বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা এনে দেয় মেরিন একাডেমি
- ৬৪ বছরে ৬ হাজার নাবিক তৈরি
- ‘হোয়াইট লিস্টেড’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
- দক্ষ নাবিকের মাসিক বেতন ২৫ লাখ টাকা

ছবি: আগামীর সময়
কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে ভোরের আলো ফুটতেই প্যারেড গ্রাউন্ড কেঁপে ওঠে শৃঙ্খলিত বুটের শব্দে। না, কোনো ক্যান্টনমেন্ট নয়। দূর থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প মনে করে ভুলও করতে পারেন কেউ কেউ। আর এ ভুল ভাঙবে ভেতরে ঢুকলেই!
এটি আসলে মহাসাগর দাপিয়ে বেড়ানো আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের বিশাল জাহাজ পরিচালনার কারিগর তৈরির এক অনন্য পাঠশালা। আটলান্টিকের বরফশীতল ঢেউ থেকে শুরু করে সুয়েজ কিংবা পানামা খাল— বিশ্বের মেগা জাহাজগুলোর স্টিয়ারিং যেসব দক্ষ হাতে বিশ্ববাণিজ্য সচল রাখছে প্রতিদিন, তাদের অনেকেরই শিক্ষা ও দীক্ষা এই চত্বর থেকে। সমুদ্রজয়ের ছয় হাজার দক্ষ নাবিক গড়ার কারিগর বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। বিশ্বমানের মেরিনার গড়ার এক বাতিঘর হয়েই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান।
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় ১৯৬২ সালে যাত্রা করে ১০০ একর জায়গায় গড়ে তোলা হয় ‘বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। ৬৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সমুদ্রযাত্রার নাবিক তৈরি করেনি, গড়ে তুলেছে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব আর প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বলীয়ান আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ। সামরিক আদলে কঠোর নিয়মে পরিচালিত এই একাডেমিতে নটিক্যাল বিজ্ঞান পড়ে হয় জাহাজের ক্যাপ্টেন। আর ইঞ্জিনিয়ারিং শেখানো হয় জাহাজের চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার গড়তে।
আনোয়ারা উপজেলার সবুজ-শ্যামল নিভৃত এলাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (আইএমও) স্বীকৃত ‘হোয়াইট লিস্টেড’ প্রতিষ্ঠান। সুইডেনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ‘শাখা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট অব মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ এবং ‘দ্য নটিক্যাল ইনস্টিটিউট’ যৌথভাবে বিশ্বের প্রথম একাডেমি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সার্টিফিকেট অব এক্সিলেন্স’ খেতাব দিয়েছে মেরিন একাডেমিকে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম সেফটি অথরিটি, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি (এমসিএ) এবং সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ মেরিন একাডেমির প্রাক-সমুদ্র প্রশিক্ষণকে তাদের সমমানের স্বীকৃতি দিয়েছে আগেই। বিশ্বমানের নটিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেটর, আন্তর্জাতিক মানসম্মত আইএমও মডেল কোর্স এবং আন্তর্জাতিক অডিটে নিয়মিত উত্তীর্ণ হওয়ার সক্ষমতাই এই একাডেমিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা মেরিটাইম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এ রকম উচ্চমাত্রার ‘ব্র্যান্ডভ্যালু’ একাডেমি শিক্ষার্থীদের অনায়াসে চাকরি নিশ্চিত করে।
একাডেমি থেকে পাস করা ক্যাডেটদের গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত উঁচু মানের বলেও স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থার; যেটাকে বলে ‘টায়ার-১’। ফিলিপাইন, ভারত ও চীন মিলে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মেরিনার (নাবিক ও অফিসার) সরবরাহ দেয়। এই তিন দেশের সমমানের নাবিক তৈরি করে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি।
