৪৩ সীমান্ত পথে ঢুকছে মাদক
- রংপুর বিভাগের আট জেলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভারত সীমান্তবর্তী রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় মাদকের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মাদক। রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের অন্তত ৪৩টি রুট ব্যবহার করে দেশে মাদক ঢুকছে। সীমান্ত দিয়ে এসব জেলায় গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইনসহ নেশাজাতীয় ইনজেকশন ঢুকছে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যে জানা গেছে।
আর রংপুরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার হচ্ছে এসব মাদক। রংপুর নগরীর কেডিসি, কেরানীপাড়া, নূরপুর, মহাদেবপুর, গোমস্তাপাড়া, আলমনগর কলোনি, সেন্ট্রাল রোড, শালবন মিস্ত্রিপাড়া, শাপলা চত্বর চামড়াপট্টি, জুম্মাপাড়া, বাবুখাঁ, আমাশু কুকরুল, দর্শনা রেলগেট, আলমনগর বাবুপাড়া ছাড়াও হারাগাছ, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় আলোচিত চার খুনের ঘটনার আগে আরও দুটি হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে মাদক কারবার, অধিপত্য ও বিরোধের জের।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি মাছুয়াপাড়াসংলগ্ন তাঁতীপাড়ায় খুন হন অটোরিকশাচালক আমিনুল ইসলাম। গাঁজা কাটার চাকুর আঘাতে বিজয় মোহান্ত নামে এক মাদকাসক্ত তাকে খুন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ১০ এপ্রিল মাছুয়াপাড়ায় পূর্ববিরোধের জেরে রাকিব হাসান নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে রাকিবকে খুন করা হয়। এসব ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ২২ আগস্ট নিজ বাড়িতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন তারা।
ভৌগোলিক অবস্থান, সংঘবদ্ধ মাদক ও চোরাকারবারি চক্রের তৎপরতা, মাদক পাচারের সহজ রুট, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতির কারণে রংপুর অঞ্চল মাদকের অন্যতম ‘হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক এসএম এলতাস উদ্দিন জানিয়েছেন, রংপুর জেলায় কোনো সীমান্ত নেই। তবে সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক রংপুরে ঢোকানো হয়। এরপর তা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা কৌশলে পাচার করা হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বললেন, মাদকের কারণেই রংপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আলোচিত চার খুনের ঘটনাও একই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এ ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিত, তাহলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যার ঘটনা নাও ঘটতে পারত।
পুলিশের দাবি, মহানগরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শুধু জুলাই মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ১১ দশমিক ৫২৫ কেজি গাঁজা, ৬৩১টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪১ দশমিক ৯ গ্রাম হেরোইন, ৩০টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ৭২ বোতল এসকাফ এবং ২ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে ৬০টি মাদক মামলা রুজু করে ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাছুয়াপাড়ায় চার খুনের ঘটনার পর প্রশান্তসহ অন্য মাদক কারবারিরা গা-ঢাকা দিয়েছে। তারপরও মাদকের এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা চলছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, এখন রংপুর শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে মাদক; যা সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা। সহজলভ্য ইয়াবা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে তৈরি হয়। সীমান্ত হয়ে আমাদের দেশে ঢোকে। তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করা দরকার।





