সাক্ষাৎকার
এল নিনো নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই, দরকার প্রস্তুতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও পরিবেশ খাতের একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি নদী ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক পানি আইন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্ব জুড়ে নেমে আসছে সুপার এল নিনোর বড় ধাক্কা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এল নিনোর প্রভাব, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগামীর সময়-এর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বখতিয়ার আবিদ চৌধুরী
আগামীর সময়: সুপার এল নিনো শুরু হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ এটি চূড়ান্ত আঘাত হানতে পারে। বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষের আভাস দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকে বলছেন, বাংলাদেশও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ড. আইনুন নিশাত: বাংলাদেশের আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করেই এখানকার কৃষিব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের প্রধান তিনটি ফসল হলো আউশ, আমন ও বোরো। আজ থেকে ১০০ বছর আগেও কৃষকদের মূল পছন্দ ছিল আমন ধান। কারণ, এটি ছিল সম্পূর্ণ বৃষ্টিনির্ভর। বর্ষা নামলে আমন ধান লাগানো হতো এবং বর্ষার শেষে তা কেটে নেওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাতেও এর উল্লেখ পাই— ‘রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা,/ কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।’ এখানে মূলত আউশ ধান কাটার পর আমন ধানের দিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
আমন বৃষ্টিনির্ভর, আর নিচু জায়গায় হতো আউশ ধান। নিচু এলাকায় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে কিন্তু বাংলাদেশে বৃষ্টির সরাসরি সম্পর্ক ছিল না; নেপাল, ভারত বা ভুটানে বৃষ্টি হলে তা গড়িয়ে এসে আমাদের দেশের নদীগুলোর পানি বাড়িয়ে দিত এবং মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, বিক্রমপুরের মতো নিচু অঞ্চলগুলো প্লাবিত হতো। ফলে ওই সব এলাকায় লিমিটেড পরিমাণে আউশ ধান চাষ হতো।
কাজেই তখনকার দিনে বন্যা হলেও আমন ধান নষ্ট হয়ে দুর্ভিক্ষ হতো, আবার খরা হলেও অনাবৃষ্টির কারণে একই পরিণতি ঘটত। খরা ও দুর্ভিক্ষের সেই পটভূমিতেই জসীম উদ্দীন লিখেছিলেন ‘নক্সী কঁাথার মাঠ’। সেখানে দীর্ঘ অনাবৃষ্টির সময় বৃষ্টি নামানোর আশায় দোয়া-প্রার্থনা ও শিরনি বানানোর জন্য চাল তোলার দৃশ্য দেখতে পাই। অর্থাৎ, সেকালেও খরা হতো এবং অনাবৃষ্টির কারণে চাষাবাদ বন্ধ থাকলে খাদ্য সংকট দেখা দিত।
আগে নিচু জমিতে আউশ-আমন একসঙ্গে ছিটিয়ে বোনা হতো (এপ্রিল মাসে)। আগস্টে আউশ ধান কেটে নেওয়া হতো এবং একই জমিতে থেকে যাওয়া আমন ধান কাটা হতো অক্টোবর-নভেম্বরে (কার্তিক মাসে)। আর যে বছর অনাবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতো, সে বছরই তৈরি হতো ‘মরা কার্তিক’, অর্থাৎ অনাহার ও ক্ষুধা।
আগামীর সময়: আমরা তো এখন ধান চাষে বেশ সাফল্য পেয়েছি বলা যায়।
ড. আইনুন নিশাত: হ্যা। বিশ্ব জুড়ে ধানের উৎপাদন বাড়ানোর গবেষণা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকেই। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকায় উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবনের পর ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চফলনশীল ধানের বীজ উদ্ভাবন করে। বাংলাদেশে প্রথম এর ফিল্ড এক্সপেরিমেন্ট ও সেচভিত্তিক চাষাবাদ শুরু হয় কুমিল্লার কোটবাড়ী ও চান্দিনা এলাকায়। ড. আখতার হামিদ খান ডিপ টিউবওয়েল বা গভীর নলকূপ বসিয়ে শুকনো মৌসুমে সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
১৯৬৮-৭০ সালের দিকে বাংলাদেশে উচ্চফলনশীল ধানের প্রচলন শুরু হলেও শুরুতে মানুষ এটি গ্রহণ করতে দ্বিধা করত। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। ’৭২, ’৭৩ ও ’৭৪ সালে দেশে চরম খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তৎকালীন পরিস্থিতিতে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আহ্বানে কৃষকরা ব্যাপকভাবে উচ্চফলনশীল ধানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কারণ, দেশি জাতের ধানে যেখানে বিঘাপ্রতি মাত্র ৫ মণ ফলন হতো, উচ্চফলনশীল ধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ মণে।
আমরা সরাসরি বৃষ্টির ওপর শতভাগ নির্ভর নই; আমাদের কৃষি ভূগর্ভের পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্ষায় বৃষ্টি কম হলে ভূগর্ভে পানির স্তর রিফিল হতে কিছুটা সমস্যা হয়। ফলে চলতি বছরের কম বৃষ্টির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে ২০২৭ সালে পড়বে না। মাটির নিচে পানি থাকা পর্যন্ত ভূগর্ভের পানি দিয়ে সেচ চালিয়ে ফসল ফলানো সম্ভব। সুতরাং, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সরাসরি কোনো দুর্ভিক্ষের কারণ আমি দেখছি না। তবে ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আবহাওয়ার পরিবর্তন স্পষ্ট
বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতেই বোরো ধানের বিস্তার ঘটানো হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বোরো ধানের প্রায় ৭০ শতাংশ সেচ ভূগর্ভে পানির ওপর নির্ভর করে এবং ২০ শতাংশ নির্ভর করে নদীর পানির ওপর।
কাজেই এল নিনো বা অনাবৃষ্টির কারণে খরা বাড়লেও আমরা সরাসরি বৃষ্টির ওপর শতভাগ নির্ভর নই; আমাদের কৃষি ভূগর্ভের পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্ষায় বৃষ্টি কম হলে ভূগর্ভে পানির স্তর রিফিল হতে কিছুটা সমস্যা হয়। ফলে চলতি বছরের কম বৃষ্টির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে ২০২৭ সালে পড়বে না। মাটির নিচে পানি থাকা পর্যন্ত ভূগর্ভের পানি দিয়ে সেচ চালিয়ে ফসল ফলানো সম্ভব। সুতরাং, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সরাসরি কোনো দুর্ভিক্ষের কারণ আমি দেখছি না। তবে ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আবহাওয়ার পরিবর্তন স্পষ্ট। জুনে বৃষ্টি ৩০ শতাংশ কম হয়েছে, বর্ষার মূল মাসগুলোতে বৃষ্টি কমে গিয়ে তা কিছুটা আশ্বিন-ভাদ্রে পিছিয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের ওপর সতর্ক নজর রেখে আমাদের কৃষির পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
আগামীর সময়: ভূগর্ভের পানি দিয়ে ধান চাষের সংকট না হয় সামাল দেওয়া গেল। কিন্তু মাছ চাষের কী হবে?
ড. আইনুন নিশাত: এটা ঠিক যে মাছ চাষের ওপর বেশ প্রভাব পড়তে পারে। স্বাভাবিক গরমের দিনেও পুকুরের পানি কমে গেলে মাছ মারা যায়। এ সময় মাছচাষিরা ভূগর্ভের পানি সরবরাহ করেন পুকুরে। এল নিনোর সময়ও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া উপায়ও নেই। কিন্তু বাংলাদেশে পানির ব্যবহার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। পানি ব্যবহারে দক্ষতা কম হওয়ায় অপচয়ের পরিমাণ অনেক বেশি।
আগামীর সময়: নদীর মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব কেমন হতে পারে?
ড. আইনুন নিশাত: এল নিনো বা লা নিনার কারণে বাংলাদেশের নদীর পানি শেষ হয়ে যাবে— এমনটা মনে করার কারণ নেই। নদীর পানির পরিমাণ কিছুটা কমবেশি হতে পারে; কিন্তু এল নিনো ও লা নিনার পর্যায় পরিবর্তিত হয়। দুই বছর পর পরিস্থিতি আবার উল্টেও যেতে পারে। এখানে পুরো হাইড্রোলজিক সাইকেল বা পানি চক্রকে বুঝতে হবে।
আগামীর সময়: তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর কিছু প্রভাব তো পড়বেই?
ড. ড. আইনুন নিশাত: পৃথিবীতে প্রতিদিনই নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি হচ্ছে, যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, বন উজাড় হচ্ছে। ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা উত্তরোত্তর বাড়ছে। প্রায় ১০০০ বছরের সিনথেটিক ডেটা ও গত ২০০ বছরের পরিমাপকৃত ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই আগের বছরের তুলনায় তাপমাত্রা অল্প অল্প করে বাড়ছে। আর এরকমটা চলতে থাকবে। এটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। অতীতে তাপমাত্রা যখন বেশি হতো, তখন আমাদের দেশের কৃষকরা ভোরে ও বিকালে জমিতে কাজ করতেন। কারণ, দুপুরে সূর্যের তাপ বেশি থাকত। খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব যে পড়বে না তা নয়; প্রভাব পড়বে, তবে সেটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। চীনের উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, তারা খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল রাখেনি
আগামীর সময়: ‘এল নিনো’ বা ‘লা নিনা’র উৎপত্তির বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে?
ড. ড. আইনুন নিশাত: ‘এল নিনো’ বা ‘লা নিনা’ মূলত বৈশ্বিক বাতাস চলাচলের দিক বা সার্কুলেশনের পরিবর্তন। বাতাস যেদিকে যাওয়ার কথা, যেমন— আগে হয়তো বাতাস পশ্চিম দিকে যেত, তা হঠাৎ করে বিপরীত দিকে বা পূর্ব দিকে আসা শুরু করে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিষয়ের পেছনের সঠিক বৈজ্ঞানিক কারণটি এখনো স্পষ্ট করে জানা যায়নি। কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া অন্ধভাবে কোনো কথা বিশ্বাস করার সুযোগও নেই। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে এবং আবহাওয়া সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। বাতাসের দিক পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সমন্বিত প্রভাবেই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিস্থিতির অবক্ষয় ঘটছে। যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আগামীর সময়: তাহলে বাংলাদেশের মানুষের এল নিনো নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলছেন?
