দুর্নীতির দুষ্টচক্র
শুল্ক ফাঁকি দিতে সাবেক এমপির কত কাণ্ড
- ময়মনসিংহের সাবেক এমপি ফখরুল ইমামের বড় জালিয়াতি
- সার্ভারে ব্র্যান্ডের নাম ‘ল্যান্ড ক্রুজার’-এর বদলে ‘অ্যাভেঞ্জা’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আইনের ফাঁক নয়, সরাসরি আইন ভেঙেই চলে লুটপাট। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা— সবাই যখন এক সুতোয় গাঁথেন দুর্নীতির জাল, তখন রাষ্ট্রের খাতায় জমে শুধু লোকসানের খতিয়ান। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কেনা গাড়ি নিয়ে ঘটেছে তেমনই বড় এক জালিয়াতি। যেখানে ক্ষমতার দাপট আর ঘুষের বিনিময়ে গায়েব হয়েছে সরকারের কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব।
টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ভিএক্স-আর ২০২০ মডেলের (ডিজেলচালিত) একটি গাড়ির বাজারদর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। আগে শুল্কমুক্ত কোটায় সংসদ সদস্যরা (এমপি) মাত্র দেড় কোটি টাকায় সুযোগ পেতেন এই গাড়ি কেনার। তবে কেনার পর বিক্রি বা মালিকানা হস্তান্তর করতে চাইলে বিধান রয়েছে নির্ধারিত হারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) শুল্ক পরিশোধ করার। কিন্তু আইন ভেঙে শুল্কমুক্ত কোটায় কেনা গাড়ি ২ কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ফখরুল ইমাম।
এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় সোয়া তিন কোটি টাকা। আর জালিয়াতির মাধ্যমে গাড়িটির মালিকানা হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) অসৎ কর্মকর্তারা পকেটে ভরেছেন ৩২ লাখ টাকার বেশি।
এখানেই শেষ নয়, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গাড়ি কিনতে ক্রেতা নাবিল পরিবহনের মালিক সফিকুল ইসলামকে ঋণ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স। ফলে মালিকানার নথিতে (রেজিস্ট্রেশন) নাম রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের। একটি গাড়ি বিক্রি ঘিরে দুর্নীতির দুষ্ট চক্রের নানামুখী কারসাজির এ তথ্য উঠে এসেছে আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমামের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একই নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠিয়ে কথা বলার সময় চাইলেও সাড়া দেননি। একইভাবে গাড়িটির ক্রেতা সফিকুল ইসলামও এ প্রতিবেদকের কল রিসিভ করেননি। জবাব দেননি খুদে বার্তারও।
ফখরুল ইমাম ময়মনসিংহ-৮ আসন থেকে চতুর্থ, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি শুল্কমুক্ত কোটায় টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ভিএক্স-আর মডেলের জিপটি কেনেন। ২০২০ সালের ২৪ জুন গাড়িটি তার নামে রেজিস্ট্রেশন (নাম্বার-ঢাকা মেট্রো ঘ ১৮-৭১৬৮) করা হয়। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্য বলছে, ওই বছরের ১ জুন ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় কেনা গাড়িটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিনা শুল্কে খালাস করা হয়।
মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের নথি বলছে, লাল রঙের গাড়িটির ইঞ্জিন নাম্বার-আইভিডি০৫৩১২৯৩, চ্যাসিস নাম্বার-জেটিএমএইচভি০২জে৪০৪৩০৫৩৫৭। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি গাড়িটির মালিকানা হস্তান্তর করা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন পরই এটির মালিকানা পরিবর্তন হয়। ১০৬, গুলশান অ্যাভিনিউ, হুসনা সেন্টারের (চতুর্থতলা) বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম গাড়িটি কিনেছেন। এনবিআরের শুল্ক পরিশোধ না করেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে গাড়িটি বিক্রি ও মালিকানা হস্তান্তর করা হয়েছে। অবৈধ প্রক্রিয়ায় এই গাড়ি কিনতে সফিকুল ইসলামকে মোটা টাকা ঋণ দিয়েছে আইপিডিসি ফাইন্যান্স। ফলে গাড়ির মালিকানার ঘরে প্রতিষ্ঠানটির নামও রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, প্রকৃত তথ্য গোপন করতে গাড়ির মালিকানা হস্তান্তরের সময় বিআরটিএর সার্ভারে গাড়ির ইঞ্জিন, চ্যাসিস ও আনুষঙ্গিক তথ্য ঠিক রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে, যাতে এটা শুল্কমুক্ত কোটার গাড়ি বলে মনে না হয়। যেমন— রেজিস্ট্রেশনের সময় গাড়িটির শ্রেণি বা ব্র্যান্ড টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ভিএক্স-আর উল্লেখ ছিল। রঙ ছিল ডিকে লাল। কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরের দলিলে গাড়িটির শ্রেণির স্থলে প্রাইভেট পাস (জিপ/স্টেশন ওয়াগান) এবং ব্র্যান্ডের ঘরে অ্যাভেঞ্জা উল্লেখ করা হয়েছে। আর রঙ উল্লেখ করা হয়েছে সাদা।
অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক আফজাল হোসেন, সহকারী পরিচালক রিয়াজুল ইসলাম ও দালাল চক্র এ কাজে জড়িত। সরকারের প্রায় সোয়া তিন কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ ও গাড়িটির মালিকানা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে দিয়ে চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে ৩২ লাখ টাকার বেশি।
জানা গেছে, ২০২০ সালের অক্টোবরে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা গাড়ি বিক্রি ও হস্তান্তরে নতুন শর্ত দিয়ে আদেশ জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, আমদানি করা গাড়ি বন্দর থেকে খালাসের পরবর্তী পাঁচ বছর বিক্রি করা যাবে না। এরপর বিক্রি করলে অবচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হারে শুল্ককর পরিশোধ করতে হবে। ইনভয়েজ মূল্যের ওপর অবচয় হারের ভিত্তিতে বছর গণনার ক্ষেত্রে প্রথম রেজিস্ট্রেশনের তারিখ থেকে ন্যূনতম এক বছর অতিক্রম করতে হবে। এরপর প্রথম বছরের জন্য ১০, দ্বিতীয় বছর ২০, তৃতীয় বছর ৩০, চতুর্থ বছর ৪০, পঞ্চম বছর ৫০, ষষ্ঠ বছর ৬০, সপ্তম বছর ৭০ এবং অষ্টম বা তার বেশি বয়সের গাড়ির জন্য ৮০ শতাংশ অবচয় হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।
এ হিসাবে ফখরুল ইমামকে গাড়ি বিক্রি বা মালিকানা হস্তান্তরের আগে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা শুল্ককর পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু তিনি ১ টাকাও শুল্ককর দেননি, যা রীতিমতো অপরাধ— বললেন এনবিআরের এক কর্মকর্তা। এ ছাড়া এই গাড়ির রেজিস্ট্রেশন হস্তান্তর বা বিক্রির ক্ষেত্রে স্পিকারের কাছ থেকে সম্মতিপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট শুল্ক ভবনে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা পালন করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বর্তমান সরকার গত এপ্রিলে ‘দ্য মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্স) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬ পাস করে সংসদ সদস্যদের দীর্ঘদিনের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করেছে। ১৯৭৩ সালের যে আদেশের বলে এমপিরা শুল্ক, ভ্যাট, ডেভেলপমেন্ট সারচার্জ ও আমদানি ফি ছাড়া একটি গাড়ি আমদানির অধিকার পেতেন, সে ধারাটি বাতিল করা হয়েছে। কোনো সংসদ সদস্য পাঁচ বছর আগের গাড়ি বিক্রি ও মালিকানা পরিবর্তন করতে চাইলেও এনবিআরের আদেশ মেনে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।