শতভাগ ইংরেজি মাধ্যমে সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ, আধুনিক জাহাজের স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিন রুম পরিচালনা, ইলেকট্রনিক চার্ট ডিসপ্লে অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ ও ইঞ্জিন সিমুলেটরের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ অন্য দেশের তুলনায় এই একাডেমির ক্যাডেটদের এগিয়ে রেখেছে।
তবে কিছু অবকাঠামো সুবিধা, অভিজ্ঞ শিক্ষক, ভিসা জটিলতার সমাধান এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাত ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখতে পারবে। এমন মত দিয়ে মেরিন একাডেমির প্রধান, অর্থাৎ কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম বললেন, ‘বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে সিলেবাসের বাইরেও অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ডিকার্বনাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন ও সাইবার সিকিউরিটি অন্তর্ভুক্ত করেছি। শিপিংয়ে চীনের বিশাল বাজার ধরে ক্যাডেটদের সক্ষমতা বাড়াতে শনিবারের ছুটি বাতিল করে মৌলিক চায়নিজ ভাষা প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। একাডেমির ব্র্যান্ডভ্যালু বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন, বন্দর অপারেটরদের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমে এই খাতের বিশাল সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।’
বিশ্বের শীর্ষ শিপিং লাইন এমএসসি, মায়েরর্স্ক লাইন, সিএমএ সিজিএম, হ্যাপাগ-লয়েড, এনওয়াইকে এবং এভারগ্রিনের মতো জাহাজ পরিচালনাকারীদের কনটেইনার ও খোলা পণ্যবাহী বড় জাহাজ চালাচ্ছেন বাংলাদেশি মাস্টার মেরিনার এবং চিফ ইঞ্জিনিয়াররা। বিশ্ব জুড়ে অন্তত দেড় হাজার বাণিজ্যিক জাহাজে এক মহাসাগর থেকে আরেক মহাসাগরে দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং চালাচ্ছে বাংলাদেশের চৌকস মেরিনাররা। শুধু জাহাজ চালানোতেই সীমাবদ্ধ নয়, ডেনমার্ক, দুবাই ও সিঙ্গাপুরের বড় বন্দর ব্যবস্থাপনা, লন্ডনের শিপ ব্রেকিং ফার্ম, ইউকে মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি, বারমুডার অফশোর রিগ এবং আইএমওর নীতিনির্ধারণী দপ্তরেও শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছে মেরিন একাডেমির অ্যালামনাই। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ফোরামে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য একাধিক বাংলাদেশি মেরিনার ‘আইএমও ব্র্যাভারি অ্যাওয়ার্ড’সহ বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। জাহাজে কাজ করা ছাড়াও অভিজ্ঞ সিনিয়র মেরিনার দেশের নৌপরিবহন অধিদপ্তর, সমুদ্রবন্দর, বেসরকারি খাতের লজিস্টিকস, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং সেক্টরে প্রধান নির্বাহী বা কনসালট্যান্ট হিসেবে বড় অঙ্কের বেতনে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন কনটেইনার জাহাজ মালিক এবং চার্টার অপারেটর ‘সি স্প্যান করপোরেশন’ কাজ করেন মেরিন একাডেমির ৫০ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব। ‘কসকো থাইল্যান্ড’ কনটেইনারবাহী জাহাজ চালিয়ে আলাস্কা থেকে সাংহাই যাওয়ার সময় সেকেন্ড অফিসার আগামীর সময়কে জানালেন, ‘একাডেমির ক্যাডেটরা যে দক্ষ চৌকস সাহসী সেই ব্র্যান্ডভ্যালু এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। সুনাম ছড়িয়েছেন অ্যালামনাইরা। এখন সময় সেই ভ্যালুকে কাজে লাগিয়ে মাইলস্টোন গড়া।’
তিন বছর মেয়াদের প্রশিক্ষণে প্রত্যেক ক্যাডেটের জন্য গড়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে মেরিন একাডেমি। তবে এই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তি অভাবনীয় ও অকল্পনীয়। প্রশিক্ষণ শেষ করে জুনিয়র অফিসার বা চতুর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মাসে আড়াই থেকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা) দিয়ে চাকরি শুরু করেন তারা। ১২ বছরের ব্যবধানে ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হলে মাসিক বেতন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি ১২ থেকে ১৮ লাখ টাকা। গ্যাস-তেলবাহী ট্যাংকারে চাকরি করলে মাসে বেতন ২০ হাজার ডলারের (২৫ লাখ টাকা) বেশি।
