মাছ সংকটের পর লোডশেডিং, ক্ষতির মুখে খুলনার ব্যবসায়ীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাছ সংকটসহ নানা প্রতিকূলতায় এমনিতেই বিপর্যস্ত হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাত। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র লোডশেডিং। ২৪ ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে প্রায় ৭ ঘণ্টা। এতে খুলনা অঞ্চলে ৪০টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। বিদ্যুৎ সংকটে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে ফ্রোজেন স্টোরে সংরক্ষিত বিপুল মূল্যের মাছ। এ ছাড়া দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং সামলাতে গিয়ে বিকল হচ্ছে জেনারেটর। বেশি দামে ডিজেল কিনে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ও। বাড়তি ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা কঠিন হচ্ছে পণ্য। টানা এ ধকল সামলাতে না পেরে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঝুঁকিতে রয়েছে এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত চিংড়িচাষি, মৎস্যজীবী, কারখানার শ্রমিকসহ লাখো মানুষের জীবিকা।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ দেশের শতভাগ কৃষিভিত্তিক অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাত। চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানির এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। প্রতি বছর খাতটি থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়, যার ৮০ শতাংশই খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট— এই চারটি জেলায় অবস্থিত ৪০টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মাধ্যমে রপ্তানি হয়। তবে এ শিল্পের কাঁচামাল পচনশীল হওয়ায় কাঁচামালের গুণগত মান রক্ষা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ এবং রপ্তানির প্রতিটি ধাপই বিদ্যুৎ-নির্ভর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কারখানাগুলোর উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গুরুতর ব্যাহত হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে এটলাস সি ফুড লিমিটেডের ম্যানেজার নির্মল কান্তি পাল আগামীর সময়কে বলেছেন, সংরক্ষিত চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের মান ধরে রাখতে সবসময়ই হিমাগার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালু রাখতে হয়। এ কারণে কারখানায় ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে হিমাগারের প্লেট ফ্রিজারে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একটি প্লেট ফ্রিজারে মাছ প্রক্রিয়াজাত করতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। লোডশেডিংয়ের কারণে এ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটলে একই কাজ শেষ করতে দ্বিগুণ সময় লাগছে।
তিনি আরও বললেন, ‘বিকল্প উপায়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে ডিজেল ক্রয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়ও। কারণ জেনারেটর চালু রাখলে প্রতি ঘণ্টায় তাদের ৪০ লিটার ডিজেল লাগে। অর্থাৎ ৭ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে ২৮০ লিটার ডিজেল খরচ হয়, যার মূল্য কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এই বাড়তি খরচ রপ্তানি ব্যয়ে যুক্ত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায়।’
আছিয়া সি ফুড লিমিটেডের মালিক তরিকুল ইসলাম জহির বলেছেন, হিমাগারে কোটি কোটি টাকার মাছ মজুদ থাকে। কারখানায় উৎপাদিত পণ্য মাইনাস ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখতে হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে পণ্যে ঝুঁকি তৈরি হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে হিমাগারে নির্ধারিত তাপমাত্রা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে। তখন হিমাগার খোলাও যায় না। বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হয়। কিন্তু জেনারেটরের মাধ্যমে একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ এতে অতিরিক্ত ডিজেল খরচ হচ্ছে। বাড়তি এ ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পণ্য মার খাচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ কামরুল আলম। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায় ৭ ঘণ্টা কারখানা চলছে জেনারেটরে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে জেনারেটরের ওপর প্রচণ্ড চাপও পড়ছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে পারে। তখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কোটি কোটি টাকা লোকসানে পড়বে।
শেখ কামরুল আলম বললেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কারখানাগুলোয় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এখনই ধকল সামলাতে না পেরে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হচ্ছে। ফলে এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত চিংড়িচাষি, মৎস্যজীবী, কারখানার শ্রমিকসহ লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাই হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতকে সচল রাখতে শিল্পাঞ্চলগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি তার।





