিস্টেম থাকলেও এই ধরনের ভুল হতে পারে।’
ছবিগুলোতে দেখা যায়, হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে রক্তাক্ত জুতো এবং দক্ষিণ ইরানের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের নানা সাজসজ্জা।
হামলার পরপরই রয়টার্সকে পাঠানো এক ভয়েস নোটে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘কুহেস্তাক ধ্বংস হয়ে গেছে। চার, পাঁচ, দশটা বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক মানুষ চাপা পড়ে আছে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী ১ সেপ্টেম্বর কুহেস্তাক এলাকায় হামলা চালিয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল শহরের টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার।
স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানের স্থান থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে অবস্থিত। ইরানি মিডিয়ার তথ্যমতে, রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ টাওয়ারটিতে আঘাত হানা হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিয়েবাড়ির হতাহতের পেছনের বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সরকার। এর মধ্যে মার্কিন হামলা, ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ছিটকে আসা অংশ, নাকি লক্ষ্যভ্রষ্ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র— সব কিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘বেলুচিস্তান হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন নেটওয়ার্ক’ এবং ‘হালভশ’ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত চারজন নিহত ও ৬৮ জন আহত হয়েছে। নিহত চারজনের মধ্যে তিনজনই ছিলেন বিয়ের অতিথি। তারা যথাক্রমে কলসুম মোল্লাহি নাজানদানিয়া (৪৩), জারখাতুন তাহেরি (৫০) এবং চার বছরের শিশু আমির মোহাম্মদ। চতুর্থ ব্যক্তি ১৬ বছরের কিশোর মোহাম্মদ মোল্লাহি। সে কমিউনিকেশন টাওয়ারটির কাছাকাছি মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিহত হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যমেও এই নামগুলো নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হন। সেই ঘটনার ছয় মাস পেরোতেই নতুন দুর্ঘটনাটি ঘটল। সাম্প্রতিক দশকে মার্কিন বাহিনীর সবেচেয়ে নৃশংস হামলা এগুলো। এতে অসংখ্য বেসামরিক হতাহত হয়েছে। তবে এসবের তদন্ত প্রতিবেদন পেন্টাগন এখনো প্রকাশ্য করেনি।
গত ৫ মার্চ রয়টার্স প্রথম ফাঁস করে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে মিনাবে হামলার পেছনে মার্কিন বাহিনীই দায়ী।