ড. আইনুন নিশাত: হ্যাঁ, এল নিনো বা লা নিনাকে কেন্দ্র করে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এর অর্থ এই নয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন বা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে আমরা নেই। শুধু বিষয়টি বুঝতে হবে যে— কোন পরিবর্তনটি এল নিনো বা লা নিনার স্বাভাবিক ওঠানামা এবং কোনটি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের অংশ। এল নিনো একবার বাড়ে, আবার কমে; লা নিনাও আসে ও চলে যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।
আগামীর সময়: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কোথায়?
ড. আইনুন নিশাত: তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে। বৃষ্টির সময় ও ধরন বদলে যাচ্ছে। বৃষ্টি বেশি হলে জলাবদ্ধতা সামলাতে হবে, আর বৃষ্টি কম হলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু এল নিনো কখন আসবে, সেটি দেখলেই হবে না; পানি সরবরাহ, সেচ, নিষ্কাশন, উন্নত বীজ এবং কৃষির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামীর সময়: পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের করণীয় কী?
ড. আইনুন নিশাত: কৃষকের ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি, সার ও উন্নতমানের বীজ নিশ্চিত করতে হবে। এল নিনোর সময়ে যদি তুলনামূলক বেশি পানি প্রয়োজন হয়, তাহলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার বৃষ্টি বেশি হলে জলাবদ্ধতা যেন না হয়, সে জন্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অর্থাৎ আমাদের প্রস্তুতি হতে হবে বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে— শুধু এল নিনো নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে নয়।
আগামীর সময়: বাংলাদেশ তো খাদ্য আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা এল নিনোর প্রভাব সামলাতে পারব?
ড. আইনুন নিশাত: খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। চীনের উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, তারা খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল রাখেনি; বিকল্প পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বৃষ্টি কখন বাড়ছে বা কমছে, এল নিনোর কারণে হোক বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে— এসব বিবেচনা করে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করতে হবে।
আগামীর সময়: হঠাৎ বন্যা বা অতিবৃষ্টির ঘটনা কি এল নিনো-লা নিনার ফল?
ড. আইনুন নিশাত: সব ঘটনা এল নিনো বা লা নিনার কারণে হয়েছে—এভাবে বলা ঠিক নয়। কোনো এক জায়গায় হঠাৎ বৃষ্টি বা বন্যা হলেই সেটিকে এল নিনো-লা নিনার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে নেপালের একটি বন্যার পানি ঢাকায় এসে বিপদ তৈরি করবে— এমন একটি ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। বন্যা কোথা থেকে আসছে, নদীর পানি কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে— এসব বুঝতে ফ্লাড মডেলিং ও হাইড্রোলজিক্যাল বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আগামীর সময়: তাহলে আবহাওয়ার সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. আইনুন নিশাত: এগুলো দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। আগে বড় ধরনের খরা, বন্যা বা অতিবৃষ্টির ঘটনা অনেক দীর্ঘ বিরতিতে ঘটত বলে আমরা দেখেছি। এখন এসব ঘটনা তুলনামূলক ঘন ঘন ঘটছে। আমার বক্তব্য হলো, এই ঘন ঘন পরিবর্তনকে শুধু এল নিনো-লা নিনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তন এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আগামীর সময়: বিজ্ঞানীরা কি আগে থেকেই নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন, এল নিনো কতদিন থাকবে?
ড. আইনুন নিশাত: সবসময় নয়। এল নিনো কখন শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে, তা প্রকৃতিগতভাবে পুরোপুরি নির্ভুল বলা যায় না। অনেক সময় এল নিনো শুরু হওয়ার পর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সেটিকে ঘোষণা করা হয়।
তাই ফেব্রুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত থাকবে— এ ধরনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত নিশ্চয়তা দেখানো ঠিক নয়; জুন বা জুলাই পর্যন্তও পরিস্থিতি থাকতে পারে।
আগামীর সময়: শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য আপনার বার্তা কী?
ড. আইনুন নিশাত: আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সচেতন থাকতে হবে। বৃষ্টি বেশি হলে জলাবদ্ধতা মোকাবিলা করতে হবে, বৃষ্টি কম হলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি, পানি, মাছ ও খাদ্য নিরাপত্তাকে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— কোনো অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ঘটনাকে সঙ্গে সঙ্গে এল নিনো বা লা নিনার ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে এর প্রকৃত কারণ বোঝার চেষ্টা করা। কারণ, কারণটি না বুঝলে কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।
আগামীর সময়: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আইনুন নিশাত: আপনাকেও ধন্যবাদ।