কম বিনিয়োগে নিশ্চিত চাকরি ও বেশি রিটার্ন পেতে বাংলাদেশে এর চেয়ে ভালো চাকরি আর নেই বলছেন বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের সেকেন্ড অফিসার প্রণয় সেন।
রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকেও বেশ এগিয়ে বাংলাদেশি মেরিনাররা। সাধারণ প্রবাসী কর্মীদের তুলনায় একজন মেরিনার প্রায় ১০ গুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনেন। শতভাগ বৈধ চ্যানেলে বছরে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার (১ ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে) রেমিট্যান্স পাঠান তারা। মেরিনার সংখ্যা যত বাড়বে, এই রেমিট্যান্সও লাফাবে।
১২ ব্যাচের শিক্ষার্থী বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী আক্ষেপ করে বললেন, ‘কম বিনিয়োগে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই পেশাকে সফল করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জরুরি। ফিলিপাইন ভারতীয় মেরিনার বিশ্ব জুড়ে দ্রুত ভিসা সুবিধা পেয়ে সুযোগ লুফে নিচ্ছে। আমরা যথাযথভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি না।’
বর্তমানে দেশীয় পতাকাবাহী ১০৮ বাণিজ্যিক জাহাজে প্রায় সবাই বাংলাদেশি মাস্টার মেরিনার ও প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটে নিজেদের জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই খাতকে সাজানোর সময় এখন।
জাহাজে বড় অঙ্কের বেতন, মহাদেশ থেকে মহাদেশ, এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে ঘোরার রোমাঞ্চকর যাত্রা দেখা এবং একেবারে কম সময়ে বড় আয়ের সুযোগ— এই তিন কারণেই মেরিনার হতে চান তরুণরা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭০০ মেরিনার তৈরি হয়। এর মধ্যে এখান থেকে বের হন ১৬০ জন। বাকি ৫৪০ জন আসেন দেশের অন্য সাতটি একাডেমি থেকে। এই সাতটির মধ্যে তিনটি বেসরকারি। এসএসসির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারেন এসব প্রতিষ্ঠানে। তিন হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে লিখিত, মৌখিক ও কায়িক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত হয় ৭০০। এর মধ্যে মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা ১৬০ জন ভর্তির সুযোগ পান।
গল্পের এখানেই শেষ নয়, আরও কীর্তিগাথা আছে। ২০১২ সাল থেকে ছেলেদের সঙ্গে মেয়ে ক্যাডেটরাও সমুদ্রযাত্রায় গৌরবময় অংশীদার হতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতি ব্যাচে ২০ জন মেয়ে ক্যাডেট বের হচ্ছেন মেরিনারের সার্টিফিকেট নিয়ে। ঝুঁকি মোকাবিলার অসীম সাহস নিয়ে সারা বিশ্বের উত্তাল সাগরের ঢেউ জয় করার সঙ্গে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের হাতছানি এই পেশায়। সঙ্গে বিশ্বের নামকরা সব প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিও যোগ হয় এতে। এমন গৌরবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি’ এখন স্বগৌরবেই দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ও কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে। এ যেন বাংলাদেশের অনন্য অহংকার।
সবুজ-শ্যামল, ছায়া-সুনিবিড়, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই ক্যাম্পাস অর্থনীতির দুয়ার যেমন খুলে দিচ্ছে, তেমনি বিপুল সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখাচ্ছে তরুণদের এই ক্যাম্পাস। সব মিলিয়ে এমন এক ভাবনা তাড়িত করায় স্বাভাবিক, যা জনপ্রিয় গায়িকা সাবিনা ইয়াসমীনের কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের লিরিকসের মতোই—‘সুন্দর, সুবর্ণ, তারুণ্য, লাবণ্য/অপূর্ব রূপসী, রূপেতে অনন্য’!





